এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার নোটিশ ফেরত আসলে তামাদি গণনার সুনির্দিষ্ট নিয়ম: হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act)-এর ধারা ১৩৮(১)(খ) ও (গ) অনুযায়ী চেকদাতার সঠিক ঠিকানায় প্রাপ্তিস্বীকারপত্রসহ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রেরিত লিগ্যাল নোটিশ যদি প্রাপক গ্রহণ না করে বা এভয়েড করে এবং খামটি ‘দাবিদারবিহীন’ (Unclaimed) বা ‘গ্রহণে অস্বীকৃত’ (Refused) মর্মে ডাকপিয়নের মন্তব্যসহ প্রেরকের নিকট ফেরত আসে, তবে পোস্টাল রিমার্কস বা প্রেরকের নিকট ফেরত আসার তারিখটিই আইনত নোটিশ জারির তারিখ (Deemed date of service) গণ্য হবে। উক্ত ফেরত আসার তারিখ থেকে চেকদাতাকে টাকা পরিশোধের জন্য ১৫ দিন সময় দিতে হবে এবং সেই ১৫ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করতে হবে। ফেরত আসার পর দীর্ঘ কয়েকমাস কালক্ষেপণ করে মামলা দায়ের করলে তা তামাদিতে সরাসরি বাতিলযোগ্য।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

মামলার বিবরণে জানা যায়, জনৈক ব্যবসায়ী মেসার্স রহমান ট্রেডার্স রাজশাহীর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোঃ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে ২৫ লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের মামলা দায়ের করেন। নালিশি আরজিতে বলা হয় যে চেকটি ২০২৩ সালের মে মাসে ব্যাংকে উপস্থাপন করলে ডিজঅনার হয়। বাদী জুন মাসের ১ তারিখে রেজিস্ট্রার্ড এ/ডি যোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। নোটিশটি ডাক বিভাগ কর্তৃক ‘খুঁজিয়া পাওয়া গেল না’ মর্মে ১৫ জুন ২০২৩ তারিখে বাদীর আইনজীবীর নিকট অবিলিকৃত অবস্থায় ফেরত আসে।

কিন্তু বাদী ১৫ জুনের পর কোনো মামলা না করে বসে থাকেন এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে (প্রায় ৪ মাস পর) ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৩৮ ধারায় মামলা দাখিল করেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামিকে তলব করেন এবং যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামির তামাদির আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাকে ১ বছরের কারাদণ্ড ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। দায়রা আদালতে আপিল ব্যর্থ হলে আসামি হাইকোর্ট বিভাগে এই রিভিশন মামলা দায়ের করেন।

👤 দরখাস্তকারী আসামির আইনি যুক্তি

আসামির বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, পোস্টাল রিমার্কস অনুযায়ী ১৫ জুন নোটিশের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়েছে। ১৫ জুনের পর ১৫ দিন সময় দিয়ে ৩০ জুনের পর ৩০ দিন অর্থাৎ ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে মামলা করা বাধ্যতামূলক ছিল। অক্টোবর মাসে মামলা দায়ের করায় তা তামাদিতে মৃত।

👥 বাদীপক্ষের যুক্তি

বাদী দাবি করেন যে, নোটিশ যেহেতু আসামি গ্রহণ করেনি তাই তিনি পরবর্তীতে কুরিয়ারের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। ফলে কজ অব অ্যাকশন বিলম্বিত হয়েছে এবং তামাদির কোনো বরখেলাপ হয়নি।

৩. বিচারিক আদালতের ত্রুটির বিশ্লেষণ (Errors of Lower Courts)

হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, ট্রায়াল কোর্ট এনআই অ্যাক্টের ১৪১ ধারা ও তামাদি আইনের বিধিবদ্ধ সময়সীমা গণনায় চরম ভুল করেছেন। এনআই অ্যাক্ট একটি বিশেষ ফৌজদারি আইন যেখানে প্রতিটি দিনের তামাদি কঠোরভাবে পরিপালন করতে হয়। নোটিশ ফেরত আসার পর বাদী ইচ্ছামতো সময় নিয়ে মামলা করতে পারে না।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা ও রেশিও ডেসাইডেনডি (High Court’s Ratio)

মহামান্য হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির 59 DLR (AD) 215 এবং 63 DLR (AD) 40 উল্লেখ করে রায় দেন: “When a statutory notice under Section 138 of the Negotiable Instruments Act is sent by registered post with A/D to the correct address of the drawer and is returned unserved with postal endorsement, the period of limitation under Section 138(c) and 141 begins to run from the date of such return. A complaint filed beyond the statutory period computed from the date of return is barred by limitation and the court has no jurisdiction to take cognizance.”

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায়: ক্রিমিনাল রিভিশন মোকদ্দমাটি মঞ্জুর করা হয়। অধস্তন আদালতসমূহের প্রদত্ত সাজা ও অর্থদণ্ডের আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করা হয়। মামলাটি তামাদিতে বারিত হওয়ায় খারিজ করা হয় এবং আপিলকারী মোঃ আশরাফুল আলমকে সকল অভিযোগ থেকে অব্যাহতি ও খালাস প্রদান করা হয়।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • ফেরত নোটিশের কার্যকারিতা: নোটিশ ফেরত আসার তারিখ থেকেই ১৫ দিনের পেমেন্ট পিরিয়ড শুরু হয়।
  • বিলম্ব ক্ষমার সুযোগহীনতা: এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার নোটিশ ও মামলা দায়েরের তামাদি মওকুফ করার কোনো ক্ষমতা আদালতের নেই।
  • সঠিক ঠিকানার গুরুত্ব: সঠিক ঠিকানায় নোটিশ পাঠানোই বাদীর দায়িত্ব; প্রাপক এভয়েড করলেও তামাদি গণনা থামবে না।

৭. ব্যাংক কর্মকর্তা ও এনআই অ্যাক্ট আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
  1. নোটিশ ফেরত খাম সংরক্ষণ: ডাক বিভাগ থেকে ফেরত আসা খামটির সিল ও তারিখ সযত্নে অক্ষত অবস্থায় রাখুন।
  2. ক্যালেন্ডার মেপে মামলা দাখিল: ফেরত আসার তারিখ থেকে ১৫ দিন যোগ করে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা ফাইল করুন।
  3. জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি: প্রাপক না পাওয়া গেলে সুরক্ষার জন্য বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকে একইসাথে নোটিশ ছাপিয়ে নিন।
  4. আসামিপক্ষের প্রথম ডিফেন্স: তামাদির বরখেলাপ থাকলে চার্জ গঠনের পর্যায়েই মামলা বাতিলের দরখাস্ত দিন।
  5. আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৬৩ ডিএলআর (এডি) ৪০ রায় উদ্ধৃত করে তামাদি আইনের কঠোরতা প্রতিষ্ঠা করুন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল রেকর্ড রেফারেন্স
মামলার নম্বর Criminal Revision No. 4620 of 2024
আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (একক বেঞ্চ)
পক্ষদ্বয় মো. আশরাফুল আলম বনাম রাষ্ট্র ও অন্য জন
আইন ও ধারা Negotiable Instruments Act, 1881 (Sections 138, 141); General Clauses Act, 1897 (Section 27)
অফিসিয়াল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button