অর্পিত সম্পত্তি ট্রাইব্যুনালের অবমুক্তির ডিক্রি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের বাধ্যবাধকতা: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১ (Vested Property Return Act, 2001)-এর ধারা ১৩ ও ২৮ অনুযায়ী উপযুক্ত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনাল বা আপিল ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কোনো সম্পত্তিকে ‘ক’ তফসিল বা অর্পিত তালিকা থেকে অবমুক্ত (Release) করে মূল মালিক বা বৈধ উত্তরাধিকারীদের অনুকূলে ডিক্রি প্রদান করা হলে জেলা প্রশাসন (Deputy Commissioner) বা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর উক্ত ডিক্রি প্রতিপালন করা একটি সংবিধিবদ্ধ বাধ্যতামূলক দায়িত্ব (Mandatory statutory duty)। ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি চূড়ান্ত হওয়ার পর জেলা প্রশাসন নতুন কোনো শর্ত আরোপ করতে পারে না, খাজনা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না কিংবা নামজারি নামঞ্জুর করতে পারে না। ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি বাস্তবায়ন না করা সরাসরি আদালত অবমাননা ও বিচারিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
মামলার বিবরণে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র পাল ও অন্যান্যদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ২.৪০ একর পৈত্রিক সম্পত্তি সরকার অবৈধভাবে অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তালিকাভুক্ত করে। বাদীরা উপযুক্ত সময়ে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে মোকদ্দমা দায়ের করেন। ট্রাইব্যুনাল দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পরীক্ষা করে দেখতে পান যে বাদীদের পূর্বপুরুষ কখনোই দেশত্যাগ করেননি এবং তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই বসবাস করেছিলেন। ট্রাইব্যুনাল সম্পত্তিটি অর্পিত তালিকা থেকে অবমুক্ত করে বাদীদের অনুকূলে রায় ও ডিক্রি প্রদান করেন।
সরকার পক্ষ উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়ের করলেও আপিল খারিজ হয়ে ডিক্রি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। অতঃপর বাদীরা এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি ও জমাভাগের আবেদন জানান। কিন্তু এসি ল্যান্ড এবং জেলা প্রশাসক ‘অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর বিশেষ ছাড়পত্র নেই’—এই খোঁড়া অজুহাতে বছরের পর বছর নামজারি স্থগিত রাখেন এবং খাজনা গ্রহণ বন্ধ রাখেন। উপায়ান্তর না দেখে বাদীরা প্রথম আপিল ও প্রতিকার চেয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের দ্বারস্থ হন।
👤 আপিলকারী মালিকদের আইনি যুক্তি
আপিলকারীদের বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি চূড়ান্ত এবং বিশেষ আইনের ২৮ ধারা মতে অন্য কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের এই ডিক্রি অমান্য করার ক্ষমতা নেই। জেলা প্রশাসনের অনীহা আদালতের কর্তৃত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল।
👥 সরকারপক্ষের যুক্তি
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেন যে, জমিটিতে সরকারি লিজগ্রহীতা রয়েছে এবং প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরাসরি খতিয়ান খোলা সম্ভব হয়নি।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, আপিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর প্রায় ৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও জেলা প্রশাসন নামজারি কার্যকর করেনি। কোনো জুডিশিয়াল ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত ডিক্রির পর নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত যাচাইয়ের কোনো সুযোগ আইনে নেই। প্রশাসনিক কালক্ষেপণ মূলত সাধারণ সংখ্যালঘু ও নাগরিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক নজির Government of Bangladesh vs. Nibaran Chandra, 64 DLR (AD) 89 এবং 71 DLR (AD) 255 বিস্তারিত উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন: “Once a decree has been passed by the Vested Property Return Tribunal releasing the property in favour of the rightful owners, the Deputy Commissioner and the revenue authorities have no option but to implement the decree forthwith by mutating the names of the decree-holders and accepting rent.”
চূড়ান্ত রায়: প্রথম আপিলটি মঞ্জুর করা হয়। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও এসি ল্যান্ড (ভূমি)-কে এই রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বাদীদের অনুকূলে নামজারি ও পৃথক জমাভাগ খতিয়ান প্রস্তুত করে দাখিলা প্রদানের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। যদি উক্ত সময়ের মধ্যে ডিক্রি বাস্তবায়নে অবহেলা করা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু হবে।
- ট্রাইব্যুনাল ডিক্রির চূড়ান্ততা: অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালের অবমুক্তির ডিক্রি নির্বাহী বিভাগ অমান্য করতে পারে না।
- নামজারির স্বয়ংক্রিয় বাধ্যবাধকতা: অবমুক্তির পর এসি ল্যান্ড কোনো নতুন অজুহাতে নামজারি আটকে রাখতে পারবে না।
- লিজ বাতিলের আবশ্যকতা: ট্রাইব্যুনালের রায়ের সাথে সাথে সরকারি যেকোনো অস্থায়ী লিজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
- ডিক্রির সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ: ট্রাইব্যুনালের রায় ও ডিক্রির মূল সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক এসি ল্যান্ডে জমা দিন।
- আপিলের স্ট্যাটাস যাচাই: সরকারপক্ষ আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছে কি না তা নিয়মিত রেকর্ড তল্লাশি করে নিশ্চিত হোন।
- দেরি হলে লিগ্যাল নোটিশ: ট্রাইব্যুনালের ডিক্রির পর এসি ল্যান্ড গড়িমসি করলে আইনজীবীর মাধ্যমে অবমাননার নোটিশ পাঠান।
- দখল বুঝে নেওয়ার আবেদন: যদি সরকারি দখলে থাকে, তবে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে দখল বুঝে নিন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৬৪ ডিএলআর (এডি) ৮৯ নজির সংযুক্ত করে নামজারির আবেদন করুন।

