চেক ডিজঅনার মামলায় লিগ্যাল নোটিশ প্রাপ্তির প্রমাণ ও আপিলে ৫০% জমার বিধান: এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারায় হাইকোর্টের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা

আইনি সারসংক্ষেপ: এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারার নোটিশ ও আপিল দায়েরের পূর্বশর্ত

নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act), ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী চেক প্রত্যাখ্যাত (Dishonour) হওয়ার পর ব্যাংক মেমো পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই মামলায় হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, যদি নোটিশটি সঠিক ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র (A/D) সহ প্রেরণ করা হয়, তবে নোটিশ গ্রাহক তা গ্রহণ অস্বীকার বা ফেরত পাঠালেও জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা এবং সাক্ষ্য আইনের ১১৪ ধারা মতে নোটিশ তামিল সম্পন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে। এছাড়া ১৩৮এ ধারা মতে দায়রা আদালতে আপিল করার ক্ষেত্রে চেকের টাকার ৫০ শতাংশ জমা দেওয়ার যে শর্ত, তা ফৌজদারি রিভিশন শুনানির ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না।

১. মামলার প্রাথমিক পরিচিতি ও বিচারক বেঞ্চ

আলোচ্য মামলাটি মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের Criminal Revisional Jurisdiction-এ নিস্পত্তি হয়। একক বেঞ্চে শুনানি গ্রহণ ও চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন মাননীয় বিচারপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ সুমন (Mr. Justice Yousuf Abdullah Suman)। নিম্ন আদালত কর্তৃক ১৩৮ ধারার অধীনে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও চেকে উল্লেখিত মোট সমপরিমাণ অর্থ জরিমানার আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯ ধারায় রিভিশন পিটিশন দাখিল করেছিলেন সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. ঠান্ডু মিয়া।

২. বিরোধের মূল পটভূমি ও ঘটনাপ্রবাহ

মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, বাদী মো. রেজাউল করিমের নিকট থেকে ব্যবসায়িক পাওনা পরিশোধ বাবদ আসামি মো. ঠান্ডু মিয়া তার নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের একটি চেক প্রদান করেন। বাদী নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে চেকটি নগদায়নের জন্য নিজের ব্যাংক হিসাবে জমা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবটিতে “অপ্রতুল তহবিল” (Funds Insufficient) থাকায় তা ডিজঅনার মেমোসহ ফেরত আসে। বাদী তাৎক্ষণিকভাবে আইন অনুযায়ী আইনজীবীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করেন। নোটিশের মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পরও আসামি চেকের পাওনা পরিশোধ না করায় বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা দায়ের করা হয়।

৩. উভয় পক্ষের মূল আরজি ও যুক্তিতর্ক

আসামিপক্ষের যুক্তি

  • আসামি দাবি করেন তিনি বাদীর নিকট থেকে কোনো ঋণ গ্রহণ করেননি; চেকটি মূলত জামানত (Security Cheque) হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
  • বাদীর প্রেরিত লিগ্যাল নোটিশ আসামি ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেননি; ডাকপিয়নের সার্ভিস রিটার্নে গরমিল রয়েছে।
  • চেকের উপর বাদীর কোনো বৈধ পাওনা (Legally Enforceable Debt) বিদ্যমান ছিল না।

বাদীপক্ষের জবাব

  • চেকের স্বাক্ষর আসামির নিজের এবং একাউন্টে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স না রেখেই চেক ইস্যু করা হয়েছিল।
  • রেজিস্ট্রি ডাকযোগে সঠিক ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং পোস্টাল রসিদ প্রদর্শনী (Exhibit) হিসেবে আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
  • এনআই অ্যাক্টের ১১৮ ধারা মতে চেক ইস্যু হলেই আইনগত ঋণের প্রাথমিক অনুমান (Presumption) তৈরি হয়।

৪. নিম্ন আদালত ও দায়রা জজের রায়

বিজ্ঞ বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও প্রদর্শনীসমূহ পরীক্ষা করে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং ১ বছরের কারাদণ্ড ও চেকের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করেন। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আসামি দায়রা জজ আদালতে আপিল দায়ের করলেও বিজ্ঞ দায়রা জজ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে আপিল খারিজ করে দেন। এরপর আসামি হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন।

৫. মহামান্য হাইকোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইন ব্যাখ্যা

হাইকোর্টের প্রধান আইনি সিদ্ধান্তসমূহ:

  1. জামানতের চেক ও আইনি দায়: শুধুমাত্র “জামানতের চেক” দাবি করলেই এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার ফৌজদারি অপরাধ থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। চেক স্বাক্ষরিত হয়ে হস্তান্তর হলে তাতে ব্যাংককে অর্থ পরিশোধের যে নির্দেশ দেওয়া হয়, তা অমান্য হলে অপরাধ গঠিত হয়।
  2. লিগ্যাল নোটিশের আইনি নিশ্চয়তা: নোটিশ যদি সঠিক ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রেরণ করা হয় এবং প্রেরকের কাছে পোস্টাল রসিদ থাকে, তবে গ্রহীতা তা ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ না করলেও বা ফেরত পাঠালেও নোটিশ কার্যকর হয়েছে বলে আদালত ধরে নেবেন (General Clauses Act Sec 27)।
  3. প্রমাণের দায়ভার: আসামির স্বাক্ষরিত চেকের বিপরীতে কোনো দায় ছিল না—তা প্রমাণের দায়িত্ব আসামির নিজের। কোনো সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া আসামির মৌখিক দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।

৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ

মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের রায়ে কোনো আইনি ত্রুটি বা বিচারিক বিচ্যুতির প্রমাণ না পেয়ে রিভিশন পিটিশনটি খারিজ করে দেন। ফলে আসামির বিরুদ্ধে ঘোষিত ১ বছরের কারাদণ্ড ও চেকের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানার সাজা বহাল থাকে এবং আসামিকে অবিলম্বে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

৭. নাগরিক ও আইনজীবীদের জন্য সতর্কতা ও করণীয়

  • ব্যবসায়িক চেকের ক্ষেত্রে: কাউকে ফাঁকা (Blank) বা সিকিউরিটি চেক দেওয়ার সময় লিখিত চুক্তি বা ভাউচার সংরক্ষণ করুন।
  • ডিজঅনারের পর করণীয়: ব্যাংক মেমো পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। একদিনও বিলম্ব হলে মামলা তামাদি হয়ে যাবে।
  • আপিল দায়ের: বিজ্ঞ দায়রা আদালতে আপিল করতে হলে চেকের টাকার ন্যূনতম ৫০% সরকারি চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

৮. মূল রায়ের অফিশিয়াল তথ্য ও লিংক

মামলা নম্বর Criminal Revision No. 6579 of 2024
বিচারপতি Mr. Justice Yousuf Abdullah Suman
আইন ও ধারা Negotiable Instruments Act, 1881 Section 138, 118; CrPC Sec 439
অফিশিয়াল কপি সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button