কেবল সহ-আসামির স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা প্রদান বেআইনি: হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (Evidence Act, 1872)-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী যৌথ বিচারে কোনো একজন আসামির প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (Confession of co-accused) অপর সহ-আসামির বিরুদ্ধে কোনো ইতিবাচক বা স্বতন্ত্র সাক্ষ্য (Substantive evidence) হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত দুর্বল ও অবিশ্বাস্য উপাদান। যতক্ষণ না স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সমর্থনমূলক দালিলিক বা মৌখিক সাক্ষ্য (Independent and reliable corroboration) দ্বারা অপর আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ কেবলমাত্র সহ-আসামির জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতির পরিপন্থী ও বেআইনি।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা থানা এলাকায় এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হওয়া আসামি রফিক ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। উক্ত জবানবন্দিতে রফিক নিজের অপরাধ স্বীকারের পাশাপাশি দাবি করে যে তার সাথে মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও জনৈক সুমন উপস্থিত ছিল এবং দেলোয়ারের পরামর্শেই হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছে।
পুলিশ দেলোয়ার ও সুমনকে গ্রেফতার করে। কিন্তু দেলোয়ারের কাছ থেকে কোনো রক্তমাখা অস্ত্র বা আলামত উদ্ধার হয়নি এবং সে নিজে কোনো স্বীকারোক্তি দেয়নি। আদালতে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও দেলোয়ারের নাম বলেনি। তা সত্ত্বেও দায়রা জজ আদালত কেবল রফিকের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তির ওপর অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করে দেলোয়ার ও সুমন উভয়কে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে দেলোয়ার হোসেন হাইকোর্টে এই ফৌজদারি আপিল দায়ের করেন।
👤 আপিলকারী আসামির আইনি যুক্তি
আপিলকারীর বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, সাক্ষ্য আইনের ৩০ ধারায় বলা হয়েছে আদালত কেবল ‘বিবেচনায় নিতে পারেন’ (May take into consideration), এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নয়। সহ-আসামি নিজের দোষ লাঘব করতে বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে নির্দোষ ব্যক্তির নাম জড়াতে পারে। সমর্থন ছাড়া সাজা দেওয়া বিচারিক অন্যায়।
👥 রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেন যে, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল এবং ম্যাজিস্ট্রেট সমস্ত আইনগত সতর্কতা মেনে এটি রেকর্ড করেছেন। ফলে যৌথ বিচারে তা অন্য আসামির বিরুদ্ধে ব্যবহারে কোনো বাধা নেই।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, ট্রায়াল জজ সাক্ষ্য আইনের সুপরিচিত ‘ভুবনী সাহু’ নীতি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছেন। একজন অপরাধীর জবানবন্দিকে অন্য নাগরিকের ফাঁসি বা যাবজ্জীবন সাজার একক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা আইনসম্মত নয়। স্বাধীন কোনো সাক্ষী বা বস্তুগত আলামত ছাড়া দোষী সাব্যস্তকরণ সরাসরি আইনের চরম ব্যত্যয়।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ ঐতিহাসিক প্রিভি কাউন্সিল রায় Bhuboni Sahu vs. The King, 1 DLR (PC) 166 এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত State vs. Lalu Miah, 39 DLR (AD) 117 ও 52 DLR (AD) 82 বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন: “A confession of a co-accused is not ‘evidence’ as defined in Section 3 of the Evidence Act. It cannot be made the foundation of a conviction; it can only be used in support of other evidence. If the other independent evidence is insufficient to sustain a conviction, the confession of a co-accused cannot be called in aid.”
চূড়ান্ত রায়: ফৌজদারি আপিলটি মঞ্জুর করা হয়। বিচারিক আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ রদ ও রহিত ঘোষণা করা হয়। আপিলকারী মোঃ দেলোয়ার হোসেন ও সুমনকে সকল অভিযোগ থেকে সসম্মানে খালাস (Acquitted) প্রদান করা হয় এবং অবিলম্বে তাদের কারামুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
- ৩০ ধারার দুর্বলতা: সহ-আসামির স্বীকারোক্তি কোনো সাবস্ট্যান্টিভ সাক্ষ্য নয়; এটি কেবল অন্য সাক্ষ্যকে সমর্থন করতে পারে।
- স্বাধীন সমর্থনের আবশ্যকতা: নিরপেক্ষ মৌখিক বা বস্তুগত সাক্ষ্য ছাড়া সহ-আসামির কথায় কাউকে সাজা দেওয়া অবৈধ।
- ভুবনী সাহু নীতির চিরন্তন প্রযোজ্যতা: প্রিভি কাউন্সিলের এই শতবর্ষী নীতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে এখনো অটল ও অলঙ্ঘনীয়।
- সহ-আসামির স্বীকারোক্তি চ্যালেঞ্জ: চার্জ গঠনের সময় সহ-আসামির বক্তব্য ছাড়া অন্য কোনো প্রমাণ না থাকলে ডিসচার্জের (Section 265C CrPC) আবেদন জানান।
- সমর্থনমূলক সাক্ষ্যের অভাব প্রমাণ: আদালতে জেরার মাধ্যমে প্রমাণ করুন যে কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষী আপনার মক্কেলকে ঘটনাস্থলে দেখেনি।
- আলামত উদ্ধারের ঘাটতি: কোনো অস্ত্র বা চোরাই মাল উদ্ধার না হওয়াকে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের অন্যতম কারণ হিসেবে উপস্থাপন করুন।
- ভুবনী সাহু নজিরের রেফারেন্স: শুনানিতে প্রিভি কাউন্সিলের ভুবনী সাহু (1 DLR PC 166) রায়টি আদালতের সামনে পাঠ করুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: বিচারিক আদালত যদি কেবল সহ-আসামির স্বীকারোক্তিতে সাজা দেয়, হাইকোর্টে জামিন পাওয়া নিশ্চিত হয়।
