দেনমোহর ও ভরণপোষণের জারি মোকদ্দমা স্থগিতের অপচেষ্টা: তালাকের পৃথক মামলা দেখিয়ে জারি বন্ধ করা যাবে না মর্মে সুপ্রিম কোর্টের নজির
📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মানবিক রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, পারিবারিক আদালতের অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৫-এর (Family Courts Ordinance, 1985) ৫ ধারা অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ, দেনমোহর ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত যাবতীয় বিরোধ নিষ্পত্তির একচ্ছত্র এখতিয়ার কেবল পারিবারিক আদালতের। কোনো পারিবারিক আদালত কর্তৃক স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি চূড়ান্ত হওয়ার পর, দেনাদার-স্বামী কর্তৃক নিয়মিত দেওয়ানী আদালতে তালাক কার্যকর ঘোষণার একটি পৃথক স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করে চলমান জারি মামলা (Execution Case) স্থগিত (Stay) চাওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। উচ্চ আদালত সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন যে, জারি আদালত কখনো মূল ডিক্রির বাইরে যেতে পারে না (Executing court cannot travel beyond the decree) এবং এর দায়িত্ব কেবল ডিক্রি কার্যকর করা। তদুপরি পিতার পক্ষে তাঁর নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ প্রদানের বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শর্তহীন, যা মা-বাবার মধ্যকার দাম্পত্য বিরোধ বা তালাকের দাবির ওপর নির্ভরশীল নয়।
১. মামলার পটভূমি ও পারিবারিক বিরোধের ইতিহাস (Background & Chronology)
আলোচ্য দেওয়ানী রিভিশন মোকদ্দমাটির উৎপত্তি বাগেরহাট জেলার সহকারী জজ ও সদর পারিবারিক আদালতে ২০১৬ সালে দায়েরকৃত পারিবারিক মোকদ্দমা নং ০৮/২০১৬ (Family Suit No. 08 of 2016) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন হালিমা খাতুন (ডিক্রিদার-প্রতিপক্ষ) এবং তাঁর নাবালিকা কন্যা সায়রা আক্তার, দেনাদার স্বামী মো: শেখ নজরুল ইসলাম (সাহেব)-এর বিরুদ্ধে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে।
বাদিনীর বিবরণ অনুযায়ী, বিগত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে রেজিস্ট্রিকৃত নিকাহনামামূলে উভয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয়। দাম্পত্য জীবনে বিগত ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে তাঁদের একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু স্বামী যৌতুক হিসেবে ২,০০,০০০/- (দুই লাখ) টাকা দাবি করে বাদিনীর ওপর নির্যাতন শুরু করেন এবং তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের যাবতীয় ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন। ফলে বাদিনী বাধ্য হয়ে পারিবারিক আদালতে প্রতিকার প্রার্থনা করেন।
বিবাদী-স্বামী আদালতে লিখিত জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে, তিনি বিগত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে বাদিনীকে তালাক প্রদান করেছেন এবং নিয়মিত ভরণপোষণ পরিশোধ করেছেন। পারিবারিক আদালত পূর্ণাঙ্গ বিচার শেষে সিদ্ধান্ত দেন যে, বিবাদী মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারা অনুযায়ী যথাযথ নোটিশ ও আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে তালাক কার্যকরের বিষয়টি প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে বিজ্ঞ পারিবারিক আদালত বাদিনী ও তাঁর নাবালক কন্যার অনুকূলে দেনমোহর ও বকেয়া ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন।
২. দীর্ঘ আইনি লড়াই ও ডিক্রির চূড়ান্ত রূপ (Successive Judicial Battles)
পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে বিবাদী-স্বামী একের পর এক উচ্চতর আদালতে আপিল ও রিভিশন দায়ের করে ডিক্রি নস্যাতের ব্যর্থ চেষ্টা চালান:
- প্রথম আপিল: বাগেরহাটের জেলা জজ আদালতে পারিবারিক আপিল নং ০১/২০১৮ দায়ের করেন—বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত আপিল সরাসরি নামঞ্জুর করে বিচারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রাখেন।
- প্রথম সিভিল রিভিশন: জেলা জজের রায়ের বিরুদ্ধে স্বামী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ৯৪/২০১৯ দায়ের করেন—হাইকোর্ট বিভাগ বিগত ১৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
- ডিক্রির চূড়ান্ততা (Finality): হাইকোর্টের উক্ত খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে স্বামী আপিল বিভাগে কোনো লিভ টু আপিল দায়ের করেননি। ফলে বাদিনীর দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রিটি চূড়ান্ত ও অখণ্ডনীয় রূপ লাভ করে।
ডিক্রি চূড়ান্ত হওয়ার পর বাদিনী পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে পারিবারিক ডিক্রি জারি মোকদ্দমা নং ০৩/২০১৮ (Family Decree Execution Case No. 03 of 2018) দায়ের করেন।
৩. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)
জারি কার্যধারা নস্যাৎ করতে বিবাদী সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ৪০৪/২০২২ দায়ের করেন এবং জারি আদালতে স্থগিতের আবেদন করেন। উভয় পক্ষ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী আইনি অবস্থান গ্রহণ করেন।
🏛️ ডিক্রিদার-স্ত্রীর বক্তব্য ও আইনি প্রতিরক্ষা
- ডিক্রির চূড়ান্ততা: পারিবারিক আদালত, জেলা জজ ও হাইকোর্ট কর্তৃক তালাক অপ্রমাণিত হয়ে ডিক্রি চূড়ান্ত হয়েছে এবং তা কার্যকরযোগ্য।
- পুনরায় একই প্রশ্ন তোলার বাধা: যে তালাকের দাবি ইতিপূর্বে তিন দফায় আদালত কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তা নিয়ে নতুন দেওয়ানী মামলা রেজ জুডিকেটার নীতিতে বারিত।
- জারি আদালতের এখতিয়ারের সীমা: জারি আদালত কেবল ডিক্রি কার্যকর করতে পারে; নতুন মামলার অজুহাতে জারি কার্যক্রম স্থগিত করার এখতিয়ার নেই।
- সন্তানের স্বাধীন অধিকার: পিতার নিকট থেকে নাবালিকা সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার পিতা-মাতার তালাকের বিতর্কের সাথে সম্পর্কিত নয়।
- আইনি সহায়তা ও হয়রানি: নিঃস্ব নারী ও শিশুকে পথে বসানোর উদ্দেশ্যে স্বামী কেবল কালক্ষেপণ ও আদালত অবমাননামূলক কৌশল গ্রহণ করেছেন।
🛡️ দেনাদার-স্বামীর বক্তব্য ও স্থগিতের দাবি
- নতুন স্বত্ব মোকদ্দমা: তালাক কার্যকর ঘোষণার জন্য সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ৪০৪/২০২২ দায়ের করা হয়েছে যা বিচারাধীন।
- স্থগিতের আবশ্যকতা: নতুন মামলায় তালাক বৈধ ঘোষিত হলে স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার আর থাকবে না, বিধায় জারি মামলা স্থগিত রাখা আবশ্যক।
- বিবাহ বন্ধনহীনতা: ২০১৬ সালেই শরীয়ত অনুযায়ী তালাক প্রদান করায় বাদিনীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বহু পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে।
- অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা: দেনাদার বর্তমানে আর্থিক সংকটে আছেন এবং সমুদয় অর্থ এককালীন প্রদান করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
- অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা: জারি মামলায় টাকা আদায় হয়ে গেলে পরবর্তীতে দেওয়ানী মামলায় জয়লাভ করলেও সেই টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে না।
৩. অধস্তন আদালতদ্বয়ের আদেশ ও পর্যবেক্ষণ (Findings of Execution & Appellate Courts)
বাগেরহাটের সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালত বিগত ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে দেনাদার-স্বামীর স্থগিতের আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। বিচারিক আদালত আদেশে উল্লেখ করেন যে—”উচ্চ আদালত কর্তৃক চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া বিষয় নিয়ে বিবাদী একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঘোষণামূলক মামলা করেছেন। উক্ত মামলার অজুহাতে জারি কার্যধারা স্থগিত করার প্রার্থনা মূলত পাওনা পরিশোধ বিলম্বিত করার একটি কূটকৌশল মাত্র।”
উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে স্বামী জেলা জজ আদালতে পারিবারিক আপিল নং ৩০/২০২২ দায়ের করেন। বিজ্ঞ জেলা জজ বিগত ২৯ নভেম্বর ২০২২ তারিখে আপিল নামঞ্জুর করে জারি আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। জেলা জজ রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন যে—”পারিবারিক আদালতই তালাকের বৈধতা পরীক্ষার উপযুক্ত আদালত। সেখানে ডিক্রি হয়ে হাইকোর্টে বহাল থাকার পর আলাদা দেওয়ানী মামলা করে জারি স্থগিত চাওয়া বিচারপ্রার্থীকে চরম হয়রানি ছাড়া আর কিছু নয়।” সংক্ষুব্ধ হয়ে দেনাদার সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ১১৮/২০২৩ দায়ের করেন।
৪. মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পর্যালোচিত আইনি প্রশ্নসমূহ (Core Legal Issues)
হাইকোর্ট বিভাগের শুনানিতে নিম্নলিখিত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি প্রশ্নসমূহের ওপর চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করা হয়:
- পারিবারিক আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ার ও সাধারণ দেওয়ানী মামলা: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ৫ ধারার বিধানাবলি সাপেক্ষে সাধারণ দেওয়ানী আদালত কি বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাকের কার্যকরতা ঘোষণার মামলা গ্রহণ করতে পারে?
- জারি আদালতের সীমাবদ্ধতা (Powers of Executing Court): পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ১৬(৪) ধারা মতে জারি আদালতের এখতিয়ার কি কেবল ডিক্রি কার্যকর করায় সীমাবদ্ধ, নাকি অন্য আদালতের বিচারাধীন মামলার কারণে জারি স্থগিত করার এখতিয়ার রয়েছে?
- সন্তানের ভরণপোষণের স্বাধীন দায়ভার: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার তালাক সংক্রান্ত বিরোধ কি অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাসন্তানের আইনগত ভরণপোষণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে?
৫. আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দের বক্তব্য ও যুক্তি (Submissions & Arguments)
দরখাস্তকারী পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী জনাব মোহাম্মদ সহিদুল ইসলাম নিবেদন করেন যে, দেনাদার ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। স্ত্রী তা অস্বীকার করায় দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ৪০৪/২০২২ দায়ের করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। উক্ত মামলার রায়ের ওপর স্ত্রীর ভরণপোষণের ভবিষ্যৎ দায় নির্ভরশীল। সুতরাং নতুন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জারি কার্যধারা স্থগিত রাখা আবশ্যক।
অপরপক্ষে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার (National Legal Aid) সুপ্রিম কোর্ট কমিটির মাধ্যমে নিয়োজিত বিজ্ঞ কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান (Ms. Ishrat Hasan), তানজিলা রহমান জুই এবং ইফাত হাসান শাম্মী শুনানিতে অংশ নেন। বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেখান যে, তালাক কার্যকর হয়েছে কি না তা পারিবারিক আদালত, জেলা জজ আদালত এবং ইতিপূর্বে হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিভিশন নং ৯৪/২০১৯-এ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করে দেখেছে যে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারা পালিত হয়নি। যে সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়েছে, তা নস্যাৎ করার জন্য পুনরায় দেওয়ানী মামলা করা আদালত অবমাননার শামিল। এছাড়া কন্যার ভরণপোষণ পিতার আইনি ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা, যা তালাকের অজুহাতে বন্ধ রাখা যায় না।
৬. মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Ratio)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং সংবিধিবদ্ধ আইন পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত সুদূরপ্রসারী পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন:
(এক) জারি আদালতের প্রকৃতি ও সীমা (Executing Court cannot travel beyond decree):
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ১৬(৪) ধারা অনুযায়ী জারি আদালতের দায়িত্ব অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও প্রশাসনিক প্রকৃতির (Strictly ministerial)। জারি আদালতের কাজ হলো ডিক্রিটিকে তার হুবহু রূপে বলবৎ করা। ইতিমধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া ডিক্রির কোনো সিদ্ধান্ত বা দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে নতুন কোনো প্রশ্ন তোলার এখতিয়ার জারি আদালতের নেই। অন্য কোনো আদালতে কোনো পৃথক মামলা বিচারাধীন থাকার কারণে একটি বৈধ ডিক্রি কার্যকর করা বন্ধ রাখার কোনো অবকাশ নেই।
(দুই) নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অলঙ্ঘনীয় অধিকার:
আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পিতা কর্তৃক ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক, স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ অধিকার। পিতা-মাতার মধ্যে বিবাহ বহাল আছে কি নেই, বা তাঁদের মধ্যে কোনো মামলা চলছে কি না—তার ওপর সন্তানের ভরণপোষণের দায় কখনো নির্ভর করে না। সুতরাং তালাক সংক্রান্ত কোনো বিরোধের অজুহাতে পিতা তাঁর অবোধ কন্যাসন্তানের মুখের গ্রাস আটকে রাখতে পারেন না।
(তিন) পারিবারিক আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ার ও চূড়ান্ততার নীতি:
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ ও দেনমোহরের বিষয়াদি কেবল পারিবারিক আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ারভুক্ত। উচ্চ আদালত কর্তৃক ইতিপূর্বে বিবাদীর তালাকের দাবি নাকচ হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত পক্ষগণের ওপর চূড়ান্তভাবে বাধ্যতামূলক (Binding)। আইনের শাসন অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে এমন কোনো সমান্তরাল মামলার আশ্রয় নিয়ে চূড়ান্ত ডিক্রির ফল ভোগ থেকে ডিক্রিদারকে বঞ্চিত করতে দেওয়া যায় না।
৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Decision & Directions)
সার্বিক পর্যালোচনায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ অধস্তন উভয় আদালতের আদেশে কোনো আইনগত বিচ্যুতি বা এখতিয়ারগত ত্রুটি খুঁজে পাননি।
- রিভিশন রুল খারিজ: দেওয়ানী রিভিশন রুল নং ১১৮/২০২৩ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন সাব্যস্ত করে কোনো খরচা ছাড়াই খারিজ (Discharged) করা হলো।
- অধস্তন আদালতের আদেশ বহাল: বাগেরহাটের জেলা জজ আদালত কর্তৃক পারিবারিক আপিল নং ৩০/২০২২-এর রায় এবং পারিবারিক জারি আদালতের ০৫.০৯.২০২২ তারিখের আদেশ সম্পূর্ণরূপে বহাল রাখা হলো।
- পাওনা পরিশোধের নির্দেশ: দেনাদার স্বামীকে নির্দেশ দেওয়া হলো তিনি যেন বাদিনী এবং তাঁর নাবালিকা কন্যার বকেয়া দেনমোহর ও সমস্ত বকেয়া ভরণপোষণ অবিলম্বে আইন অনুযায়ী পরিশোধ করেন।
- আর্থিক সংকটে কিস্তির সুবিধা: আদালত মানবিক দিক বিবেচনা করে উল্লেখ করেন যে, দেনাদার যদি জারি আদালতে তাঁর প্রকৃত আর্থিক সংকটের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন, তবে জারি আদালত তার সুবিবেচনায় ডিক্রিদারের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে উপযুক্ত কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের অনুমতি প্রদান করতে পারবে।
- নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: অধস্তন আদালতের নথিপত্র রায়ের অনুলিপিসহ অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হলো।
৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)
আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই যুগান্তকারী রায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিচে সন্নিবেশিত হলো:
| বিষয়বস্তু | মামলার বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার) মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman) |
| মামলা নম্বর ও শ্রেণি | দেওয়ানী রিভিশন নং ১১৮ / ২০২৩ (Civil Revision No. 118 of 2023) |
| পক্ষগণের নাম | মো: শেখ নজরুল ইসলাম (সাহেব) (দায়ক-আপিলকারী/দরখাস্তকারী) বনাম হালিমা খাতুন (ডিক্রিদার/প্রতিপক্ষ) |
| বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ | দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব মোহাম্মদ সহিদুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট প্রতিপক্ষ পক্ষে: মিস ইশরাত হাসান, মিস তানজিলা রহমান জুই এবং মিস ইফাত হাসান শাম্মী, অ্যাডভোকেট (জাতীয় আইনগত সহায়তা) |
| উৎস ও বিচারিক আদালত | জেলা জজ আদালত, বাগেরহাট (পারিবারিক আপিল নং ৩০/২০২২, রায়: ২৯.১১.২০২২) সহকারী জজ ও সদর পারিবারিক আদালত, বাগেরহাট (পারিবারিক মোকদ্দমা নং ০৮/২০১৬, পারিবারিক জারি মামলা নং ০৩/২০১৮) |
| শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ | শুনানি: ১৭ ও ১৮ জুন ২০২৬ চূড়ান্ত রায়: ২২ জুন ২০২৬ (০৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) |
| মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও বিষয় | Family Courts Ordinance, 1985 (Sections 5 & 16(4)), Muslim Family Laws Ordinance, 1961 (Section 7), Child Maintenance & Execution Powers |
| অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক |
📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড 🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল |

