রপ্তানিমুখী ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Back-to-Back L/C) মূল্যের অর্থ ফোর্সড লোন (Forced Loan) বানিয়ে অস্বাভাবিক চক্রবৃদ্ধি সুদ আরোপ করা সম্পূর্ণ বেআইনি: হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (Back-to-Back L/C)-এর অধীনে স্থানীয় বা বিদেশি কাঁচামাল সরবরাহকারীর বিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে, ব্যাংক কর্তৃক ঋণগ্রহীতার পূর্ব সম্মতি বা সুনির্দিষ্ট চুক্তি ব্যতীত একতরফাভাবে উক্ত দায়কে বাণিজ্যিক ‘ফোর্সড লোন’ (Forced Loan / PAD)-এ রূপান্তর করে তার ওপর অন্যায্য ও অননুমোদিত চক্রবৃদ্ধি সুদ (Compound Interest) ও পেনাল ইন্টারেস্ট আরোপ করা সম্পূর্ণ বেআইনি, এখতিয়ারবহির্ভূত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প। এই খাতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হলো মাস্টার এলসি (Master L/C) এবং তার বিপরীতে খোলা স্থানীয় ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Back-to-Back L/C)। ব্যাংকিং নীতিমালার সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো— ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মূল্য সমন্বয় হবে চূড়ান্ত রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের মাধ্যমে। কিন্তু অনেক সময় বিদেশি বায়ার কর্তৃক দেরিতে অর্থ প্রদান বা শিপমেন্ট বাতিলের কারণে এলসির অর্থ প্রত্যাবাসনে সামান্য বিলম্ব হলে ব্যাংকগুলো কোনো আলোচনা ছাড়াই রাতারাতি সেই ব্যাক-টু-ব্যাক দায়কে সাধারণ বাণিজ্যিক ‘ফোর্সড লোন’ (বাধ্যতামূলক ঋণ)-এ রূপান্তর করে দেয় এবং তার ওপর ১৮% থেকে ২৪% হারে উচ্চ চক্রবৃদ্ধি সুদ ও দণ্ড সুদ আরোপ করে কয়েক কোটি টাকার কৃত্রিম খেলাপি ঋণ সৃষ্টি করে। এই ধরনের অনৈতিক ব্যাংকিং চর্চার কারণে বহু সফল শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। অত্র যুগান্তকারী রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির অর্থ জোরপূর্বক ফোর্সড লোন বানানোর ব্যাংকিং অনিয়মের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।
মামলার বিবরণী থেকে প্রকাশ, রিট পিটিশনার মেসার্স দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড একটি স্বনামধন্য শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা। ইউরোপীয় বায়ারের মাস্টার এলসির বিপরীতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়। কাঁচামাল সময়মতো এলেও বৈশ্বিক করোনা মহামারি ও বায়ারের দেউলিয়াত্বের কারণে বায়ার থেকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট আসতে প্রায় ৮ মাস বিলম্ব হয়।
এমতাবস্থায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক পিএলসি কোনো প্রকার সমন্বয়ের সুযোগ না দিয়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি সহায়ক সার্কুলার লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে উক্ত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির প্রায় ১০ কোটি টাকার দায়কে ‘ফোর্সড লোন’ (PAD) হিসেবে চিহ্নিত করে। পরবর্তীতে ব্যাংক সেই কথিত ফোর্সড লোনের ওপর ১৮% হারে চক্রবৃদ্ধি সুদ, পেনাল্টি চার্জ ও অননুমোদিত ফি আরোপ করে মাত্র দেড় বছরে ঋণের পরিমাণ ১৮ কোটি টাকায় উন্নীত করে এবং পিটিশনারের সিআইবি স্ট্যাটাস ‘Defaulter’ দেখিয়ে তাদের সমস্ত বৈদেশিক বাণিজ্য এলসি ব্লক করে দেয়। সংক্ষুব্ধ হয়ে পোশাক কারখানাটি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে।
👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি
- ইউসিপিডিসি ৬০০ ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতির ব্যত্যয়: ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি আন্তর্জাতিক নিয়মে মাস্টার এলসির সাথে সংযুক্ত (Linked Instrument)। ব্যাংক নিজে এই ঋণপত্রের গ্যারান্টার। বায়ারের দেরির জন্য রপ্তানিকারকের ওপর একতরফা বাণিজ্যিক ঋণের রূপ দিয়ে চক্রবৃদ্ধি সুদ চাপানো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং প্র্যাকটিস (UCP 600) এর সুস্পষ্ট পরিপন্থী।
- বাংলাদেশ ব্যাংক বিআরপিডি মাস্টার সার্কুলারের লঙ্ঘন: বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি বিষয়ক সার্কুলারে পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে যে, তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয়ে কোনো বিলম্ব হলে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বা সাধারণ সুদে ঋণ সমন্বয়ের সুযোগ দিতে হবে; কোনো অবস্থাতেই তাৎক্ষণিক ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে পেনাল সুদ চাপানো যাবে না।
- শিল্প ধ্বংসের অপচেষ্টা: একতরফা সিআইবি ব্লকিংয়ের কারণে কারখানার প্রায় ৩,০০০ শ্রমিকের বেতন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং চলমান অন্যান্য বিদেশি রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এটি সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন।
👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান
- অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?
বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।
মাননীয় ডিভিশন বেঞ্চ আন্তর্জাতিক এলসি নীতিমালা, ব্যাংক-কোম্পানী আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যালোচনা করেন:
ক) ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণ নয়
আদালত উল্লেখ করেন, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে অর্থায়ন সাধারণ ক্যাশ ক্রেডিট (CC) বা টার্ম লোনের মতো নয়। এটি সরাসরি জাতীয় রপ্তানির সাথে জড়িত। ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল বায়ারের ব্যাংক থেকে অর্থ আদায়ের জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যানেল ব্যবহার করা। ঋণগ্রহীতাকে কোনো নোটিশ বা শুনানির সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে তার ওপর অস্বাভাবিক পেনাল সুদ আরোপ করা ব্যাংকের অযৌক্তিক ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার পরিচায়ক।
খ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবিসংবাদিত নজির
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত M/S Meghna Garments Ltd. vs. Bangladesh Bank (Writ Petition No. 16210 of 2025) এবং বিখ্যাত Janata Bank vs. M/S. Hoque Commercial Syndicate (First Appeal No. 178 of 2009) উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন:
“The unilateral conversion of an overdue Back-to-Back L/C liability into a commercial Forced Loan carrying compound penal interest without the consent of the exporter and in defiance of Bangladesh Bank guidelines is ultra vires, oppressive, and commercially unsustainable. The bank cannot penalize an exporter for global systemic delays beyond its control.”
গ) পেনাল্টি ও চক্রবৃদ্ধি সুদের বাতিলকরণ
আদালত নির্দেশ দেন যে, ব্যাংকের আরোপিত অতিরিক্ত ৮ কোটি টাকার কৃত্রিম চক্রবৃদ্ধি সুদ ও পেনাল চার্জ আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য।
মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: সার্বিক আইনি ও অর্থনৈতিক পর্যালোচনার পর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্জুর করেন। আদালত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক কর্তৃক আরোপিত সমস্ত চক্রবৃদ্ধি সুদ, পেনাল্টি চার্জ এবং ফোর্সড লোনের অতিরিক্ত অর্থ বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করেন।
আদালত নির্দেশ দেন যে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেবল মূল ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আসল অর্থ সরকারি সাধারণ রপ্তানি রেয়াতি সুদে (Concessional Export Interest Rate) সমন্বয় করার জন্য পিটিশনারকে আগামী ২ বছরের সহজ কিস্তির সুবিধা প্রদান করবে। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হলো যে পিটিশনার দেশ গার্মেন্টস লিমিটেডের সিআইবি ডাটা অবিলম্বে ‘Unclassified’ করতে হবে যাতে কারখানার নিয়মিত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ও উৎপাদন কার্যক্রম কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই পরিচালিত হতে পারে।
- সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: রপ্তানিমুখী ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Back-to-Back L/C) মূল্যের অর্থ ফোর্সড লোন (Forc… সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
- সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
- প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
- নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
- দেরির কারণ সাথে সাথে ব্যাংককে জানান: বিদেশি বায়ারের পেমেন্টে বিলম্ব হলে সাথে সাথে বায়ারের ইমেইল, শিপমেন্ট ট্র্যাকিং ও দলিল সংযুক্ত করে ব্যাংককে লিখিত চিঠি দিন যাতে ফোর্সড লোন সৃষ্টি করতে না পারে।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের সুযোগ নিন: বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানিমুখী খাতের জন্য প্রতি বছর ডেফার্ড এলসি ও ঋণ সমন্বয়ের বিশেষ সার্কুলার জারি করে; সেই সার্কুলার অনুযায়ী পুনঃঅর্থায়নের আনুষ্ঠানিক আবেদন করুন।
- একতরফা সুদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে প্রতিকার: ব্যাংক যদি অন্যায্য পেনাল সুদ চাপিয়ে সিআইবি বন্ধ করে দেয়, তবে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়েরের মাধ্যমে দ্রুত এলসি চালুর আদেশ ও সুদ বাতিলের ডিক্রি লাভ করা সম্ভব।
- মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
- বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।

