সরকারি উন্নয়ন কাজে বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি প্রমাণ ব্যতীত ঠিকাদারের জামানত (Security Deposit) ও বিলের অর্থ একতরফা বাজেয়াপ্ত করা বেআইনি, চুক্তি আইনের ৭৪ ধারা নিয়ে হাইকোর্টের রায়

মামলার মৌলিক তথ্যাবলি ও বিচারিক পরিচিতি

মামলার নাম ও নম্বর: ফার্স্ট আপিল নং ১৮৫/২০১৯ (First Appeal No. 185 of 2019)
আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানি আপিল এখতিয়ার)
বিচারপতিবৃন্দ: মাননীয় বিচারপতি শেখ আব্দুল আউয়াল এবং মাননীয় বিচারপতি মো. রফিজুল ইসলাম
পক্ষগণ: মেসার্স মডার্ন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড (আপিলকারী-ঠিকাদার) বনাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ও অন্য (রেসপনডেন্ট পক্ষ)
মূল আইন ও ধারা: চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ধারা ৭৩ ও ৭৪; পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ (PPA); সরকারি পাওনা আদায় আইন, ১৯১৩
মূল আইনি সিদ্ধান্ত: সরকারি বা আধা-সরকারি উন্নয়ন চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে বাস্তব আর্থিক ক্ষতির (Actual Loss) সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য হিসাব প্রমাণ ছাড়া কেবল চুক্তিভঙ্গের পেনাল্টি হিসেবে ঠিকাদারের জমাকৃত জামানতের অর্থ (Security Deposit / Performance Security) এবং সম্পাদিত কাজের বকেয়া বিল একতরফাভাবে বাজেয়াপ্ত করা চুক্তি আইনের ৭৪ ধারা ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে কোনো নাগরিকের সম্পদ আটকে সমৃদ্ধ হতে পারে না (Doctrine of Unjust Enrichment)।

১. বিরোধের পটভূমি ও মামলার ঘটনা

বাংলাদেশের সরকারি উন্নয়ন কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরকারের বিভিন্ন প্রকৌশল অধিদপ্তরের (যেমন সওজ, এলজিইডি, পিডব্লিউডি) মধ্যে প্রায়শই চুক্তি বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্তকরণ নিয়ে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি প্রচলিত চর্চা গড়ে উঠেছে যে, কোনো প্রকল্পে সময় বৃদ্ধি বা বিলম্ব ঘটলেই তারা ঠিকাদারের সাথে চুক্তি বাতিল করে এবং চুক্তিপত্রের শর্তের সুযোগ নিয়ে ঠিকাদারের কোটি কোটি টাকার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, জামানতের টাকা (Security Deposit) এবং সম্পাদিত কাজের রানিং বিল একতরফাভাবে বাজেয়াপ্ত (Forfeiture) করে নেয়। অত্র রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ চুক্তি আইনের ৭৩ ও ৭৪ ধারার আলোকে রাষ্ট্রের এই ধরনের স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছেন।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী থেকে প্রকাশ, আপিলকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মডার্ন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) কর্তৃক আহ্বানকৃত একটি জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের কার্যাদেশ (Work Order) লাভ করে। চুক্তিমূল্য ছিল ২৫ কোটি টাকা। ঠিকাদার কার্যাদেশ গ্রহণের পর নির্ধারিত পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা দেয় এবং প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করে।

কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্প এলাকার জমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতা, নকশা পরিবর্তন এবং বর্ষা মৌসুমের ভয়াবহ বন্যার কারণে কাজের গতি কিছুটা শ্লথ হয়। ঠিকাদার কয়েক দফা সময় বৃদ্ধির আবেদন জানায়। কিন্তু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কোনো বাস্তব সমীক্ষা বা ক্ষতিপূরণের মূল্যায়ন না করেই হঠাৎ এক নোটিশে ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করে দেয়। একই সাথে ঠিকাদারের জমাকৃত ২ কোটি টাকার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত করে এবং ইতিপূর্বে সম্পাদিত কাজের প্রায় ৩ কোটি টাকার বকেয়া বিল আটকে রাখে। সংক্ষুব্ধ ঠিকাদার পাওনা আদায়ের জন্য যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মানি স্যুট দায়ের করে।

২. বিচারিক আদালতের রায়

যুগ্ম জেলা জজ আদালতে সরকারপক্ষ দাবি করে যে, চুক্তিপত্রের ক্লজ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হলে সরকারের অধিকার রয়েছে সম্পূর্ণ সিকিউরিটি ডিপোজিট বাজেয়াপ্ত করা এবং চুক্তিভঙ্গের কারণে কোনো বিল পরিশোধ না করা। বিচারিক আদালত চুক্তিপত্রের উক্ত একতরফা শর্তকে প্রাধান্য দিয়ে ঠিকাদারের মানি স্যুট খারিজ করে দেন। তদ্বিরুদ্ধে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হাইকোর্ট বিভাগে এই নিয়মিত দেওয়ানি ফার্স্ট আপিল দায়ের করে।

৩. হাইকোর্টে আপিলকারীর আইনি যুক্তি

আপিলকারীর পক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি বিস্তারিত আইনি সওয়াল উপস্থাপন করেন:

  1. চুক্তি আইনের ৭৪ ধারার সুরক্ষার সীমা: চুক্তি আইন, ১৮৭২ এর ৭৪ ধারায় বলা হয়েছে— চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট পেনাল্টি বা জরিমানা উল্লেখ থাকলেও আদালত কেবল “যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ” (Reasonable Compensation) দিতে পারে। বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি প্রমাণ না করে পুরো জামানত বা সম্পাদিত কাজের বিল বাজেয়াপ্ত করা একটি অবৈধ শাস্তি (Penalty) যা আইন দ্বারা নিষিদ্ধ।
  2. সম্পাদিত কাজের মূল্য বাজেয়াপ্ত করা বেআইনি: ঠিকাদার ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে যা সরকার ও জনগণ ভোগ করছে। সম্পাদিত কাজের বিল আটকে রাখা চুক্তি আইনের ৭০ ধারার (Obligation of person enjoying benefit of non-gratuitous act) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাষ্ট্র অন্যায়ভাবে অন্যের অর্থে ধনী হতে পারে না (Unjust Enrichment)।
  3. দেরির জন্য রাষ্ট্রীয় দায়: সময়মতো জমি বুঝিয়ে দিতে না পারা এবং নকশা পরিবর্তনের দায় সওজ কর্তৃপক্ষের ছিল। সুতরাং ঠিকাদারকে এককভাবে দায়ী করা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

৪. সরকার ও সওজ কর্তৃপক্ষের আইনি অবস্থান

রাষ্ট্রপক্ষে বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি দেখান যে, চুক্তি একটি দ্বিপাক্ষিক দলিল এবং ঠিকাদার স্বেচ্ছায় সকল শর্তে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তিতে স্পষ্ট লেখা ছিল ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। অতএব সরকারি কোষাগার রক্ষা করতে এই বাজেয়াপ্তকরণ সম্পূর্ণ আইনসঙ্গত ছিল।

৫. হাইকোর্ট বিভাগের গভীর বিচারিক বিশ্লেষণ

মাননীয় ডিভিশন বেঞ্চ চুক্তি আইনের ধারা ৭৩ ও ৭৪, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা এবং সর্বোচ্চ আদালতের বহু নজির বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন:

ক) চুক্তি আইনের ৭৪ ধারা: জরিমানা বনাম যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ

আদালত উল্লেখ করেন, চুক্তি আইনের ৭৪ ধারা খুব পরিষ্কারভাবে ক্ষতিপূরণ ও শাস্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। চুক্তিতে যদি কোনো শর্ত থাকে যে চুক্তিভঙ্গ হলে কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট অংকের টাকা বা সম্পূর্ণ জামানত হারাবে, তবে আইন সেই শর্তকে একটি “পেনাল্টি ক্লজ” হিসেবে গণ্য করে। পেনাল্টি ক্লজ থাকলেই পুরো টাকা বাজেয়াপ্ত করার কোনো স্বত্ব তৈরি হয় না। সরকারকে আদালতে এসে ইতিবাচক সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে ঠিকাদারের দেরির কারণে সরকারের ঠিক কত টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি প্রমাণ ছাড়া এক পয়সাও বাজেয়াপ্ত করার এখতিয়ার সরকারের নেই।

খ) সম্পাদিত কাজের বিল আত্মসাৎ রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না

মাননীয় আদালত ক্ষোভের সাথে অভিমত দেন যে, ঠিকাদার যে ৭০ শতাংশ রাস্তা নির্মাণ করেছে তা দৃশ্যমান এবং জনগণ তা ব্যবহার করছে। ঠিকাদারের পাথর, রড ও সিমেন্টের মূল্য পরিশোধ না করে বকেয়া ৩ কোটি টাকার বিল আটকে রাখা রাষ্ট্রের জন্য চরম অনৈতিক ও বেআইনি কাজ। রাষ্ট্র কোনো মুনাফাখোর বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট নয়; রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক ও স্বচ্ছ। কাজ গ্রহণ করে তার মূল্য না দেওয়া চুক্তি আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

গ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নজির

হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত Government of Bangladesh vs. M/S. Azizur Rahman & Others (46 DLR (AD) 19), Kailash Nath Associates vs. Delhi Development Authority (2015) 4 SCC 136 এবং Fateh Chand vs. Balkishan Dass (AIR 1963 SC 1405) উদ্ধৃত করেন। আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন:

“Forfeiture of earnest money or security deposit under a contract can only be justified if actual loss or damage is proved by the employer. Where no loss is established, the forfeiture of security money constitutes a penalty under Section 74 of the Contract Act and is wholly illegal. The government cannot unjustly enrich itself by retaining unpaid bills for work already executed.”

অত্র মামলায় সওজ কর্তৃপক্ষ কোনো নিরপেক্ষ অডিট বা ক্ষতির হিসাব আদালতে দাখিল করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

৬. চূড়ান্ত রায় ও ডিক্রি প্রদান

সার্বিক আইনি ও বাস্তব পর্যালোচনার পর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ফার্স্ট আপিলটি মঞ্জুর করেন। নিম্ন আদালতের খারিজের রায় ও ডিক্রি রদ ও বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মানি স্যুটটি ডিক্রি করা হয়।

আদালত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন যে, তারা ঠিকাদারের সম্পাদিত কাজের বকেয়া ৩ কোটি টাকার বিল এবং বাজেয়াপ্তকৃত ২ কোটি টাকার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি— সর্বমোট ৫ (পাঁচ) কোটি টাকা অত্র রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি প্রাপ্তির তারিখ হতে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে ঠিকাদারকে পরিশোধ করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরকারি বাণিজ্যিক হারে বার্ষিক ৮% সাধারণ সুদ প্রদেয় হবে।

৭. সরকারি ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের জন্য আইনি দিকনির্দেশনা

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button