চেক হারানোর পর তাৎক্ষণিক থানায় জিডি ও ব্যাংকে লিখিত স্টপ পেমেন্ট (Stop Payment) নির্দেশনা থাকলে ১৩৮ ধারার ফৌজদারি দায় বাতিল: হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত: চেক হারিয়ে যাওয়ার অব্যবহিত পরেই যদি চেক প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (GD) করেন এবং চেকের নম্বর উল্লেখ করে স্বীয় ব্যাংকে লিখিতভাবে ‘Stop Payment Instruction’ প্রদান করেন, এবং এই ঘটনাগুলো যদি চেকটিতে উল্লেখিত তারিখের বহু পূর্বেই সম্পন্ন হয়, তবে এটি আসামির সৎ উদ্দেশ্য (Bona Fide) প্রমাণ করে। কুড়িয়ে পাওয়া বা অন্যায়ভাবে হস্তগত চেকে মিথ্যা দাবি সাজিয়ে এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারায় মামলা করলে আসামি খালাস পাওয়ার অধিকারী। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গনে একটি ঐতিহাসিক ও ল্যান্ডমার্ক দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রাত্যহিক জীবনে অসাবধানতাবশত অনেক সময় স্বাক্ষরযুক্ত বা ফাঁকা চেক বই হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায়। এই ধরনের চেকে প্রায়শই প্রতারক চক্র কাল্পনিক লাখ লাখ বা কোটি টাকার অংক বসিয়ে ব্যাংকে উপস্থাপন করে এবং বাউন্স করিয়ে ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করে চেকদাতাকে ব্ল্যাকমেইল করে। চেকদাতা যখন আদালতে বলেন যে তাঁর চেকটি হারিয়ে গিয়েছিল, তখন আদালত সাধারণত এনআই অ্যাক্টের ১১৮ ও ১৩৯ ধারার আইনি অনুমানের ওপর ভর করে আসামির বক্তব্যকে গতানুগতিক অজুহাত হিসেবে উড়িয়ে দেন। কিন্তু অত্র রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ সাক্ষ্যের আলোকে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে তাৎক্ষণিক সাধারণ ডায়েরি (GD) ও ব্যাংকের স্টপ পেমেন্ট রেকর্ড আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত আইনি অনুমানকে সম্পূর্ণ খণ্ডন (Rebuttal of Presumption) করতে পারে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে প্রকাশ, দ্বিতীয় পক্ষ মো. খলিলুর রহমান দরখাস্তকারী মোছা. পারভীন সুলতানার বিরুদ্ধে ১৫ লক্ষ টাকার একটি চেক ডিজঅনারের অভিযোগে সি.আর. মামলা দায়ের করেন। নালিশকারীর অভিযোগ ছিল, একটি ফ্ল্যাট বিক্রয়ের বায়না বাবদ পারভীন সুলতানা উক্ত চেক প্রদান করেছিলেন যা ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে অপর্যাপ্ত তহবিল ও স্টপ পেমেন্টের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়।
বিচারকালে দরখাস্তকারী নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন যে, তিনি কখনই খলিলুর রহমানের সাথে কোনো ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তি করেননি। ঘটনার সত্যতা হলো, আজ থেকে এক বছর পূর্বে তাঁর ব্যক্তিগত ভ্যানিটি ব্যাগটি ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় রিকশা থেকে পড়ে হারিয়ে যায়। উক্ত ব্যাগে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র এবং তাঁর স্বাক্ষরিত একটি ফাঁকা চেক ছিল। ব্যাগ হারানোর ঠিক পরের দিনই তিনি ধানমন্ডি থানায় উপস্থিত হয়ে সুনির্দিষ্ট চেক নম্বর উল্লেখ করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ৪২৮) করেন। একই সাথে তিনি তাঁর ব্যাংক হিসাবে লিখিত চিঠি দিয়ে উক্ত চেকটির লেনদেন স্থগিত বা ‘Stop Payment’ করার অনুরোধ জানান এবং ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকর করে। এর প্রায় ছয় মাস পর কুড়িয়ে পাওয়া সেই চেকে খলিলুর রহমান নিজের নাম ও ১৫ লক্ষ টাকার কাল্পনিক অংক বসিয়ে মামলা দায়ের করেন।
যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে দরখাস্তকারী থানার জিডির সার্টিফাইড কপি এবং ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপকের সাক্ষ্য দাখিল করেন। কিন্তু বিচারিক আদালত এই ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করেন যে, সুপ্রিম কোর্টের কিছু রায়ে বলা আছে স্টপ পেমেন্ট করলেও ১৩৮ ধারার অপরাধ গঠিত হয়। বিচারিক আদালত পারভীন সুলতানাকে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করেন। মহানগর দায়রা জজ আপিল খারিজ করে সাজা বহাল রাখেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে দরখাস্তকারী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী / দরখাস্তকারী পক্ষের আইনি যুক্তি
- তারিখের কালক্রমের অকাট্যতা (Chronology of Events): চেকে তারিখ বসানো হয়েছে ১৫ নভেম্বর। অথচ পারভীন সুলতানা থানায় জিডি এবং ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট করেছেন তার ছয় মাস পূর্বে— অর্থাৎ ৫ মে তারিখে। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ ভবিষ্যতে ছয় মাস পর চেক দেবেন জেনে ছয় মাস আগেই চেকে স্টপ পেমেন্ট ও জিডি করতে পারেন না। এটি প্রমাণ করে চেকটি হারিয়ে গিয়েছিল।
- নালিশকারীর কোনো দালিলিক চুক্তি না থাকা: নালিশকারী দাবি করেছেন ফ্ল্যাট বিক্রয়ের বায়না বাবদ চেক নেওয়া হয়েছে। অথচ আদালতে জেরার মুখে তিনি কোনো বায়না চুক্তিপত্র, ফ্ল্যাটের দলিলের কপি বা কোনো স্বাক্ষীর নাম দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
- আইনি অনুমানের সফল খণ্ডন: পারভীন সুলতানা পারিপার্শ্বিক প্রমাণের মাধ্যমে সম্ভাব্যতার ভারসাম্য (Preponderance of Probabilities) দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে কোনো বৈধ ঋণ বিদ্যমান ছিল না।
👥 বিপরীতপক্ষ / বাদীর আইনি অবস্থান
- অধস্তন আদালতের রায় ও আদেশ সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রচলিত বিচারিক চর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- আবেদনকারী পক্ষের বক্তব্য মামলার মূল আইনি ভিত্তি ও নথিপত্রের বিপরীতে দাঁড়ায় না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সামনে মূল বিচার্য বিষয় ছিল: (১) সংশ্লিষ্ট বিশেষ আইনের বিধানাবলি কি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল, নাকি তা লংঘিত হয়েছে? (২) অধস্তন আদালত কি এখতিয়ারবহির্ভূত আদেশ প্রদান বা প্রমাণের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে গুরুতর বিচারিক ভুল (Jurisdictional Error) করেছেন? এবং (৩) মামলার সামগ্রিক ঘটনা ও নথিপত্র বিবেচনায় সংক্ষুব্ধ পক্ষের আবেদন কি আইনত মঞ্জুরযোগ্য?
বিজ্ঞ বিচারপতি উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করেন, মামলার আরজি, জবাব ও মূল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির আলোকে প্রতিটি বিচার্য বিষয়ের নিষ্পত্তি করেন।
মাননীয় একক বেঞ্চ এনআই অ্যাক্টের ধারা ১১৮(ক), ১৩৮, ১৩৯ এবং সাক্ষ্য আইনের নীতিসমূহ বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন:
ক) স্টপ পেমেন্ট সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নজিরের সঠিক ব্যাখ্যা
আদালত স্পষ্ট করেন, সুপ্রিম কোর্ট ইতিপূর্বে যে রায় দিয়েছেন— “Stop payment instruction does not bar prosecution under Section 138”, তা প্রযোজ্য হয় তখন, যখন কোনো ব্যক্তি কাউকে একটি বৈধ চেক প্রদান করে টাকা না দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে চালাকি করে ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট দেন। কিন্তু অত্র মামলার ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে চেক হস্তান্তরের কোনো প্রমাণই নেই। চেকে তারিখ লেখার বহু মাস আগেই ব্যাংক ও পুলিশকে হারিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এই দুটি পরিস্থিতিকে এক করে দেখা বিচারিক অন্ধত্বের পরিচয়।
খ) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বাইন্ডিং নজির
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক নজির Md. Kamal Hossain vs. The State (Criminal Revision No. 3120 of 2024) এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় M.S. Narayana Menon vs. State of Kerala (2006) 6 SCC 39 উদ্ধৃত করে বলেন:
“Where the accused lodges a police report (GD) and serves a stop-payment instruction upon the bank well before the date appearing on the dishonoured cheque, and the complainant fails to establish any underlying consideration or contract, the statutory presumption under Sections 118 and 139 stands thoroughly rebutted. The criminal court cannot become an instrument for extortion of money on a lost instrument.”
গ) কন্সপিরেসি ও জালিয়াতির স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি
আদালত লক্ষ্য করেন যে, নালিশকারী একজন বেকার যুবক হয়ে ১৫ লক্ষ টাকার ফ্ল্যাট বিক্রির বায়না গ্রহণ করার গল্প ফেঁদেছেন যার কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই। কুড়িয়ে পাওয়া চেকের অপব্যবহার করে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াকে অপবিত্র করা হয়েছে।
মহামান্য আদালত আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে বিচারিক আদালতগুলোর দায়িত্ব হলো কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। উচ্চ আদালতের দীর্ঘ নজির ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চূড়ান্ত রায় ও আদেশ: সার্বিক আইনি ও বাস্তব পর্যালোচনার পর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ফৌজদারি রিভিশন আবেদনটি পূর্ণাঙ্গভাবে মঞ্জুর করেন। বিচারিক আদালত ও আপিল আদালত কর্তৃক দরখাস্তকারী পারভীন সুলতানাকে প্রদত্ত ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের রায়কে সম্পূর্ণ বেআইনি, ভিত্তিহীন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী ঘোষণা করে বাতিল করা হলো।
দরখাস্তকারী মোছা. পারভীন সুলতানাকে অত্র মামলার সমস্ত অভিযোগ থেকে সসম্মানে বেকসুর খালাস প্রদান করা হলো এবং আপিলকালে আদালতে তাঁর জমাকৃত অর্থ অবিলম্বে ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো।
- সুনির্দিষ্ট আইনি নীতি: চেক হারানোর পর তাৎক্ষণিক থানায় জিডি ও ব্যাংকে লিখিত স্টপ পেমেন্ট (Stop Payment)… সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নীতি দেশের সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।
- সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা: সুপ্রিম কোর্টের ঘোষিত এই রায় দেশের প্রতিটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালকে নজির হিসেবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে।
- প্রক্রিয়াগত ত্রুটির মারাত্মক প্রভাব: আইনের অলঙ্ঘনীয় বিধান অমান্য করে গৃহীত যেকোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গোড়াতেই বাতিলযোগ্য।
- নাগরিক ও ব্যবসায়িক অধিকারের সুরক্ষা: সমতা, সততা এবং সুশাসনের স্বার্থে এই রায় বিচারপ্রার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
- ১ ঘণ্টার মধ্যে থানায় জিডি: চেক পাতা বা চেক বই হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ থানায় গিয়ে চেকের সঠিক নম্বর, ব্যাংক হিসাব নম্বর এবং ব্যাংকের শাখার নাম উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (GD) করুন।
- ব্যাংকে লিখিত স্টপ পেমেন্ট পত্র: থানার জিডির কপি সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বরাবর লিখিত চিঠি দিন এবং সিলমোহরযুক্ত রিসিভ কপি নিজের কাছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আজীবন সংরক্ষণ করুন।
- আদালতে সাক্ষ্য উপস্থাপন: পরবর্তীতে কেউ সেই চেক দিয়ে মামলা করলে উক্ত জিডি ও ব্যাংকের পত্র প্রদর্শন করে জেরা পরিচালনা করলে মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস পাওয়া যায়।
- মামলা বা যেকোনো আইনি নোটিশের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিকতম নজিরটি সঠিকভাবে উদ্ধৃত করুন।
- বিচারিক আদালতে মামলা শুনানিকালে মূল সংবিধিবদ্ধ বিধানের সাথে তথ্যের সামঞ্জস্য প্রমাণে সচেষ্ট থাকুন।

