অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ উত্তোলন ও স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা: স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইন, ২০১৭ ও হাইকোর্টের নজির

📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো দেওয়ানী মোকদ্দমায় বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশের কার্যকারিতা যখন আপিল আদালত কর্তৃক নিঃশর্তভাবে স্থগিত (Stayed) করা হয়, তখন উক্ত স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকাবস্থায় সংবিধিবদ্ধ এল.এ. কেসের আওতায় ক্ষতিপূরণের অর্থ উত্তোলন করা কোনোভাবেই আদালত অবমাননা বা ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে না। আদালত সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন যে, ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’-এর ৮(২), ১১ এবং ৪৭ ধারা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংবিধিবদ্ধ পরিকাঠামো (Self-contained statutory framework)। অধিগ্রহণকৃত জমির রোয়েদাদ তৈরি, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একচ্ছত্র এখতিয়ার ডেপুটি কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের, যেখানে ৪৭ ধারামতে দেওয়ানী আদালতের হস্তক্ষেপ স্পষ্টভাবে বারিত। আপিল আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশের অস্তিত্ব সত্ত্বেও পক্ষগণকে উত্তোলিত ৫৭ লাখ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ফেরত জমাদান ও ফৌজদারি কার্যক্রমের কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান বিচারিক মনের চরম অপ্রয়োগ ও এখতিয়ারবহির্ভূত।

১. বিরোধের পটভূমি ও অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস (Background & Injunction)

আলোচ্য দেওয়ানী রিভিশন মোকদ্দমাটির সূচনা খুলনা জেলার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০২২ সালে দায়েরকৃত ৫০ নম্বর স্বত্ব মোকদ্দমা (Title Suit No. 50 of 2022) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন শেখ নাসিম উদ্দিন (বাদী-প্রতিপক্ষ) সহ-শরিকদের মধ্যে বাটোয়ারা ও নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনায়।

মোকদ্দমা চলাকালীন বাদিপক্ষ জানতে পারেন যে, নালিশি ভূমির অংশবিশেষ সরকার কর্তৃক এল. এ. কেইস (সাধারণ) নং ০৩/২০২০-২১-এর অধীনে অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং উক্ত অধিগ্রহণে ৩০ নম্বর রোয়েদাদ (Award No. 30) মূলে ৫৭,৬৮,৬২৯.৫৩ (সাতান্ন লাখ আটষট্টি হাজার ছয়শত উনত্রিশ টাকা ৫৩ পয়সা) ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ হয়েছে। বাদিপক্ষ উক্ত অর্থ উত্তোলন রোধের জন্য দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারামতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন দাখিল করেন।

বিজ্ঞ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত বিগত ০১ জুন ২০২৩ তারিখে ২৬ নম্বর আদেশে বাদিপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করে ১-৩ নম্বর বিবাদীগণকে উক্ত ৫৭.৬৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হতে এবং ৪-৭ নম্বর সরকারি বিবাদীগণকে উক্ত অর্থ ছাড় প্রদান করা হতে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন।

২. আপিল আদালতের স্থগিতাদেশ ও পরবর্তী সংঘাত (Stay Order & Subsequent Conflict)

উক্ত নিষেধাজ্ঞার আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে আমেনা খাতুন পপি এবং অন্যান্য বিবাদীগণ (দরখাস্তকারীগণ) খুলনার জেলা জজ আদালতে দেওয়ানী বিবিধ আপিল নং ৩৭/২০২৩ (Miscellaneous Appeal No. 37 of 2023) দায়ের করেন। আপিল আদালত শুনানান্তে বিগত ২৮ আগস্ট ২০২৩ তারিখে ৬ নম্বর আদেশে বিচারিক আদালতের ০১.০৬.২০২৩ তারিখের নিষেধাজ্ঞার আদেশটির কার্যকারিতা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরাসরি স্থগিত (Stay of operation) করে দেন।

আপিল আদালতের উক্ত বৈধ স্থগিতাদেশ বলবৎ থাকাবস্থায় বিবাদী-দরখাস্তকারীগণ জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা হতে বিধি মোতাবেক ৩০ নং রোয়েদাদের ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করেন। এর দীর্ঘ ৭ মাস পর, বিগত ১১ মার্চ ২০২৪ তারিখে বাদিপক্ষ আপিল আদালতে ১৫১ ধারামতে দরখাস্ত দিয়ে অভিযোগ করেন যে, বিবাদীগণ আদালতের স্থগিতাদেশের অপব্যবহার করে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নিয়ে মামলার মূল বিষয়বস্তু নষ্ট করে দিয়েছেন।

উক্ত দরখাস্তের ওপর শুনানি গ্রহণ করে খুলনার সিনিয়র জেলা জজ বিগত ১৯ মে ২০২৪ তারিখে ১৩ নম্বর আদেশে এক মারাত্মক ও শাস্তিমূলক নির্দেশ প্রদান করেন। জেলা জজ আদেশ দেন যে—বিবাদীগণ আদালতের স্থগিতাদেশ ভঙ্গ করে টাকা তুলে নিয়ে আদালত অবমাননা করেছেন, সুতরাং আগামী ০৪.০৮.২০২৪ তারিখের মধ্যে উত্তোলিত ৫৭.৬৮ লাখ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে আদালতে জমা দিতে হবে এবং কেন তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হবে না তার কারণ দর্শাতে হবে! এই নজিরবিহীন আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীগণ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ৩১৯৬/২০২৪ দায়ের করেন।

৩. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)

উচ্চ আদালতে শুনানিকালে উভয় পক্ষ অত্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী আইনি অবস্থান গ্রহণ করেন।

🏛️ দরখাস্তকারী-বিবাদীপক্ষের বক্তব্য ও যুক্তি

  • বৈধ স্থগিতাদেশের ফল: আপিল আদালত ২৮/০৮/২০২৩ তারিখে নিষেধাজ্ঞার ওপর নিঃশর্ত স্থগিতাদেশ দেওয়ায় টাকা উত্তোলনে কোনো আইনগত বাধা ছিল না।
  • অবমাননার অভিযোগ ভিত্তিহীন: কার্যকর স্থগিতাদেশের ভিত্তিতে এল.এ. শাখা থেকে টাকা নেওয়া কোনোভাবেই আদালত অবমাননা বা ফৌজদারি অপরাধ নয়।
  • অধিগ্রহণ আইনের এখতিয়ার: ২০১৭ সালের আইনের ৮(২), ১১ ও ৪৭ ধারা মতে ক্ষতিপূরণ বণ্টন ও রোয়েদাদের বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার জেলা প্রশাসকের।
  • আপিল আদালতের স্ববিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি: জেলা জজ স্বয়ং স্থগিতাদেশ দিয়ে পরবর্তীতে তাকেই ‘আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন’ আখ্যা দেওয়া চরম স্ববিরোধী।
  • টাকা জমার আদেশ বেআইনি: সংবিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ায় গৃহীত বৈধ অর্থ পে-অর্ডারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ানী কার্যবিধির এখতিয়ারবহির্ভূত।

🛡️ বাদি-প্রতিপক্ষপক্ষের জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  • আদালতকে বিভ্রান্ত করা: বিবাদীগণ আদালতকে জানিয়েছিলেন বাদী যেন টাকা না পায় সেজন্য স্থগিত চান, অথচ নিজেরা টাকা তুলে প্রতারণা করেছেন।
  • মামলার বিষয়বস্তু ধ্বংস: বাটোয়ারা মামলার বিচার চলাকালে এজমালি জমির অধিগ্রহণের সম্পূর্ণ টাকা একতরফা তুলে নেওয়া চরম বেআইনি।
  • ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা: প্রতারণামূলক আচরণের বিরুদ্ধে আদালত ১৫১ ধারায় পূর্বের অবস্থা পুনর্বহাল (Status quo ante) করতে সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান।
  • আইনি নজির (35 DLR (AD) 42): আপিল বিভাগের নজির অনুযায়ী আদালত যে কোনো পর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিয়ে অর্থ বা সম্পত্তি ফেরত আনতে পারে।
  • জেলা জজের আদেশ ন্যায়সংগত: সুবিচারের স্বার্থে এবং বিচার প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধে টাকা জমা ও কারণ দর্শানোর আদেশ সঠিক।

৪. মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পর্যালোচিত আইনি প্রশ্নসমূহ (Core Legal Issues)

হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চের শুনানিতে নিম্নলিখিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিরোধসমূহ নিষ্পত্তির জন্য চিহ্নিত হয়:

  1. স্থগিতাদেশের আইনগত ফলাফল (Effect of Stay Order): আপিল আদালত যখন কোনো নিষেধাজ্ঞার আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে, তখন কি নিষেধাজ্ঞাটি আইনত অকার্যকর থাকে এবং এর অধীনে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হতে পারে?
  2. অধিগ্রহণ আইনের স্বয়ংসম্পূর্ণ এখতিয়ার ও দেওয়ানী আদালতের বাধা: ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’-এর ৮(২), ১১ ও ৪৭ ধারার আলোকে দেওয়ানী আদালত কি জেলা প্রশাসকের রোয়েদাদভুক্ত ক্ষতিপূরণ বণ্টনে সমান্তরাল এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে?
  3. আপিল আদালতের নথিবহির্ভূত অনুমান ও শাস্তিমূলক আদেশ: স্থগিতের দরখাস্তে যে বক্তব্য উল্লেখই ছিল না, তার ওপর ভিত্তি করে পক্ষগণের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থার হুমকি ও টাকা জমার নির্দেশ কি বিচারিক বিচ্যুতির শামিল?

৫. আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দের বক্তব্য ও আইনি তর্ক (Submissions & Arguments)

দরখাস্তকারী পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী জনাব পার্থ সারথী মণ্ডল (Mr. Partha Sarathi Mondal) নিবেদন করেন যে, জেলা জজের ১৩ নম্বর আদেশটি সম্পূর্ণ তথ্যবিকৃতি ও নথিবহির্ভূত অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জেলা জজ আদেশে লিখেছেন যে বিবাদীগণ নাকি দরখাস্তে বলেছিলেন ‘বাদী যেন টাকা তুলতে না পারে সেজন্য স্থগিত চাই’। অথচ দরখাস্তকারীর ৩১.০৭.২০২৩ তারিখের স্থগিতের দরখাস্তের কোথাও এরূপ কোনো বক্তব্য ছিলই না! বিজ্ঞ কৌঁসুলি জোর দিয়ে বলেন, জেলা জজ আদালত ২৮.০৮.২০২৩ তারিখে বিচারিক আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশটি স্থগিত করেছিলেন। আইনগতভাবে নিষেধাজ্ঞা যখন স্থগিত, তখন সরকারি এল.এ. শাখা থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষতিপূরণ উত্তোলন কোনো অবস্থাতেই অপরাধ বা আদালত অবমাননা হতে পারে না। তদুপরি ২০১৭ সালের অধিগ্রহণ আইনের ৪৭ ধারামতে এই ক্ষতিপূরণ নিয়ে দেওয়ানী আদালতের হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বারিত।

বিপরীতে প্রতিপক্ষ বাদিপক্ষে বিজ্ঞ কৌঁসুলি জনাব মো: আলমগীর মোস্তাফিজুর রহমান, খন্দকার আশরাফুল আলম এবং জনাব মনজুরুল হক যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, এটি একটি শরিকানা বাটোয়ারা মামলা। বিবাদীগণ আপিল আদালত থেকে কৌশলে স্থগিতাদেশ নিয়ে রাতারাতি সরকারি ফান্ড থেকে পৌনে এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারা এবং জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২১ ধারা অনুযায়ী আপিল আদালতের নিজস্ব ভুল সংশোধন ও পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনার (Restitution of status quo ante) পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। বিজ্ঞ আইনজীবী ৩৫ ডিএলআর (এডি) ৪২ নজির উদ্ধৃত করে জেলা জজের আদেশ বহাল রাখার প্রার্থনা জানান।

৬. সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনগত অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Precedents)

মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক, নথিপত্র এবং ২০১৭ সালের অধিগ্রহণ আইন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সুস্পষ্ট আইনগত নীতি ঘোষণা করেন:

(এক) স্থগিতাদেশের সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপ আদালত অবমাননা নয়:
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, জেলা জজ আদালত ২৮.০৮.২০২৩ তারিখের ৬ নম্বর আদেশে বিচারিক আদালতের অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞার আদেশটি সরাসরি স্থগিত করেছিলেন। কোনো বৈধ আদালতের স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় কোনো পক্ষ যদি কোনো সংবিধিবদ্ধ অধিকার প্রয়োগ করে অর্থ উত্তোলন করে, তবে তাকে কোনোভাবেই আদালত অবমাননা (Contemptuous conduct) বা আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন বলা যায় না। জেলা জজ তাঁর আদেশে নথিবহির্ভূত কাল্পনিক বক্তব্যের অবতারণা করে চরম বিচারিক ভুল করেছেন।

(দুই) ২০১৭ সালের অধিগ্রহণ আইনের ৪৭ ধারা ও দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারের সীমা:
স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭-এর ৮(২), ১১ এবং ৪৭ ধারা যৌথভাবে একটি বিশেষ সংবিধিবদ্ধ কাঠামো তৈরি করেছে। জেলা প্রশাসক কর্তৃক রোয়েদাদ প্রস্তুত, পক্ষগণের দাবি যাচাই এবং ক্ষতিপূরণ ছাড়ের বিষয়টি এই বিশেষ আইনের আওতাভুক্ত। আইনটির ৪৭ ধারায় দেওয়ানী আদালতের হস্তক্ষেপ সুনির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাদিপক্ষ এল.এ. শাখার কার্যক্রমে আপত্তি দিয়েছিলেন এবং সেখানে নিষ্পত্তি হওয়ার পর তিনি বিশেষ ফোরামে চ্যালেঞ্জ না করে দেওয়ানী আদালতের মাধ্যমে সংবিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া রুদ্ধ করার অপচেষ্টা করেছেন, যা আইনসম্মত নয়।

(তিন) আপিল বিভাগের ৩৫ ডিএলআর (এডি) ৪২ নজিরের স্পষ্ট পার্থক্য:
বাদিপক্ষের উদ্ধৃত আপিল বিভাগের নজিরটি ছিল মামলা চলাকালে বিবাদী কর্তৃক গায়ের জোরে দেওয়াল তুলে বাদীর চলাচলের সাধারণ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা। সেখানে দেওয়াল ভেঙে পূর্বাবস্থা ফেরাতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মামলায় কোনো জবরদখল ঘটেনি; বরং সরকারের সংবিধিবদ্ধ অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদালতের স্থগিতাদেশের বৈধ সুরক্ষায় ক্ষতিপূরণ ছাড় করা হয়েছে। সুতরাং উক্ত নজির এখানে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।

৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Decision & Order)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনায় খুলনার সিনিয়র জেলা জজের ১৯.০৫.২০২৪ তারিখের ১৩ নম্বর আদেশটি সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত, নথিবহির্ভূত ও এখতিয়ারহীন মর্মে সাব্যস্ত করে নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:

  • রুল পরম (Absolute): দেওয়ানী রিভিশন রুল নং ৩১৯৬/২০২৪ কোনো খরচা ছাড়াই পরম (Absolute without costs) ঘোষণা করা হলো।
  • জেলা জজের ১৩ নম্বর আদেশ বাতিল: খুলনার সিনিয়র জেলা জজ আদালত কর্তৃক দেওয়ানী বিবিধ আপিল নং ৩৭/২০২৩-এ বিগত ১৯.০৫.২০২৪ তারিখে প্রদত্ত ১৩ নম্বর আদেশ (টাকা জমার নির্দেশ ও ফৌজদারি কারণ দর্শানোর আদেশ) সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও রদ করা হলো।
  • হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার: এই আদালত কর্তৃক ইতিপূর্বে জারিকৃত সকল স্থগিতাদেশ সমাপ্ত ও প্রত্যাহার করা হলো।
  • আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ: সিনিয়র জেলা জজ, খুলনাকে নির্দেশ দেওয়া হলো যে, তিনি যেন মূল বাটোয়ারা মোকদ্দমার কোনো বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে এবং এই রায়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে দেওয়ানী বিবিধ আপিল নং ৩৭/২০২৩ দ্রুততম সময়ে আইন অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করেন।
  • নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: অধস্তন আদালতের নথিপত্র রায়ের অনুলিপিসহ অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতে প্রেরণ করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)

আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই ঐতিহাসিক রায়ের সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিচে সন্নিবেশিত হলো:

বিষয়বস্তু মামলার বিস্তারিত তথ্য
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman)
মামলা নম্বর ও শ্রেণি দেওয়ানী রিভিশন নং ৩১৯৬ / ২০২৪ (Civil Revision No. 3196 of 2024)
পক্ষগণের নাম আমেনা খাতুন পপি এবং অন্যান্য (বিবাদী-আপিলকারী/দরখাস্তকারী) বনাম শেখ নাসিম উদ্দিন এবং অন্যান্য (বাদী-রেসপনডেন্ট/প্রতিপক্ষ)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব পার্থ সারথী মণ্ডল, অ্যাডভোকেট
প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব মো: আলমগীর মোস্তাফিজুর রহমান, জনাব খন্দকার আশরাফুল আলম এবং জনাব মনজুরুল হক, অ্যাডভোকেট
উৎস ও বিচারিক আদালত সিনিয়র জেলা জজ আদালত, খুলনা (দেওয়ানী বিবিধ আপিল নং ৩৭/২০২৩, আদেশ নং ১৩ তারিখ: ১৯.০৫.২০২৪)
১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, খুলনা (স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৫০/২০২২, আদেশ নং ২৬ তারিখ: ০১.০৬.২০২৩)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি: ২৮ ও ২৯ জুন এবং ০৮ জুলাই ২০২৬
চূড়ান্ত রায়: ১৩ জুলাই ২০২৬ (সোমবার, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)
মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও বিষয় স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ (ধারা ৮(২), ১১, ৪৭), Code of Civil Procedure (Section 151, Order 39 Rules 1-2, Section 115(1)), General Clauses Act (Section 21)
অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক 📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড
🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button