আংশিক দোতরফা ডিক্রি ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে বাতিল বেআইনি: ৯৬ ধারার আপিলে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দেওয়ানী বিচার প্রক্রিয়ার এক অতীব জটিল ও মৌলিক আইনি প্রশ্নে সুদূরপ্রসারী রায় প্রদান করেছেন। হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কোনো দেওয়ানী মোকদ্দমায় কিছু বিবাদীর বিরুদ্ধে দোতরফা সূত্রে (On contest) এবং কতিপয় অনুপস্থিত বিবাদীর বিরুদ্ধে একতরফা সূত্রে (Ex parte) ডিক্রি হলে— উক্ত আংশিক দোতরফা ও আংশিক একতরফা ডিক্রিকে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশ ১৩ বিধির (Order IX Rule 13 CPC) অধীন একতরফা ডিক্রি রদের মিস কেস দিয়ে বাতিল করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও এখতিয়ার বহির্ভূত। যেসব বিবাদী আদালতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাক্ষ্য-জেরা সমাপ্ত করেছে, তাদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো অনুপস্থিত বিবাদীর আবেদনে পুরো বিচারিক রায় বাতিল করা যায় না। এমন ডিক্রির বিরুদ্ধে একমাত্র আইনানুগ ও কার্যকর প্রতিকার হলো দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ ধারার অধীন নিয়মিত দেওয়ানী আপিল (Appeal under Section 96 CPC)। তবে আইনজীবীর ভুল পরামর্শে ভুল ফোরামে (Wrong Forum) মামলা পরিচালনা করায় বিচারপ্রার্থীকে তামাদি আইনের ১৪ ধারার সুবিধা দিয়ে নিয়মিত আপিল করার ৩০ দিনের সুযোগ প্রদান করেছে উচ্চ আদালত (২০ বিএলটি এডি ৪৭)।
মামলাটির উৎপত্তি ভোলা জেলার চরফ্যাশন সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ২০০৯ সালে দায়েরকৃত স্বত্ব মোকদ্দমা Title Suit No. 62 of 2009 থেকে। বাদী হালিমা ইয়াসমিন গং সরকারের নিকট থেকে বন্দোবস্ত সূত্রে প্রাপ্ত ১.৫০ একর জমিতে স্বত্ব ঘোষণা ও অবৈধ দখলের উচ্ছেদের দাবিতে এই মামলা দায়ের করেন।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও নিম্ন আদালতের ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
- মূল মামলায় পক্ষদের অবস্থান ও দোতরফা শুনানি: মামলায় ৩-৫ নম্বর বিবাদীগণ উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং বাদীর সাক্ষীকে (PW-1) দীর্ঘ জেরা করে পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অপরদিকে ১(ক) থেকে ১(ঞ) এবং ২ নম্বর বিবাদীগণ লিখিত জবাব দিলেও চূড়ান্ত শুনানির পর্যায়ে দীর্ঘদিন গরহাজির থাকেন। ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর চরফ্যাশন সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ৩-৫ নম্বর বিবাদীর বিরুদ্ধে দোতরফা সূত্রে এবং অনুপস্থিত ১ ও ২ নম্বর বিবাদীর বিরুদ্ধে একতরফা সূত্রে ডিক্রি প্রদান করেন।
- ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে মিস কেস ও খারিজ: ২০১৮ সালের ওই মিশ্র ডিক্রির বিরুদ্ধে ১ ও ২ নম্বর বিবাদীগণ (জাহেদা বেগম গং) দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে Miscellaneous Case No. 03 of 2019 দায়ের করে ডিক্রি বাতিলের আবেদন করেন। চরফ্যাশন সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি উক্ত মিস কেস খারিজ করে দেন।
- জেলা জজ আদালতের ভুল সিদ্ধান্ত: এই খারিজাদেশের বিরুদ্ধে বিবাদীপক্ষ ভোলা জেলা জজ আদালতে Miscellaneous Appeal No. 05 of 2023 দায়ের করে, যা অতিরিক্ত জেলা জজ চরফ্যাশন আদালতে স্থানান্তরিত হয়। অতিরিক্ত জেলা জজ ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল আপিলটি মঞ্জুর করে সহকারী জজের মূল ডিক্রিটি বাতিল করেন এবং মূল মামলাটি স্বনম্বরে পুনরুজ্জীবিত করার আদেশ দেন।
- হাইকোর্টে বাদীপক্ষের দেওয়ানী রিভিশন: দোতরফা ডিক্রিকে মিস কেস দিয়ে বাতিল করার এই আদেশে ক্ষুব্ধ হয়ে মূল ডিক্রিপ্রাপ্ত বাদী হালিমা ইয়াসমিন গং হাইকোর্ট বিভাগে Civil Revision No. 2848 of 2025 দায়ের করেন। হাইকোর্ট রুল জারি করে অতিরিক্ত জেলা জজের আদেশ স্থগিত করেন।
🏛️ বাদী হালিমা ইয়াসমিন গং-এর আইনি যুক্তি
- দোতরফা ডিক্রি ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে বাতিলযোগ্য নয়: মামলায় ৩-৫ নম্বর বিবাদী সাক্ষ্য-জেরা সম্পন্ন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এটি একটি কনটেস্টেড ডিক্রি। ৯ আদেশ ১৩ বিধি কেবল সম্পূর্ণ একতরফা ডিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
- একমাত্র প্রতিকার ৯৬ ধারার আপিল: মিশ্র বা আংশিক দোতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হলে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ ধারায় আপিল করতে হয়; মিস কেস পরিচালনা সম্পূর্ণ ফোরামের অপব্যবহার।
- অতিরিক্ত জেলা জজের চরম ভুল: আপিল আদালত আইনের এই মৌলিক পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়ে দোতরফা সূত্রে নিষ্পত্তিকৃত ডিক্রি বাতিল করে মারাত্মক আইনগত ভুল করেছেন।
🛡️ বিবাদী জাহেদা বেগম গং-এর যুক্তি
- মুহুরির গাফিলতিতে অনুপস্থিতি: আইনজীবীর মুহুরি মামলার তারিখ ডায়েরিতে না তোলায় তারা শুনানিতে উপস্থিত হতে পারেননি। আইনজীবীর ভুলের জন্য বিচারপ্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না (৬ বিএলডি ১৫২)।
- বৈধ দলিলের মালিকানা: তারা ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে ২.৮৮ একর জমির বৈধ মালিক ও ভোগদখলকার। মূল মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়া ন্যায়বিচারের দাবি।
- ভুল ফোরামে সরল বিশ্বাসে মামলা: আইনজীবীর ভুল পরামর্শে ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে যাওয়া হয়েছিল। তামাদি আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী ভুল ফোরামের সময় মার্জনা পাওয়ার অধিকারী (২০ বিএলটি এডি ৪৭)।
দেওয়ানী বিচার শাস্ত্রে এই মামলার মাধ্যমে হাইকোর্ট একটি অনন্য আইনি সীমারেখা সুস্পষ্টভাবে অঙ্কন করেছেন:
- Ex-parte Decree Simpliciter (সম্পূর্ণ একতরফা ডিক্রি): যেখানে কোনো বিবাদীই উপস্থিত হয়নি বা সাক্ষ্য-জেরা করেনি, সেখানে ৯ আদেশ ১৩ বিধির দরখাস্ত বা ৯৬ ধারার আপিল— উভয় পথই বিবাদীর জন্য উন্মুক্ত থাকে।
- Decree Partly on Contest and Partly Ex-parte (মিশ্র ডিক্রি): যেখানে মামলায় একাধিক বিবাদীর মধ্যে কেউ কেউ লিখিত জবাব দিয়ে সাক্ষীকে জেরা করেছে এবং গুণাগুণের ভিত্তিতে আদালত রায় দিয়েছে, সেই রায়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘দোতরফা ডিক্রি’ (Contested Decree) হিসেবে পরিগণিত হয়।
- প্রক্রিয়াগত বৈষম্যের ঝুঁকি: যদি অনুপস্থিত কোনো এক বিবাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে পুরো মামলা রদ করে দেওয়া হয়, তবে যে বিবাদীগণ আদালতে নিয়মিত এসে নিজেদের অধিকার প্রমাণ করেছিল, তাদের বিচারিক বিজয় সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। আইন কখনোই এমন অসঙ্গতি অনুমোদন করে না।
মাননীয় বিচারপতি আব্দুর রহমান দীর্ঘ রায়ে নিম্ন আদালতের আদেশের গলদ এবং ন্যায়বিচারের সমন্বয় সাধন করে নিম্নোক্ত মৌলিক অভিমত ব্যক্ত করেন:
ক. ৯ আদেশ ১৩ বিধি আপিলের বিকল্প হাতিয়ার হতে পারে না:
হাইকোর্ট রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন: “The provisions of Order IX Rule 13 cannot ordinarily be employed as a substitute for an appeal against findings rendered on contest, nor can it be utilised as a procedural device for reopening the entire suit when the decree sought to be challenged contains a component which was passed after contest and upon consideration of evidence.” অতিরিক্ত জেলা জজ এই মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে চরম আইনগত ভুল করেছেন।
খ. আপিল হলো মূল মামলার ধারাবাহিকতা (Continuation of Suit):
আদালত উল্লেখ করেন, দেওয়ানী কার্যবিধির ৯৬ ধারার অধীন আপিল হলো মূল মামলার ধারাবাহিক কার্যধারা। সেখানে আপিল আদালত নথিপত্র পুনর্বিবেচনা করতে পারে, এমনকি ৪১ আদেশ ২৭ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনে অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ করে স্বত্ব ও দখলের পূর্ণাঙ্গ বিচার করতে পারে। কিন্তু বিচারিক আদালতের দোতরফা রায়কে মিস কেসে বাতিল করা বিচার ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
গ. তামাদি আইনের ১৪ ধারা ও আইনজীবীর ভুল পরামর্শের সুরক্ষা:
আদালত লক্ষ্য করেন যে, বিবাদী জাহেদা বেগম গং গ্রামের সাধারণ ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষ। পারিবারিক কর্তার মৃত্যুর পর আইনজীবীর দেওয়া ভুল পরামর্শের কারণেই তারা আপিল না করে ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে গিয়েছিল। আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির Kohinoor Chowdhury v. Kamada Ranjan Bhattacharja, 20 BLT (AD) 47 অনুযায়ী— “A litigant should not suffer for wrong advice of his learned lawyer and so the party is entitled to get benefit of Section 14 of the Limitation Act for exclusion of time consumed before a wrong forum.”
📚 রায়ে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ নজিরসমূহ
- Kohinoor Chowdhury v. Sree Kamada Ranjan Bhattacharja, 20 BLT (AD) 47: আইনজীবীর ভুল উপদেশে ভুল আদালতে বা ভুল ফোরামে সরল বিশ্বাসে মামলা পরিচালনা করলে তামাদি আইনের ১৪ ধারার সুবিধা প্রদান আবশ্যক।
- Surjalal Roy Karmakar v. Iman Ali Pramanik, 6 BLD (HC) 152 (পার্থক্য নির্দেশ): মুহুরির ভুলের কারণে অনুপস্থিত থাকলে ডিক্রি রদের সুবিধা কেবল সম্পূর্ণ একতরফা ডিক্রির ক্ষেত্রে কার্যকর; মিশ্র দোতরফা ডিক্রিতে প্রযোজ্য নয়।
- অতিরিক্ত জেলা জজের আদেশ বাতিল: চরফ্যাশন অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত কর্তৃক মিস আপিল ০৫/২০২৩ মঞ্জুর করে মূল মামলা পুনরুজ্জীবিত করার আদেশ সরাসরি বাতিল ও রদ করা হলো।
- সহকারী জজের মূল ডিক্রি পুনর্বহাল: ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর সহকারী জজ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত মূল স্বত্ব মোকদ্দমার ডিক্রিটি কার্যকর ও পুনর্বহাল করা হলো।
- ৩০ দিনের মধ্যে নিয়মিত আপিল দায়েরের সুযোগ: বিবাদীপক্ষকে (জাহেদা বেগম গং) রায়ের কপি পৌঁছানোর ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে উপযুক্ত জেলা জজ আদালতে ৯৬ ধারার নিয়মিত দেওয়ানী আপিল দায়েরের সুযোগ প্রদান করা হলো।
- তামাদি আইনের ১৪ ধারায় সময় গণনার নির্দেশ: যদি বিবাদীপক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করে, তবে আপিল আদালত তামাদি আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী ভুল ফোরামে ব্যয়িত সময় আইনানুগভাবে বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে মূল আপিলটি গুণাগুণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করবে।
১. দোতরফা ডিক্রি ৯ আদেশে রদ নয়
কিছু বিবাদীর দোতরফা উপস্থিতিতে প্রদত্ত ডিক্রিকে অন্য কোনো বিবাদী ৯ আদেশ ১৩ বিধির মিস কেস দিয়ে বাতিল করাতে পারে না।
২. একমাত্র পথ ৯৬ ধারার আপিল
আংশিক দোতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা জজ আদালতে সিভিল আপিল দায়ের করতে হবে।
৩. আইনজীবীর ভুলের সুরক্ষা (Sec 14)
আইনজীবীর ভুলের কারণে ভুল ফোরামে গেলে তামাদি আইনের ১৪ ধারা প্রয়োগ করে আপিলের বিলম্ব মার্জনা পাওয়ার হকদার (২০ বিএলটি এডি ৪৭)।
৪. দোতরফা বিবাদীদের অধিকার সুরক্ষা
যেসব বিবাদী কষ্ট করে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়ে রায় পেয়েছিল, অন্য বিবাদীর গরহাজিরার অজুহাতে তাদের বিচারিক রায় বাতিল করা অবিচার।
ডিক্রিতে “Decreed on contest against defendants… and ex parte against rest” লেখা থাকলে কখনই ৯ আদেশ ১৩ বিধিতে যাবেন না; সরাসরি আপিল করুন।
ট্রায়াল কোর্টে অনুপস্থিত থাকার কারণে সাক্ষ্য দিতে না পারলে আপিল মেমোরেন্ডামের সাথে ৪১ আদেশ ২৭ বিধিতে অতিরিক্ত সাক্ষ্য পেশের দরখাস্ত দিন।
আইনজীবীর ভুল উপদেশে মিস কেস করে সময় নষ্ট হলে আপিল দায়েরের সময় ১৪ ধারায় সময়ের ছাড় চেয়ে হলফনামা দাখিল করুন।
অন্য সহ-বিবাদীরা আদালতে কী কী জেরা বা সাক্ষ্য দিয়েছে তা পর্যালোচনা করে নিজের আত্মরক্ষা সুসংহত করুন।
রিভিশনে আদালত কোনো দলিলের গুণাগুণ বিচার করতে পারে না; বিচারিক ক্ষমতা ও ফোরামের সঠিকতাই সেখানে মূখ্য বিচার্য।

