ব্যাংক ঋণের বিপরীতে দেওয়া সিকিউরিটি চেক ডিজঅনার হলেও ১৩৮ ধারায় ফৌজদারি দায় এড়ানো যায় না: হাইকোর্টের কঠোর রায়
বিচারিক মূলনীতি: ব্যাংকে রক্ষিত সিকিউরিটি চেক ও এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারার ফৌজদারি কার্যকারিতা
বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি খেলাপি হওয়ার পর ঋণের জামানত হিসেবে রক্ষিত চেক নগদায়নের জন্য উপস্থাপন করা এবং তা ডিজঅনার হলে এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারায় মামলা করা সম্পূর্ণ বৈধ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নজির অনুযায়ী, “সিকিউরিটি চেক” ধারণাগতভাবে ব্যাংকে জমা হলেও গ্রাহকের খেলাপি ঋণের দায় মেটাতে ব্যাংক তা উপস্থাপনের আইনগত অধিকার রাখে। চেকে স্বাক্ষর গ্রাহকের হলে এবং একাউন্টে তহবিল অপ্রতুল থাকলে ধারা ১৩৮-এর অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গঠিত হয়।
১. মামলার পরিচিতি ও বেঞ্চ
মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল আপিল জুরিসডিকশনে মামলাটি পরিচালিত হয়। শুনানি গ্রহণ শেষে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন মাননীয় বিচারপতি মো. সেলিম (Mr. Justice Md. Salim)। নিম্ন আদালত কর্তৃক ১৩৮ ধারায় ১ বছরের কারাদণ্ড ও চেকে উল্লেখিত মোট সমপরিমাণ অর্থ জরিমানার আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪১০ ধারায় আপিল দায়ের করেছিলেন সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. শামসুল ইসলাম।
২. বিরোধের পটভূমি ও মূল ঘটনা
আসামি মো. শামসুল ইসলাম ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) ঋণ গ্রহণ করেন। ঋণ গ্রহণের শর্ত মোতাবেক তিনি ব্যাংকের অনুকূলে তার ব্যাংক হিসাবের চেক প্রদান করেন। পরবর্তীতে ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ না করায় ব্যাংক পাওনা টাকার সমপরিমাণ চেকটি নগদায়নের জন্য ক্লিয়ারিং হাউজে উপস্থাপন করে। কিন্তু আসামির একাউন্টে ফান্ড না থাকায় তা “অপ্রতুল তহবিল” মর্মে ডিজঅনার হয়। ব্যাংক আইনানুগভাবে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করে এবং নোটিশের মেয়াদান্তে দায়রা আদালতে এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারায় নালিশি মামলা দায়ের করে।
৩. আসামিপক্ষ বনাম ব্যাংক কর্তৃপক্ষের যুক্তিতর্ক
আসামিপক্ষের আরজি
- ঋণ মঞ্জুরির সময় ব্যাংক খালি চেকে স্বাক্ষর নিয়েছিল, যা সিকিউরিটি হিসেবে রক্ষিত ছিল।
- ব্যাংকের প্রতিকার হওয়া উচিত ছিল অর্থ ঋণ আদালতে দেওয়ানি মামলা, ফৌজদারি মামলা নয়।
- চেকটিতে ব্যাংক নিজের ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে অপব্যবহার করেছে।
ব্যাংকের পক্ষে যুক্তি
- আসামি ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ এবং স্বাক্ষর করা অস্বীকার করেননি।
- আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুসারে অর্থ ঋণ আদালতের দেওয়ানি মামলা এবং এনআই অ্যাক্টের ফৌজদারি মামলা যুগপৎ চলতে পারে।
- ঋণ খেলাপি হওয়ার পর সিকিউরিটি চেক কার্যকর করার পূর্ণ আইনি এখতিয়ার ব্যাংকের রয়েছে।
৪. মহামান্য হাইকোর্টের বিচারিক বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে সুস্পষ্ট করেন যে, এনআই অ্যাক্ট ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার উদ্দেশ্যই হলো বাণিজ্যিক লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চেকের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষা করা। যখন একজন ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন এবং চেক প্রদান করেন, তখন ঋণ খেলাপি হওয়া মাত্রই সেই চেকটি আইনত কার্যকর ঋণের (Legally enforceable debt) অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকের একই সঙ্গে অর্থ ঋণ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এনআই অ্যাক্টের অধীনে মামলা দায়ের সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি কোনো দ্বৈত বিপত্তি (Double Jeopardy) তৈরি করে না।
৫. চূড়ান্ত আদেশ
বিজ্ঞ হাইকোর্ট ডিভিশন আসামির ফৌজদারি আপিলটি খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের ঘোষিত সাজা বহাল রাখেন। আসামির আপিল দায়েরকালে জমা দেওয়া অর্থের বাইরে অবশিষ্ট জরিমানার অর্থ আদায় এবং সাজা কার্যকরের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।
৬. ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য আইনি পরামর্শ
- ব্যাংক ঋণ নেওয়ার সময় কখনোই অনির্দিষ্ট অঙ্কের ব্লাঙ্ক চেক প্রদান করবেন না।
- ঋণের কিস্তি শোধ হলে রসিদ সংরক্ষণ করুন এবং ঋণ হিসাব সমন্বয় হলে জামানত চেক ফেরত নেওয়ার লিখিত আবেদন করুন।
- ডিজঅনার মামলার নোটিশ পেলে দ্রুত আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে লিখিত জবাব দিন এবং ঋণ পুনর্তফসিলের উদ্যোগ নিন।
৭. অফিসিয়াল রেফারেন্স ও লিংক
| মামলা নম্বর | Criminal Appeal No. 5119 of 2020 |
| বিচারপতি | Mr. Justice Md. Salim |
| আইন ও ধারা | Negotiable Instruments Act, 1881 Section 138, 118; CrPC Sec 410 |
| অফিশিয়াল কপি | সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন |
