কাবিননামায় উল্লেখিত অপরিশোধিত দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ স্বামীর নিঃশর্ত আইনি দায়: হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং পারিবারিক আদালত আইন অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে স্ত্রীর কাবিননামায় নির্ধারিত অবশিষ্ট দেনমোহর (Unpaid Dower Money) এবং ৩ মাসের ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ (Maintenance for Iddat Period) পরিশোধ করা স্বামীর অলঙ্ঘনীয় ও নিঃশর্ত আইনি বাধ্যবাধকতা। স্বামী কর্তৃক তালাক প্রদানের পর যৌতুকের মিথ্যা মামলার অজুহাত তুলে দেনমোহরের দায় অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন যে, রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামায় স্বাক্ষরিত দেনমোহরের অঙ্ক আদালত কর্তৃক হ্রাসের কোনো সুযোগ নেই এবং স্বামীকে পুরো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

বাদী মোসাম্মৎ শারমিন খাতুনের সাথে বিবাদী মোঃ রেজোয়ানুল হকের বিবাহ ২০২১ সালের ৮ অক্টোবর তারিখে মুসলিম শরিয়ত মোতাবেক অনুষ্ঠিত হয়। রেজিস্ট্রিকৃত নিকাহনামায় (Exhibit-1) মোট দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল ৪,০০,১০১/- (চার লক্ষ একশত এক) টাকা। তন্মধ্যে বিবাহের সময় উসুল হিসেবে নগদ ২,১০১/- টাকা পরিশোধ দেখানো হয় এবং অবশিষ্ট ৩,৯৯,০০০/- টাকা বাকী থাকে।

পরবর্তীতে স্বামী রেজোয়ানুল হক ২০২৩ সালের ৩১ মে তারিখে শারমিন খাতুনকে একতরফাভাবে তালাকের নোটিশ প্রদান করেন। তালাকের নোটিশ পেয়ে স্ত্রী শারমিন খাতুন বদরগঞ্জ পারিবারিক আদালতে ২০২৩ সালের ৮ নং পারিবারিক মোকদ্দমা (Family Suit No. 08 of 2023) দায়ের করে তার বাকী দেনমোহর ৩,৯৯,০০০/- টাকা এবং ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ দাবি করেন।

২. বাদী ও বিবাদীর মুখোমুখি অবস্থান

বাদী স্ত্রী আদালতে সাক্ষ্য দেন যে, স্বামী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তালাক দিয়েছেন এবং কোনো দেনমোহর দেননি। অপরপক্ষে বিবাদী স্বামী আদালতে দাবি করেন যে, স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে তিনি তালাক দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং দেনমোহরের অঙ্কটি ছিল অতিরিক্ত। স্বামী আরও অভিযোগ করেন যে স্ত্রী তার বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছিলেন।

৩. অধস্তন পারিবারিক আদালতের রায়

বদরগঞ্জ পারিবারিক আদালত ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তারিখে বাদীর অনুকূলে ৩,৯৯,০০০/- টাকা দেনমোহর এবং ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ ডিক্রি করেন। জেলা জজ আদালত রংপুর পারিবারিক আপিল নং ৭২/২০২৪-এ উক্ত রায় সামান্য সংশোধনসহ মূলত দেনমোহরের ডিক্রি বহাল রাখেন।

৪. হাইকোর্ট বিভাগের আইনি পর্যবেক্ষণ ও রেশিও

বিচারপতি মোঃ সোহরাওয়ার্দী রিভিশন মোকদ্দমাটি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন:

(১) দেনমোহর স্ত্রীর অলঙ্ঘনীয় অধিকার: কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ স্বীকার করে স্বাক্ষর করার পর স্বামী কখনোই তা অস্বীকার করতে পারেন না। তালাক যে কারণেই ঘটুক না কেন, বাকী মোহরানা স্ত্রীর কাছে স্বামীর ব্যক্তিগত ঋণ।
(২) ইদ্দতকালীন ৩ মাসের ভরণপোষণ: মুসলিম আইনে তালাক কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৯০ দিন বা ৩ মাস স্ত্রীর খাবার, বস্ত্র ও বাসস্থানের খরচ স্বামী বহন করতে আইনত বাধ্য।

৫. চূড়ান্ত রায়

হাইকোর্ট বিভাগ স্বামীর আনীত রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Discharged) করেন এবং পারিবারিক আদালতের দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণের রায় ও ডিক্রি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেন।

৬. সাধারণ নাগরিক ও আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি সতর্কতা

  1. কাবিননামা স্বাক্ষরে সচেতনতা: সামর্থ্যের বাইরে লোকদেখানো দেনমোহর ধার্য করবেন না, কারণ আইনে এটি নগদ আদায়যোগ্য ঋণ।
  2. উসুলের প্রমাণ রাখা: বিয়ের সময় মোহরানা বাবদ কোনো গহনা বা নগদ টাকা দিলে তা নিকাহনামার সংশ্লিষ্ট কলামে সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করুন।
  3. তালাক কার্যকরে নোটিশ: তালাক দেওয়ার সময় স্থানীয় পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং স্ত্রীকে আইনানুগভাবে রেজিস্ট্রিকৃত নোটিশ দিন।
  4. পারিবারিক ডিক্রি জারি: পারিবারিক আদালতের রায় পাওয়ার পর স্বামী টাকা না দিলে সিপিসি ২১ আদেশ এবং পারিবারিক আইনের ১৬ ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা যায়।
  5. ইদ্দতকালীন অধিকার: গর্ভবতী না হলে ৯০ দিন এবং গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত স্ত্রী ভরণপোষণের পূর্ণ হকদার।
📋 মামলার পরিচিতি ও অফিশিয়াল সুপ্রিম কোর্ট রেফারেন্স
মামলার নম্বর Civil Revision No. 1162 of 2025
বিচারপতি Mr. Justice Md. Shohrowardi
পক্ষগণ Md. Rezoyanul Haque (Petitioner) Vs. Mrs. Sharmin Khatun (Opposite Party)
অধস্তন আদালত Family Court, Badargonj (Family Suit No. 08 of 2023) & District Judge, Rangpur
আইন ও ধারা Muslim Family Laws Ordinance, 1961 (Section 7 & 10), Family Courts Act
মূল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের মূল ভেরিফায়েড রায় ডাউনলোড করুন (PDF)

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button