৩০ বছরের পুরাতন রেজিস্ট্রি দলিলের প্রত্যায়িত নকল ও দখলে আইনজীবীর ত্রুটি: চট্টগ্রামের ৩০.২৫ শতক জমির স্বত্ব মামলায় হাইকোর্টের রিমান্ড নির্দেশ

📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, ৩০ বছরের অধিক প্রাচীন কোনো রেজিস্ট্রি কবলা দলিলের প্রত্যায়িত নকল (Certified Copy) আদালতে দাখিল করা হলে সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act) প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী তার আনুষ্ঠানিক প্রমাণের বাধ্যবাধকতা শিথিলযোগ্য হলেও, মূল দলিল দাখিল না করার যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করা আবশ্যক। একইসঙ্গে আদালত সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন যে, বিচারিক আদালতে মামলা পরিচালনাকারী বিজ্ঞ আইনজীবীর কৌশলগত ত্রুটি, অনভিজ্ঞতা বা অসাবধানতার কারণে যদি প্রয়োজনীয় প্রামাণ্য দলিল (যেমন: মূল দলিলের ব্যাখ্যা, সরকারের অধিগ্রহণ নথি কিংবা বহুতল ভবনের পৌর কর ও ইউটিলিটি বিল) রেকর্ডে উত্থাপিত না হয়, তবে সেই ত্রুটির জন্য কোনো পক্ষকে চরম অবিচারের শিকার বানিয়ে সরাসরি প্রতিকারহীন করা সমীচীন নয়। ন্যায়ের স্বার্থে (Ends of Justice) এবং পক্ষগণের মধ্যকার মূল বিরোধের পূর্ণাঙ্গ ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আরজি ও লিখিত জবাব সংশোধন এবং উভয় পক্ষকে অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ দাখিলের সুযোগ দিয়ে মামলাটি বিচারিক আদালতে পুনঃবিচারের (Retrial / Remand) জন্য প্রেরণ করাই আইনের সঠিক প্রয়োগ।

১. মামলার সূচনা ও উৎপত্তি (Background & Context)

আলোচ্য মামলার সূচনা চট্টগ্রাম জেলার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০০৪ সালে দায়েরকৃত অপর মোকদ্দমা নং ৩৫/২০০৪ (Other Suit No. 35 of 2004) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন মোসা: মালেক রহমান এবং অন্যান্য উত্তরাধিকারীগণ (আপিলকারীগণ), তাদের পূর্বসূরি মরহুম অসিউর রহমানের ওয়ারিশ হিসেবে। মোকদ্দমার মূল প্রার্থনা ছিল চট্টগ্রাম শহরের মূল্যবান ৩০.২৫ শতক নালিশি জমিতে বাদিদের স্বত্ব ঘোষণা (Declaration of Title) এবং উক্ত জমির ওপর বিবাদীগণের নামে সৃজিত বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন বি.এস. খতিয়ান নং ৫১৪ বেআইনি ও বাতিল মর্মে কার্যকর ঘোষণা আদায় করা।

বাদিগণ আরজিতে দাবি করেন যে, নালিশি ৩০.২৫ শতক জমিসহ মোট ১.১৪০ একর জমির মূল মালিক ছিলেন মাহবুবুল আলম শেড এবং ইয়াকুব শেড। উক্ত মালিকদ্বয় বিগত ০৬ নভেম্বর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ৪৬০৮ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের মাধ্যমে সমুদয় ১.১৪০ একর জমি বাদিদের পিতা/পূর্বসূরি অসিউর রহমানের নিকট বিক্রয় করে দখল হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্তৃক এল. এ. কেইস নং ২৭৪/৬২-৬৩ (L. A. Case No. 274/62-63)-এর মাধ্যমে উক্ত দলিলের অধিকাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হলেও অবশিষ্ট ৩০.২৫ শতক জমি অধিগ্রহণবহির্ভূত থেকে যায়। বাদিদের পূর্বসূরি উক্ত ৩০.২৫ শতক জমিতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে একটি দোতলা পাকা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেন এবং সপরিবারে শান্তিপূর্ণ বসবাস ও দখলে বহাল থাকেন। তবে বাদিদের পিতা দীর্ঘদিন গুরুতর অসুস্থ ও শয্যাশায়ী থাকার সুযোগে বিবাদীগণ জরিপ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে উক্ত জমির বি.এস. খতিয়ান নং ৫১৪ তাদের নিজেদের নামে প্রস্তুত করিয়ে নেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও বাদিদের স্বত্বের পরিপন্থী।

২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)

বিচারিক আদালতে উভয় পক্ষ স্ব-স্ব দাবি ও প্রতিরক্ষার পক্ষে বিস্তারিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বাদিপক্ষ তাদের ক্রয়সূত্রে স্বত্ব ও দখলের বিবরণ তুলে ধরেন, অপরদিকে বিবাদীপক্ষ যৌথ লিখিত জবাব দাখিল করে দলিলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে পৈতৃক ধারাবাহিকতা দাবি করেন।

🏛️ বাদীপক্ষের বক্তব্য ও আইনি দাবি

  • ক্রয়সূত্রে বৈধ স্বত্ব: নালিশি ভূমির মূল মালিক মাহবুবুল আলম শেড ও ইয়াকুব শেড বিগত ০৬/১১/১৯৬২ তারিখে ৪৬০৮ নং কবলা দলিলে ১.১৪০ একর জমি অসিউর রহমানের নিকট হস্তান্তর করেন।
  • অধিগ্রহণ অবশিষ্ট জমি: এল.এ. কেইস নং ২৭৪/৬২-৬৩ মূলে বাকী জমি সরকার অধিগ্রহণ করলেও বিরোধীয় ৩০.২৫ শতক জমি অধিগ্রহণমুক্ত থাকে এবং ক্রেতা সেখানে স্বত্ববান থাকেন।
  • দোতলা ভবন ও নিরবচ্ছিন্ন দখল: বাদিদের পূর্বসূরি নালিশি জমিতে চারদিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে দোতলা পাকা ভবন তৈরি করে সপরিবারে ভোগদখলে ছিলেন এবং আছেন।
  • ত্রুটিপূর্ণ বি.এস. রেকর্ড: অসিউর রহমান দুরারোগ্য ব্যাধিতে শয্যাশায়ী থাকার সুযোগে বিবাদীগণ অসদুপায়ে বি.এস. ৫১৪ নং খতিয়ান নিজ নামে করিয়ে নেন যা বাতিলযোগ্য।
  • প্রাচীন দলিল (Exhibit 2): বিজ্ঞ আদালতে ১৯৬২ সালের দলিলের সার্টিফাইড কপি দাখিল করা হয়েছে যা সাক্ষ্য আইনের ৭৯ ও ৯০ ধারা মতে প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত।

🛡️ বিবাদীপক্ষের জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  • পৈতৃক স্বত্ব ও উত্তরাধিকার: জমিটি মাহবুবুল আলম শেড ও ইয়াকুব শেডের মালিকানাধীন ছিল এবং তাদের মৃত্যুর পর বিবাদী ১-৯ নম্বর পক্ষ ওয়ারিশ হিসেবে দখলে আছেন।
  • দলিল অস্বীকার ও জালিয়াতির অভিযোগ: মূল মালিকগণ কখনোই অসিউর রহমানের নিকট জমি বিক্রি করেননি; বাদিদের কথিত ১৯৬২ সালের ৪৬০৮ নং কবলা দলিলটি সম্পূর্ণ জাল, বানোয়াট ও অকার্যকর।
  • সঠিক বি.এস. রেকর্ড: সরেজমিন দখল ও ধারাবাহিক স্বত্বের ভিত্তিতে সরকারি জরিপ বিভাগ বৈধভাবে বিবাদীগণের নামে বি.এস. ৫১৪ নম্বর খতিয়ান চূড়ান্ত প্রচার করেছে।
  • মূল দলিলের অনুপস্থিতি: বাদিপক্ষ মূল কবলা দলিল আদালতে প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দলিলের মূল কপি দাখিল না করার কোনো কারণও দর্শায়নি।
  • দখলের প্রমাণের অভাব: বাদিপক্ষ দোতলা বাড়ি থাকার মৌখিক দাবি করলেও কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স রসিদ, বিদ্যুৎ বিল বা সিটি কর্পোরেশনের নথি দাখিল করতে পারেনি।

৩. বিচারিক আদালতের কার্যক্রম ও রায় (Trial Court Proceedings & Findings)

১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, চট্টগ্রামে বিচার চলাকালে বাদিপক্ষ তাদের পক্ষে ২ জন সাক্ষী উপস্থাপন করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মূল বাদিগণের কেউই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সরাসরি জবানবন্দি প্রদান করেননি; বরং বাদিদের আমমোক্তার আহমেদ খলিল খান (Ahmed Khalil Khan) পিডব্লিউ-১ হিসেবে সাক্ষ্য দেন। বাদিপক্ষের দাখিলকৃত দলিলাদি প্রদর্শনী ১ হতে ৩ (Exhibits 1-3) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে ১৯৬২ সালের দলিলের প্রত্যায়িত নকল ছিল প্রদর্শনী-২ (Exhibit 2)। অপরদিকে বিবাদীপক্ষ তাদের দাবির সমর্থনে ৩ জন সাক্ষী জেরা করান এবং তাদের কাগজপত্র প্রদর্শনী ‘ক’ হতে ‘ঘ’ (Exhibits Ka to Gha) হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বিচারিক আদালত বিগত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখে রায় প্রদান করে বাদিদের মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ করে দেন। যুগ্ম জেলা জজ তার রায়ে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বাদিপক্ষ মূল দলিল দাখিল করতে পারেনি এবং প্রত্যায়িত নকল দাখিলের মাধ্যমে বিবাদীগণের পূর্বসূরিদের নিকট থেকে তাদের পূর্বসূরির জমি ক্রয়ের বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও নালিশি জমিতে বাদিদের একচ্ছত্র ভোগদখলের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণাদি রেকর্ডে উপস্থাপন না করায় বাদিপক্ষ স্বত্বের ঘোষণামূলক ডিক্রি পাওয়ার অধিকারী নয়। উক্ত খারিজ আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ১ম আপিল নং ৩৯৯/২০১১ (First Appeal No. 399 of 2011) দায়ের করেন।

৪. আপিলে বিবেচ্য মূল আইনি প্রশ্নসমূহ (Framed Legal Issues)

হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চের পর্যালোচনায় নিম্নোক্ত আইনি প্রশ্নসমূহ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য চিহ্নিত হয়:

  1. সাক্ষ্য আইনের অনুমিতি ও প্রত্যায়িত নকল: ৩০ বছরের অধিক প্রাচীন কোনো রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের প্রত্যায়িত নকল (Exhibit-2) দাখিল করা হলে সাক্ষ্য আইনের ৭৯ ও ৯০ ধারার আওতায় তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আদালত কী ধরনের অনুমিতি গ্রহণ করতে পারে এবং মূল দলিল দাখিল না করার ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
  2. দখলের স্বপক্ষে স্থানীয় কর ও ইউটিলিটি বিলের গুরুত্ব: জমিতে দোতলা পাকা বাড়ি এবং সীমানা প্রাচীর থাকার দাবি আরজিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও এবং বিবাদীপক্ষ তা সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার না করলেও, পৌর কর (Municipal Tax) ও বিদ্যুৎ বিল দাখিল না করার ত্রুটি কীভাবে বিবেচনা করা সমীচীন?
  3. আইনজীবীর ত্রুটিতে মোকাদ্দমা নিষ্পত্তির নীতি: বিচারিক আদালতে নিয়োজিত আইনজীবীর অদক্ষতা বা গাফিলতির কারণে প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি ও আরজির তফসিলগত স্পষ্টীকরণ রেকর্ডে না এলে পক্ষগণকে তার জন্য সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা যাবে, নাকি ন্যায়বিচারের স্বার্থে আরজি সংশোধন ও পুনঃবিচারের (Retrial/Remand) সুযোগ দেওয়া আইনসংগত?

৫. আপিল বিভাগে আইনি যুক্তিতর্ক (Submissions & Arguments)

আপিল শুনানিকালে আপিলকারী/বাদিপক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী জনাব মো: আলমগীর মোস্তাফিজুর রহমান (Mr. Md. Alamgir Mostafizur Rahman) এবং জনাব চঞ্চল কুমার দত্ত (Mr. Chanchal Kumar Dutta) শুনানিতে অংশ নেন। অপরপক্ষে বিবাদী/রেসপনডেন্টগণের পক্ষে বারবার কার্যতালিকায় আসা সত্ত্বেও কোনো আইনজীবী উপস্থিত হননি।

আপিলকারীর বিজ্ঞ কৌঁসুলি নিবেদন করেন যে, নালিশি ১.১৪০ একর জমির মূল মালিক যে বিবাদীদের পূর্বসূরি মাহবুবুল আলম শেড ও ইয়াকুব শেড ছিলেন, তা উভয় পক্ষের স্বীকৃত বিষয়। বাদিদের পূর্বসূরি ১৯৬২ সালের ০৬ নভেম্বর উক্ত জমি কিনেছিলেন এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে উত্তোলিত প্রত্যায়িত নকল (Exhibit-2) আদালতে প্রদর্শন করা হয়েছিল। সাক্ষ্য আইনের ৭৯ ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যায়িত নকলের বিশুদ্ধতা আইনগতভাবে অনুমিত (Presumed genuine)। তাছাড়া দলিলটি ৩০ বছরের অধিক প্রাচীন হওয়ায় তা আনুষ্ঠানিক প্রমাণের ঊর্ধ্বে। বিচারিক আদালত সাক্ষ্য আইনের এই মূলনীতি অনুধাবনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

বিজ্ঞ আইনজীবী অত্যন্ত সততা ও সাহসিকতার সাথে আদালতে স্বীকার করেন যে, বিচারিক আদালতে বাদিপক্ষের স্থানীয় আইনজীবীর কিছু মারাত্মক কৌশলগত গাফিলতি ছিল। প্রথমত, মূল দলিল কেন দেওয়া সম্ভব হয়নি তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা পিডব্লিউ-১ এর জবানবন্দিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ১.১৪০ একর জমির মোট ছয়টি পৃথক তফসিল থেকে নালিশি ৩০.২৫ শতক জমি কীভাবে চিহ্নিত হলো এবং সরকার বাকী জমি এল.এ. কেসে অধিগ্রহণ করার প্রমাণপত্র আদালতে দাখিল করা হয়নি। তৃতীয়ত, বিরোধীয় জমিতে দোতলা পাকা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পৌর কর রসিদ বা বিদ্যুৎ বিল দাখিল করা হয়নি। বিজ্ঞ কৌঁসুলি জোর দিয়ে বলেন যে, আইনজীবীর এহেন অদক্ষতা ও অসাবধানতার জন্য বাদিদের মতো সাধারণ নাগরিকদের তাদের পৈতৃক বসতভিটা ও মূল্যবান সম্পত্তি থেকে চিরতরে বঞ্চিত করা ন্যায়ের নীতির চরম পরিপন্থী। তিনি মামলাটি বিচারিক আদালতে রিমান্ডে পাঠিয়ে আরজি সংশোধন ও অতিরিক্ত সাক্ষ্য দাখিলের সুযোগ প্রদানের বিনীত প্রার্থনা জানান।

৬. মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ (Judicial Analysis)

মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ মামলার নথি ও নথিস্থ সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে কয়েকটি সুদূরপ্রসারী পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন:

(ক) প্রাচীন দলিলের প্রত্যায়িত নকল ও মূল দলিলের ব্যাখ্যার আবশ্যকতা:
আদালত উল্লেখ করেন যে, এটি অনস্বীকার্য সত্য যে নালিশি ৩০.২৫ শতক জমি মাহবুবুল আলম শেড ও ইয়াকুব শেডের মালিকানাধীন ছিল এবং সংশ্লিষ্ট পি.এস. ও আর.এস. খতিয়ান তাদের নামেই হয়েছিল। বাদিপক্ষ ১৯৬২ সালের রেজিস্ট্রি দলিলের প্রত্যায়িত নকল প্রদর্শন করেছে। কিন্তু উক্ত দলিলের ভেতরে ছয়টি পৃথক তফসিলে ১.১৪০ একর জমি বর্ণিত রয়েছে। বাদিদের আরজিতে স্পষ্ট করা হয়নি যে কোন তফসিল থেকে ঠিক কোন ৩০.২৫ শতক জমি বিরোধের বিষয়বস্তু। তাছাড়া সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী সার্টিফাইড কপি দাখিল করার পূর্বে মূল দলিলের অবস্থান বা তা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক ব্যাখ্যা থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল, যা পিডব্লিউ-১ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

(খ) আরজির অনুচ্ছেদ ২(ক) ও দখলের প্রকৃতি অস্বীকার না করার প্রভাব:
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, বাদিগণ আরজির অনুচ্ছেদ ২(ক)-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে নালিশি জমিতে বাদিদের পূর্বসূরি একটি দোতলা পাকা আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছেন এবং চারদিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে জমিটি সুরক্ষিত করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাবে বাদিদের এই দখল ও পাকা ভবনের অস্তিত্ব সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার করেনি! বিবাদীগণ কেবল দাবি করেছেন তারা ওয়ারিশ হিসেবে দখলে আছেন, কিন্তু তাদের দখলের ধরন বা পাকা বাড়িটি কার—তা নিয়ে কোনো সদুত্তর দেননি। দেওয়ানী কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট অস্বীকারের অভাব বাদীর দাবির পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

(গ) আইনজীবীর গাফিলতিতে পক্ষকে শাস্তি না দেওয়ার নীতি:
হাইকোর্ট বেঞ্চ সুস্পষ্টভাবে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বিরোধীয় সম্পত্তিতে দোতলা ভবনের পৌর কর রসিদ, বিদ্যুৎ বিল এবং গ্যাস/পানি বিল নিশ্চিতভাবেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বিচারিক আদালতে নিয়োজিত আইনজীবীর অদক্ষতা ও অসাবধানতার কারণেই এসব মৌলিক প্রামাণ্য নথি দাখিল করা সম্ভব হয়নি। দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্য হলো বিরোধের বাস্তব সত্য উদঘাটন করা, কোনো আইনজীবীর ড্রাফটিং বা ট্রায়াল পরিচালনার ত্রুটির সুযোগে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীকে তার বাড়ি ও জমি থেকে উৎখাত করা নয়।

৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যপ্রণালী নির্দেশ (Decision & Remand Order)

সার্বিক পারিপার্শ্বিকতা, নথির সাক্ষ্য এবং আইনের সামগ্রিক লক্ষ্য বিবেচনা করে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, চট্টগ্রাম কর্তৃক প্রদত্ত খারিজ আদেশ বাতিলযোগ্য বলে সাব্যস্ত করেন।

  • আপিল মঞ্জুর: ১ম আপিল নং ৩৯৯/২০১১ মঞ্জুর করা হলো (First Appeal is allowed)।
  • বিচারিক আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল: ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, চট্টগ্রাম কর্তৃক অপর মোকদ্দমা নং ৩৫/২০০৪-এ বিগত ২৮.০৯.২০১১ তারিখে প্রদত্ত খারিজ রায় ও ডিক্রি বাতিল ও রদ করা হলো।
  • পুনঃবিচারের জন্য রিমান্ড (Remand for Retrial): মামলাটি বিচারিক আদালতে পুনঃবিচারের জন্য ফেরত পাঠানো হলো। বাদিপক্ষকে তাদের আরজি সংশোধন করে নালিশি জমির সুনির্দিষ্ট বিবরণ, অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নথি এবং দোতলা ভবনের পৌর কর ও বিদ্যুৎ বিল দাখিলের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করা হলো।
  • বিবাদীদের প্রতিকার: বিবাদীপক্ষ উপস্থিত হলে তাদেরকে অতিরিক্ত লিখিত জবাব দাখিল এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পূর্ণ সমসুযোগ প্রদান করতে হবে।
  • নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: বিচারিক আদালতের নথি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হলো; কোনো পক্ষের ওপর খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)

পাঠক ও বিজ্ঞ গবেষকদের সুবিধার্থে এই ঐতিহাসিক রায়ের সমস্ত প্রশাসনিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিচে সন্নিবেশিত করা হলো:

বিষয়বস্তু মামলার বিস্তারিত তথ্য
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী আপিল এখতিয়ার)
মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী
মামলা নম্বর ও শ্রেণি ১ম আপিল নং ৩৯৯ / ২০১১ (First Appeal No. 399 of 2011)
পক্ষগণের নাম মোছা: মালেক রহমান এবং অন্যান্য (আপিলকারী/বাদী) বনাম আলহাজ্ব মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম শেট এবং অন্যান্য (রেসপনডেন্ট/বিবাদী)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ আপিলকারী পক্ষে: জনাব মো: আলমগীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং জনাব চঞ্চল কুমার দত্ত, অ্যাডভোকেট
রেসপনডেন্ট পক্ষে: কেউ উপস্থিত হননি
উৎস ও বিচারিক আদালত ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, চট্টগ্রাম (অপর মোকদ্দমা নং ৩৫/২০০৪, রায়: ২৮.০৯.২০১১)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি ও চূড়ান্ত রায়: ১২ আগস্ট ২০২৬
মূল আইনি আলোচ্য ধারা Evidence Act, 1872 (Sections 79 & 90), Code of Civil Procedure (Order XLI Rule 23/25, Order VI Rule 17)
অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক 📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড
🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button