ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও চেক ইস্যু করলে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলা চলবে: হাইকোর্টের যুগান্তকারী অনুশাসন
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১ (NI Act)-এর ১৩৮ ধারার উদ্দেশ্য হলো বাণিজ্যিক লেনদেনে চেকে বিশ্বস্ততা বজায় রাখা। যদি কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী নিজ অ্যাকাউন্ট বন্ধ (Account Closed) করার পর উক্ত অ্যাকাউন্টের চেক ইস্যু করে এবং ব্যাংক মেমোতে ‘Account Closed’ রিমার্কস দিয়ে চেকটি ফেরত দেওয়া হয়, তবে উক্ত মামলাটি এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য ও দণ্ডযোগ্য অপরাধ। অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকা মূলত তহবিলের অপ্রতুলতারই (Insufficiency of funds) নামান্তর এবং তা কোনো অবস্থাতেই ১৩৮ ধারার ফৌজদারি দায় এড়ানোর আইনি অজুহাত হতে পারে না।
মামলার বিবরণে জানা যায়, প্রাইম ব্যাংক পিএলসি-এর মতিঝিল শাখা থেকে আলহাজ্ব মো. শামসুদ্দোহা একটি বাণিজ্যিক ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। উক্ত ঋণের দায় পরিশোধের নিমিত্তে তিনি ২০২২ সালে ব্যাংকের অনুকূলে ৩৫ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। প্রাইম ব্যাংক উক্ত চেকটি নগদায়নের জন্য উপস্থাপন করলে সংশ্লিষ্ট ড্রয়ি ব্যাংক থেকে ‘Account Closed’ মন্তব্যসহ স্লিপ দিয়ে চেকটি ফেরত দেওয়া হয়। ব্যাংক আইনানুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করে এবং টাকা না পেয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করে।
বিচার শেষে যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। দায়রা জজ আদালতে আপিল করেও সাজা বহাল থাকে। অতঃপর আসামি হাইকোর্টে ক্রিমিনাল রিভিশন দায়ের করে যুক্তি দেখান যে, চেকটি যখন ব্যাংকে উপস্থাপিত হয় তখন অ্যাকাউন্টটি জীবিত ছিল না। ফলে অ্যাকাউন্ট না থাকলে সেখানে তহবিল অপর্যাপ্ততার প্রশ্ন ওঠে না এবং মামলাটি ১৩৮ ধারায় নয় বরং দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা হতে পারত।
👤 আবেদনকারী আসামির আইনি যুক্তি
আসামির আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, ১৩৮ ধারায় অপরাধ গঠনের শর্ত হলো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বহাল থাকতে হবে। অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকায় ব্যাংক কোনো চেক অনার করতে পারত না, তাই এটি কেবল দেওয়ানি বিরোধ বা বড়জোর দণ্ডবিধির আওতাভুক্ত।
👥 বাদী ব্যাংকের যুক্তি
ব্যাংকের বিজ্ঞ কৌঁসুলি দাবি করেন যে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একাধিক সিদ্ধান্তে পরিষ্কার করা হয়েছে যে ‘Account Closed’ মন্তব্য স্বয়ং তহবিলের শূন্যতা প্রমাণ করে এবং এটি ১৩৮ ধারার উদ্দেশ্য পূর্ণ করে।
হাইকোর্ট বিভাগ নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট ধারার আইনি ভাষা পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, যদি কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়ে পূর্বের বা নতুন চেক প্রদান করে দায় এড়াতে চায়, তবে আইনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যাবে। কোনো অপরাধী নিজের অপরাধমূলক কাজের সুযোগ নিয়ে (Take advantage of own wrong) বিশেষ আইনের বিচার থেকে রেহাই পেতে পারে না।
মহামান্য হাইকোর্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির Majed Hossain vs. State, 70 DLR (AD) 45 এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী মামলা NEPC Micon Ltd. vs. Magma Leasing Ltd. (1999) 4 SCC 253 উল্লেখ করে বলেন: “The return of a cheque on the ground ‘Account Closed’ falls squarely within the ambit of Section 138 of the Negotiable Instruments Act. Closure of account is nothing but an extreme form of insufficiency of funds. A dishonest drawer cannot escape criminal liability by closing the account before presentation of the cheque.”
চূড়ান্ত রায়: ক্রিমিনাল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করা হয়। বিচারিক আদালতের প্রদত্ত ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা বহাল রাখা হয়। আসামির আত্মসমর্পণের জন্য ৩০ দিনের সময় প্রদান করা হয়; অন্যথায় আদালতকে অবিলম্বে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে সাজা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
- অ্যাকাউন্ট ক্লোজডের আইনি পরিণতি: ব্যাংক মেমোতে ‘Account Closed’ লেখা থাকা মানেই তহবিল অপ্রতুলতার অপরাধ প্রমাণিত হওয়া।
- ১৩৮ ধারার কঠোরতা: চেক ইস্যু করার পর অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া প্রতারণামূলক হলেও তা ১৩৮ ধারাতেই বিচার্য।
- চেকে স্বাক্ষরই চূড়ান্ত দায়: ড্রয়ারের স্বাক্ষরিত চেক হস্তান্তর হলে তার আইনি দায় অস্বীকারের সুযোগ নেই।
- অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার পূর্বে সতর্কতা: কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ক্লোজ করার আগে ওই অ্যাকাউন্টের কোনো চেক বাজারে বকেয়া আছে কি না নিশ্চিত হোন।
- অব্যবহৃত চেকবই সমর্পণ: অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার সময় সমস্ত অব্যবহৃত চেক পাতা ব্যাংকে সারেন্ডার করে রিসিভ কপি নিন।
- মামলা থেকে বাঁচতে আপস: অ্যাকাউন্ট ক্লোজড মেমো নিয়ে মামলা হলে দ্রুত অর্থ পরিশোধ করে আদালতে সমঝোতার দরখাস্ত দিন।
- লিগ্যাল নোটিশ গ্রহণে অবহেলা না করা: নোটিশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই টাকা পরিশোধ করলে মামলা রুজু হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: নালিশি আরজিতে আপিল বিভাগের ৭০ ডিএলআর (এডি) ৪৫ নজিরের রেফারেন্স শুরুতেই যুক্ত করুন।
