স্ত্রীর স্বাধীন সম্মতি ও দেনমোহর ক্ষতিপূরণ ছাড়া একতরফা ‘খোলা তালাক’ আইনত অচল: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: মুসলিম আইন ও পারিবারিক আদালত আইন অনুযায়ী ‘খোলা তালাক’ (Khula Talaq) একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিভিত্তিক বিবাহবিচ্ছেদ (Dissolution of marriage by mutual agreement initiated by the wife), যার মূল শর্ত হলো স্ত্রীর স্বাধীন ইচ্ছা ও প্রস্তাব এবং স্বামীকে দেনমোহর বা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি লাভ। স্বামী কখনো একতরফাভাবে নিজ উদ্যোগে স্ত্রীকে জোরপূর্বক তালাকের নোটিশ পাঠিয়ে দাবি করতে পারে না যে এটি ‘খোলা তালাক’ হয়েছে এবং এর ফলে স্ত্রী দেনমোহর বা খোরপোষের অধিকার হারিয়েছে। স্ত্রীর সুস্পষ্ট লিখিত সম্মতি ও দেনমোহর ত্যাগের প্রমাণ ব্যতিরেকে স্বামীর আনীত খোলার দাবি আইনত বাতিলযোগ্য এবং স্বামী সম্পূর্ণ দেনমোহর ও খোরপোষ পরিশোধ করতে বাধ্য।
মামলার বিবরণে জানা যায়, মোছাঃ ফারহানা ইয়াসমিনের সাথে মোঃ রেজাউল করিমের ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। নিকাহনামায় ১০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয় এবং স্বামী রেজাউল করিম যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। স্ত্রী পিতার বাড়ি আশ্রয় নিয়ে পারিবারিক আদালতে দেনমোহর ও বকেয়া খোরপোষের মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর স্বামী আদালতে একটি কথিত ‘খোলা তালাকনামা’ ও কাজী অফিসের সার্টিফিকেট দাখিল করে দাবি করেন যে, স্ত্রী স্বেচ্ছায় সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি ত্যাগ করে ‘খোলা তালাক’ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু স্ত্রী আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান যে তিনি কখনোই কোনো কাজী অফিসে যাননি এবং কোনো খোলা তালাকের কাগজে স্বাক্ষর করেননি। পারিবারিক আদালত এবং অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত উভয়ই অনুসন্ধান করে দেখতে পান যে কাজী অফিসের খাতায় স্ত্রীর যে টিপসহি ও স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ জালিয়াতি। আদালত স্ত্রীর অনুকূলে ১০ লাখ টাকা দেনমোহর ও খোরপোষের ডিক্রি দেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে স্বামী হাইকোর্টে এই সিভিল রিভিশন আবেদন করেন।
👤 আবেদনকারী স্বামীর আইনি যুক্তি
স্বামীর বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, কাজী একটি সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং তার রেজিস্ট্রি করা খোলা তালাকনামা সাক্ষ্য আইনের ১১৪(ঙ) ধারা মতে নিয়মিত বলে গণ্য হবে। খোলা তালাক কার্যকর হওয়ায় দেনমোহর মওকুফ হয়ে গেছে।
👥 বিপরীতপক্ষ স্ত্রীর যুক্তি
স্ত্রীর বিজ্ঞ কৌঁসুলি দাবি করেন যে, স্বামী নিজ দায় এড়াতে ভুয়া খোলা তালাক সাজিয়েছেন। স্ত্রী কখনো মুক্তি চায়নি এবং কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি। জালিয়াতি সমস্ত কার্যক্রমকে বাতিল করে।
উভয় অধস্তন আদালত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজীর রেজিস্টার ও সাক্ষীদের জেরা পর্যালোচনা করেন। কাজীর সাক্ষ্যেই প্রকাশ পায় যে স্বামী একা কাজীর অফিসে গিয়ে তালাক এন্ট্রি করিয়েছিলেন এবং কোনো নিরপেক্ষ শনাক্তকারী উপস্থিত ছিল না। বিচারিক আদালত সঠিকভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছেন যে মুসলিম আইন অনুসারে খোলা কোনো একতরফা ডিক্রি নয়।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত Dr. Abdur Rahim vs. Mst. Habiba Khatun, 49 DLR (AD) 18 এবং 55 DLR (AD) 48 বিশ্লেষণ করেন। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছেন: “Khula is an agreement between the spouses to dissolve the marital bond in lieu of compensation paid by the wife. It fundamentally requires an offer from the wife and acceptance by the husband with free consent. A husband cannot unilaterally set up a plea of Khula to defeat the legitimate claim of the wife for dower and maintenance.”
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করা হয়। স্বামীর আনীত কথিত খোলা তালাকের দাবি প্রতারণামূলক ঘোষণা করে বাতিল করা হয় এবং পারিবারিক আদালতের ১০ লাখ টাকার দেনমোহর ও বকেয়া খোরপোষের ডিক্রি শতভাগ বহাল রাখা হয়। স্বামীকে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত সমুদয় অর্থ আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, ব্যর্থতায় তার ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়।
- খোলা তালাকের দ্বিপাক্ষিকতা: স্ত্রী স্বপ্রণোদিত হয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত না হলে স্বামী কখনোই খোলা দাবি করতে পারে না।
- দেনমোহরের পবিত্র সুরক্ষা: দেনমোহর নারীর অনস্বীকার্য অধিকার; কোনো ভুয়া কাগজের মাধ্যমে তা হরণ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
- কাজীর রেজিস্ট্রির সীমাবদ্ধতা: কাজীর রেজিস্ট্রি হলেই তা অকাট্য সত্য নয়; পক্ষগণের স্বাধীন সম্মতি আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ।
- ভুয়া খোলা তালাকের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ: স্বামী খোলার দাবি করলে আদালতে লিখিত দরখাস্ত দিয়ে স্বাক্ষর অস্বীকার করুন।
- হস্তরেখা বিশারদের মতামত গ্রহণ: কাজীর বইয়ের স্বাক্ষর জাল হলে আদালতে সিভিল পিটিশনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ তলবের আবেদন জানান।
- কাজীকে সমন দিয়ে জেরা করা: সংশ্লিষ্ট কাজীকে আদালতে ডেকে এনে কীভাবে ও কার উপস্থিতিতে এন্ট্রি হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ জেরা করুন।
- দেনমোহরের রসিদ দাবি: দেনমোহর পরিশোধের কোনো দালিলিক প্রমাণ ছাড়া স্বামীর মৌখিক দাবি আদালতে টেকসই নয়।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের হাবিব খাতুন মামলা (49 DLR AD 18) রেফার করে খোলার উপাদান অনুপস্থিতির যুক্তি জোরালো করুন।

