সিআইবি (CIB) রিপোর্টে ভুলবশত ঋণখেলাপি তালিকাভুক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত ও সংশোধনের বাধ্যবাধকতা: হাইকোর্টের রায়

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (Bank Company Act, 1991)-এর ধারা ৪২ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি অপারেশনাল ম্যানুয়াল অনুযায়ী ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (CIB)-তে সংরক্ষিত তথ্য শতভাগ নির্ভুল ও হালনাগাদ থাকা অপরিহার্য। কমার্শিয়াল ব্যাংকের আইটি সিস্টেমের কারিগরি ত্রুটি, সুদ হিসাবায়নের অসঙ্গতি বা অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে কোনো নিয়মিত কিস্তি পরিশোধকারী গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানকে যদি ভুলবশত বা অসৎ উদ্দেশ্যে ‘খেলাপি’ (Defaulted) হিসেবে সিআইবি ডেটাবেজে রিপোর্ট করা হয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তাৎক্ষণিক নিরপেক্ষ তদন্ত অনুষ্ঠানপূর্বক উক্ত ভুল সিআইবি ডাটা সংশোধন করতে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে আইনত বাধ্য।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

মামলার বিবরণে জানা যায়, রিট আবেদনকারী কনফিডেন্স পাওয়ার লিমিটেড একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি থেকে গৃহীত একটি সিন্ডিকেট টার্ম লোনের সমস্ত কিস্তি চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত পরিশোধ করে আসছিল। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের নতুন কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে কনফিডেন্স পাওয়ারের একটি কিস্তি ‘অপরিশোধিত’ দেখিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেজে ‘বাজে ঋণ/খেলাপি’ হিসেবে রিপোর্ট আপলোড হয়ে যায়।

সিআইবিতে খেলাপি হিসেবে নাম ওঠার কারণে প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য ব্যাংক থেকে চলতি মূলধন ছাড় বন্ধ হয়ে যায়, বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের আমদানি এলসি স্থগিত হয়ে পড়ে এবং তাদের শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি সেলে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাখিল করে ডাটা সংশোধনের আবেদন জানায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক জানায় যে সংশ্লিষ্ট কমার্শিয়াল ব্যাংক সংশোধন রিকোয়েস্ট না পাঠালে তারা নিজ থেকে কিছু করতে পারবে না। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গড়িমসি করায় বাধ্য হয়ে কোম্পানি হাইকোর্টে এই রিট পিটিশন দায়ের করে।

👤 রিট আবেদনকারীর আইনি যুক্তি

আবেদনকারীর সিনিয়র আইনজীবী যুক্তি দেন যে, সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। ব্যাংকের ভুলে খেলাপি চিহ্নিত করায় প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রেগুলেটরি বডি হিসেবে দায় এড়াতে পারে না।

👥 বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী দাবি করেন যে, সিআইবি একটি সেন্ট্রাল রিপোজিটরি যা মেম্বার ব্যাংকগুলোর আপলোড করা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কমার্শিয়াল ব্যাংকের ভুলের দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নয়।

৩. রেগুলেটরি ব্যর্থতা ও আইনি ত্রুটি (Regulatory Failure)

হাইকোর্ট বিভাগ ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও উভয় পক্ষের জবাব পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, কনফিডেন্স পাওয়ারের কোনো কিস্তি বকেয়া ছিল না। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক স্বীকার করেছে যে এটি তাদের আইটি ত্রুটি ছিল। তথাপি বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকতার দোহাই দিয়ে মাসের পর মাস ভুল ডাটা ঝুলিয়ে রেখেছে, যা আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে চরম দায়িত্বহীনতা।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা ও রেশিও ডেসাইডেনডি (High Court’s Ratio)

মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ল্যান্ডমার্ক সিদ্ধান্ত 54 DLR (AD) 130 এবং Writ Petition No. 4124 of 2022 (Special Banking Bench) উল্লেখ করে অভিমত দেন: “Bangladesh Bank is the statutory regulator of the banking sector. The CIB database directly affects the life, livelihood, and commercial reputation of corporate bodies. When an evident mistake or erroneous reporting by a commercial bank is brought to the notice of Bangladesh Bank with authentic proof of payment, Bangladesh Bank cannot abdicate its statutory duty under Section 42 of the Bank Company Act. It is under a constitutional obligation to rectify the erroneous CIB report without delay.”

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায়: রিট পিটিশনটি মঞ্জুর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংককে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিআইবি ডেটাবেজ থেকে আবেদনকারী কনফিডেন্স পাওয়ার লিমিটেডের খেলাপি স্ট্যাটাস অপসারণ করে সম্পূর্ণ নিয়মিত (Clean/Standard) হিসেবে প্রদর্শন করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসাথে গাফিলতির দায়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি-কে রিট আবেদনকারীকে মামলার খরচ বাবদ ২ লাখ টাকা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • সিআইবি তথ্যের নির্ভুলতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেজে কোনো ভুল তথ্য বহাল রাখা বেআইনি।
  • নিয়ন্ত্রক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়: বাণিজ্যিক ব্যাংক ভুল করলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে তা সংশোধনের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রাখে।
  • ব্যবসায়িক সুনামের সুরক্ষা: ভুল সিআইবি রিপোর্টিংয়ের কারণে ক্ষতিসাধন হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার বিদ্যমান।

৭. ব্যবসায়ী ও করপোরেট আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
  1. নিয়মিত সিআইবি স্ট্যাটাস চেক: ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিজস্ব সিআইবি রিপোর্ট তল্লাশি করে কোনো ভুল এন্ট্রি আছে কি না যাচাই করুন।
  2. কিস্তি পরিশোধের রসিদ সংরক্ষণ: ব্যাংক ট্রান্সফার বা চালানের মূল কপি সযত্নে ডিজিটাল ও হার্ডকপিতে সংরক্ষণ করুন।
  3. লিখিত অভিযোগ দাখিল: ভুল দেখা মাত্র কমার্শিয়াল ব্যাংকের এমডি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি জিএম বরাবর লিখিত চিঠি দিন।
  4. রিট পিটিশনের দ্রুত আশ্রয়: ৭ দিনের মধ্যে সমাধান না হলে হাইকোর্টে ১০২ অনুচ্ছেদে রিট দায়ের করে ২৪ ঘণ্টার নির্দেশ নিন।
  5. আইনজীবীদের জন্য কৌশল: ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪২ ধারা ও স্পেশাল ব্যাংকিং বেঞ্চের নজির উল্লেখ করে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করুন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল রেকর্ড রেফারেন্স
মামলার নম্বর Writ Petition No. 11980 of 2025
আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (ডিভিশন বেঞ্চ)
পক্ষদ্বয় কনফিডেন্স পাওয়ার লিঃ বনাম বাংলাদেশ ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি
আইন ও ধারা Bank Company Act, 1991 (Section 42); Constitution of Bangladesh (Articles 27, 31, 40, 102)
অফিসিয়াল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button