বাটোয়ারা মোকদ্দমা খারিজ ও পুনঃবহাল: ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের অনুপস্থিতি ও চলমান কারণ সূত্রে হাইকোর্টের নজির

📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, বাটোয়ারা মামলার (Partition Suit) কারণ বা নালিশের ভিত্তি একটি চলমান ও পুনরাবৃত্তিমূলক অধিকার (Recurring and Continuing Cause of Action)। এজমালি সম্পত্তি থেকে কোনো সহ-শরিককে চূড়ান্তভাবে সম্পূর্ণ বেদখল (Ouster) না করা পর্যন্ত বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ প্রযোজ্য হয় না। দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ৮ বিধি অনুযায়ী কোনো বাটোয়ারা মামলা বাদীর অনুপস্থিতিতে খারিজ (Dismissed for default) হলেও সহ-শরিকের মৌলিক স্বত্ব বিলুপ্ত হয় না। অতএব, দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ৯ বিধির অধীনে মামলা পুনরুজ্জীবনের (Restoration) দরখাস্ত বিবেচনার ক্ষেত্রে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ বা কারিগরি নয়, বরং মূল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সদয় ও উদার (Liberal) হওয়া আবশ্যক। একইসঙ্গে হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, যেক্ষেত্রে বিচারিক আদালত নিজেই বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধানকে (ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান) সাক্ষী হিসেবে তলব করার অনুমতি নামঞ্জুর করে, পরবর্তীতে সেই সাক্ষীর অনুপস্থিতি বা দালিলিক প্রমাণের অভাব দেখিয়ে ছানি মামলা খারিজ করা একটি স্ববিরোধী ও আত্মঘাতী বিচারিক ভুল (Self-contradictory finding causing failure of justice)।

১. মামলার পটভূমি ও ঘটনাপঞ্জি (Background & Chronology)

আলোচ্য দেওয়ানী রিভিশন মোকদ্দমাটির উৎপত্তি কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিগত ১৯৯৪ সালে দায়েরকৃত ৭২ নম্বর বাটোয়ারা মোকদ্দমা (Partition Suit No. 72 of 1994) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন মো: নুরুল হক এবং অন্যান্য সহ-শরিকগণ (বাদী-দরখাস্তকারীগণ) মো: শামসুদ্দিন মণ্ডল ও অন্যান্য প্রতিপক্ষগণের বিরুদ্ধে, নালিশি এজমালি সম্পত্তির বণ্টন ও পৃথক সাহাম বরাদ্দের প্রার্থনায়।

দেওয়ানী মামলার স্বাভাবিক জটিলতা ও বহুসংখ্যক পক্ষের উপস্থিতির কারণে মামলাটি বিচারিক আদালতে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বিচারাধীন থাকে। অবশেষে বিগত ২৭ জুলাই ২০০৯ তারিখে মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির (Peremptory Hearing) জন্য দিন ধার্য করা হয়। উক্ত তারিখে বাদিপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী (যিনি কুড়শা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন) আদালতে হাজির হতে পারেননি। কারণ উক্ত দিন নবনির্মিত ইউনিয়ন পরিষদ ভবন উদ্বোধনের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের পূর্বনির্ধারিত সরকারি কর্মসূচি থাকায় তিনি অফিস থেকে ছুটি পাননি। ফলে বাদিপক্ষ আদালতে সময়ের প্রার্থনা (Time Petition) দাখিল করেন। কিন্তু বিচারিক আদালত উক্ত সময়ের দরখাস্ত নামঞ্জুর করে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ৮ বিধি (Order IX Rule 8 CPC) অনুযায়ী বাদিদের অনুপস্থিতিতে মামলাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed for default) করে দেন।

উক্ত খারিজ আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদিপক্ষ মাত্র এক মাসের মধ্যে কালবিলম্ব না করে বিচারিক আদালতে দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ৯ বিধিমতে মামলাটি পূর্বাবস্থায় বহাল করার জন্য বিবিধ মোকদ্দমা নং ০৪/২০০৯ (Miscellaneous Case No. 04 of 2009 – ছানি মামলা) দায়ের করেন।

২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)

ছানি মামলায় এবং পরবর্তী দেওয়ানী কার্যক্রমে উভয় পক্ষ স্ব-স্ব বক্তব্য ও আইনি প্রতিরক্ষা উত্থাপন করেন।

🏛️ বাদী-দরখাস্তকারী পক্ষের বক্তব্য ও আইনি দাবি

  • বাধ্যতামূলক সরকারি দায়িত্ব: বাদিপক্ষের প্রধান সাক্ষী কুড়শা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ছিলেন; সাংসদ কর্তৃক ইউপি ভবন উদ্বোধনের জন্য ছুটি না পাওয়ায় তিনি আদালতে আসতে পারেননি।
  • যথাসময়ে ছানি মামলা: খারিজ আদেশের মাত্র এক মাসের মধ্যে ৯ আদেশ ৯ বিধিমতে ছানি মামলা দায়ের করায় বাদিদের মোকাদ্দমা চালানোর সদিচ্ছা প্রমাণিত।
  • চেয়ারম্যানের সাক্ষ্যের চেষ্টা: বাদিপক্ষ ইউপি চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র ও তাকে সাক্ষী হিসেবে পরীক্ষা করার আবেদন করলেও আদালত তা ১৮১ নং আদেশে অন্যায়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
  • বাটোয়ারার কারণ চলমান: বাটোয়ারা মামলার কারণ চিরন্তন ও চলমান; ২৮ বিএলডি (এইচসিডি) ৪৫৭ নজির মতে সহ-শরিকের অধিকার কারিগরি কারণে নষ্ট করা যায় না।
  • নতুন মামলার জটিলতা: মামলাটি পুনরুজ্জীবিত না করলে বাদিদের নতুন করে মামলা করতে হবে, যা উভয় পক্ষের জন্য আরও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করবে।

🛡️ বিবাদী-প্রতিপক্ষ পক্ষের জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  • দীর্ঘদিনের মামলা জিয়িয়ে রাখা: ১৯৯৪ সালের মামলা ২০০৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অযথা ঝুলিয়ে রেখে বাদিপক্ষ বিবাদীদের চরম হয়রানি করেছে।
  • যথাযথ কারণ দর্শাতে ব্যর্থ: ২৭.০৭.২০০৯ তারিখে সাক্ষী কেন আসেননি তার কোনো দালিলিক প্রমাণ যেমন ছুটির আবেদন বা নামঞ্জুরের নথি যথাসময়ে দাখিল করা হয়নি।
  • তদবিরে গাফিলতি: পিডব্লিউ-১ নিজেই ইউপি সচিব হওয়া সত্ত্বেও সংসদ সদস্যের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সরকারি চিঠি আদালতে উপস্থাপন করতে চরম ব্যর্থ হয়েছেন।
  • বিলম্বিত সাক্ষ্য আবেদন: যুক্তিতর্ক শুনানির স্তরে এসে ইউপি চেয়ারম্যানকে সাক্ষী ডাকার আবেদন করা ছিল কেবল সময়ক্ষেপণের অপচেষ্টা যা আদালত সঠিকভাবেই নাকচ করেছে।
  • অধস্তন আদালতের যৌথ সিদ্ধান্ত: যুগ্ম জেলা জজ ও জেলা জজ উভয় আদালতই বাদীর অজুহাত অবিশ্বাস্য গণ্য করে খারিজ করেছেন, যাতে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ নিষ্প্রয়োজন।

৩. বিচারিক ও আপিল আদালতের কার্যধারা (Subordinate Courts’ Findings)

ছানি মামলা চলাকালে বাদিপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেন এবং চেয়ারম্যানকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে পরীক্ষা করার জন্য প্রার্থনা জানান। কিন্তু বিজ্ঞ অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালত ১৯ জুলাই ২০১০ তারিখে ১৮১ নম্বর আদেশে বাদিদের সেই আবেদন সরাসরি নামঞ্জুর করেন। এর পরদিনই, অর্থাৎ ২০ জুলাই ২০১০ তারিখে ১৮২ নম্বর আদেশে আদালত চূড়ান্ত রায় দিয়ে ছানি মামলাটি খারিজ করে দেন! বিচারিক আদালত রায়ে বিস্ময়করভাবে বলেন যে—”বাদিপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের ছুটির দরখাস্ত আদালতে দাখিল করেনি এবং ইউপি চেয়ারম্যানকে সাক্ষী হিসেবে পরীক্ষা করেনি, বিধায় তাদের দাবির সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।”

উক্ত অবিচারের বিরুদ্ধে বাদিপক্ষ কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা জজ ১ম আদালতে দেওয়ানী বিবিধ আপিল নং ৪৬/২০১০ (Miscellaneous Appeal No. 46 of 2010) দায়ের করেন। কিন্তু বিজ্ঞ আপিল আদালতও বিগত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে এক সংক্ষিপ্ত রায়ে বিচারিক আদালতের ভুল পর্যবেক্ষণকে হুবহু সমর্থন করে আপিল খারিজ করে দেন। আপিল আদালত মন্তব্য করেন যে, বাদিপক্ষ ছুটির বিষয়ে যথাযথ প্রমাণ দেয়নি এবং মামলা চালানোর আগ্রহ হারিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলাটি টিকিয়ে রেখেছে। সংক্ষুব্ধ বাদিপক্ষ এরপর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ২২৫৩/২০১২ দায়ের করে রুল নিবেদন করেন।

৪. হাইকোর্টে পর্যালোচিত মূল আইনি প্রশ্নসমূহ (Core Legal Issues)

মহামান্য একক বেঞ্চে শুনানিকালে নিম্নলিখিত মৌলিক আইনি বিরোধগুলো সমাধানের জন্য উত্থাপিত হয়:

  1. আদালতের স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত ও সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান: কোনো পক্ষ যখন তার দাবির সমর্থনে একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সাক্ষীকে (ইউপি চেয়ারম্যান) তলব করার আবেদন করে এবং আদালত নিজেই তা নাকচ করে, পরবর্তীতে সেই সাক্ষীর সাক্ষ্য না থাকার অজুহাতে মামলা খারিজ করা আইনসংগত কি না?
  2. বাটোয়ারা মামলার কারণ ও ৯ আদেশ ৯ বিধির প্রয়োগ: বাটোয়ারা মামলার নালিশের কারণ কি চলমান (Recurring Cause of Action)? মূল মামলা খারিজ হলে সহ-শরিকের অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়ে নতুন মোকদ্দমা করার পথ উন্মুক্ত থাকায় পূর্বের মামলাটিই খরচা সাপেক্ষে বহাল করা অধিকতর সমীচীন কি না?
  3. ১৭ আদেশ ১ ও ৩ বিধির বিধানাবলি: চূড়ান্ত শুনানির তারিখে সাক্ষী অনুপস্থিত থাকলে এবং সময়ের আবেদন করা হলে আদালত খরচা ধার্য করে মুলতবি দেওয়ার সুযোগ উপেক্ষা করে সরাসরি ৯ আদেশ ৮ বিধিতে খারিজ করার ক্ষেত্রে বিচারিক মনের প্রয়োগ ঘটেছে কি না?

৫. উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক (Submissions of the Learned Advocates)

শুনানিকালে দরখাস্তকারী পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী জনাব মো: সাইদুল আলম খান (Mr. Md. Saidul Alam Khan) যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, অধস্তন উভয় আদালতই মামলার বাস্তব অবস্থা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। এটি ছিল বহু শরিকের একটি জটিল বাটোয়ারা মামলা। বাদিপক্ষ অনুপস্থিতির কারণ প্রমাণের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং কুড়শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার দরখাস্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু বিচারিক আদালত নিজেই ১৮১ নম্বর আদেশে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে পরের দিনই চেয়ারম্যানের সাক্ষ্য না থাকার অজুহাতে মামলা খারিজ করে দেয়, যা আইনের চোখে চরম স্ববিরোধী এবং নথিস্থ প্রমাণের অপব্যাখ্যা (Misreading of evidence)।

বিজ্ঞ আইনজীবী বাংলাদেশ লিগ্যাল ডিসিশনস-এ প্রকাশিত হাইকোর্ট বিভাগের বিখ্যাত নজির Harmuj Sikder and others Vs. Ayub Ali Sikder and others (28 BLD (HCD) 457) উদ্ধৃত করে বলেন, বাটোয়ারা মামলার কারণ একটি অব্যাহত ও চলমান কারণ। মামলা খারিজ হয়ে গেলেও বাদিরা কালকেই নতুন একটি বাটোয়ারা মামলা করতে আইনত বাধ্য ও অধিকারী। কিন্তু ১৫ বছরের পুরনো একটি মামলা খারিজ রেখে নতুন মামলা করতে বাধ্য করা বিচারপ্রার্থী উভয়ের জন্য চরম সময়ক্ষেপণ ও আর্থিক ক্ষতির কারণ। সুতরাং কারিগরি কারণে মামলা না মেরে বাস্তব ন্যায়বিচারের স্বার্থে এটি পুনরুজ্জীবিত করা উচিত।

বিপরীতে প্রতিপক্ষ পক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী জনাব ষষ্ঠী সরকার (Mr. Shasti Sarker) যুক্তি দেখান যে, বাদিপক্ষ ১৯৯৪ সাল থেকে মামলাটি ঝুলিয়ে রেখে বিবাদীদের অযথা ভোগান্তিতে ফেলেছে। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীর সরকারি ব্যস্ততার স্বপক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক ছুটির চিঠি দাখিল করা হয়নি। যুক্তিতর্কের শেষ পর্যায়ে এসে চেয়ারম্যানকে সাক্ষী ডাকার আবেদন ছিল একটি সাজানো নাটক। সুতরাং অধস্তন আদালতদ্বয় যথাযথভাবেই ছানি মামলা ও আপিল খারিজ করেছেন এবং রিভিশন রুলটি দৃষ্টান্তমূলক খরচাসহ খারিজ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

৬. সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনগত অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Findings & Ratio)

মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং অধস্তন আদালতের নথিপত্র পর্যালোচনান্তে নিম্নোক্ত যুগান্তকারী আইনগত অনুসিদ্ধান্তসমূহ ব্যক্ত করেন:

(এক) সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করে বিরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবৈধতা:
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, বাদিপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে পরীক্ষা করার সুনির্দিষ্ট দরখাস্ত দাখিল করেছিল। কিন্তু বিচারিক আদালত নিজেই ১৯.০৭.২০১০ তারিখের ১৮১ নং আদেশে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। অথচ এর পরের দিনই আদালত রায়ে লিখলেন যে চেয়ারম্যানকে পরীক্ষা না করায় বাদীর বক্তব্য প্রমাণিত হয়নি! আদালত যখন নিজেই কোনো পক্ষকে তার অনুকূল সাক্ষ্য উপস্থাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, তখন সেই সাক্ষ্য না থাকার অজুহাতে বাদীর বিরুদ্ধে বিরূপ সিদ্ধান্ত (Adverse inference) গ্রহণ করা আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং বিচারিক মনের চরম অপপ্রয়োগ।

(দুই) বাটোয়ারা মামলার অব্যাহত কারণ (Recurring Cause of Action):
সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী বাটোয়ারা মামলার নালিশের কারণ একটি চলমান অধিকার। যতদিন পর্যন্ত সহ-শরিকদের সম্পত্তি মেট্স অ্যান্ড বাউন্ডস (Metes and bounds) অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে বণ্টন না হয় বা কোনো শরিককে সম্পূর্ণ বেদখল না করা হয়, ততদিন প্রত্যেক শরিকের এজমালি দখলের আইনগত অনুমিতি বলবৎ থাকে। ৯ আদেশের ৮ বিধিতে বাটোয়ারা মামলা খারিজ হলে সহ-শরিকের মৌলিক অধিকার নষ্ট হয় না। মামলা খারিজ বহাল রাখলে বাদিরা আবার নতুন মামলা দায়ের করবে, যা নতুন করে সমন জারি ও বিচারিক আনুষ্ঠানিকতার কারণে পক্ষগণের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তাই কারিগরি আইনের ফাঁদে ফেলে বাটোয়ারা মামলা শেষ না করে মূল বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মামলাটি বহাল করাই আইনের মূল উদ্দেশ্য।

(তিন) সৎ উদ্দেশ্য ও ক্ষতিপূরণমূলক খরচা:
বাদিপক্ষ খারিজ হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে কোনো বিলম্ব ছাড়া ছানি মামলা দাখিল করেছিলেন, যা তাদের মামলা চালানোর সৎ উদ্দেশ্যের (Bona fide intention) সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। তবে যেহেতু মামলাটি দীর্ঘকাল ধরে চলছে এবং বিবাদীপক্ষ একাধিকবার শুনানির মুখোমুখি হয়েছেন, সেহেতু বাদিপক্ষকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে রেহাই দেওয়া সমীচীন নয়। বিবাদীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে উপযুক্ত খরচা নির্ধারণ করে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করাই ন্যায়ের বিধান।

৭. চূড়ান্ত আদেশ ও বিচারিক নির্দেশনা (Final Decision & Directions)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনা শেষে রুলটি পরম (Absolute) ঘোষণা করেন এবং নিম্নোক্ত আদেশ প্রদান করেন:

  • রুল অ্যাবসোলিউট ও ক্ষতিপূরণ খরচা: দেওয়ানী রিভিশন রুলটি ১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকা খরচা সাপেক্ষে পরম (Absolute with costs) করা হলো।
  • অধস্তন আদালতের আদেশ বাতিল: কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা জজ ১ম আদালতের বিবিধ আপিল নং ৪৬/২০১০-এর রায় এবং অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা জজ আদালতের বিবিধ মোকদ্দমা নং ০৪/২০০৯-এর খারিজ আদেশ সম্পূর্ণরূপে রদ ও বাতিল করা হলো।
  • মূল মোকদ্দমা পুনরুজ্জীবিত: বিবিধ মোকদ্দমা নং ০৪/২০০৯ মঞ্জুর করা হলো এবং ১৯৯৪ সালের মূল ৭২ নম্বর বাটোয়ারা মোকদ্দমাটি (Partition Suit No. 72 of 1994) তার মূল নম্বর ও ফাইলে অবিলম্বে পুনরুজ্জীবিত (Restored to original file) করা হলো।
  • খরচা জমাদান ও গ্রহণের শর্ত: দরখাস্তকারীগণ ধার্যকৃত ১০,০০০/- টাকা খরচা বিচারিক আদালতের প্রথম শুনানির তারিখে জমা প্রদান করবেন এবং বিবাদী-প্রতিপক্ষগণ নিজ উদ্যোগে উক্ত অর্থ আদালত থেকে উত্তোলন করতে পারবেন।
  • দ্রুত নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা: মামলাটি অত্যন্ত প্রাচীন হওয়ায় বিচারিক আদালত উভয় পক্ষকে নোটিশ প্রদান করে জরুরি ভিত্তিতে এবং কোনো প্রকার অযৌক্তিক মুলতবি প্রদান ব্যতিরেকে আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে বিচার নিষ্পত্তি করবেন।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)

আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই গুরুত্বপূর্ণ রায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক তথ্যাদি নিম্নের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়বস্তু মামলার বিস্তারিত তথ্য
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman)
মামলা নম্বর ও শ্রেণি দেওয়ানী রিভিশন নং ২২৫৩ / ২০১২ (Civil Revision No. 2253 of 2012)
পক্ষগণের নাম মো: নুরুল হক এবং অন্যান্য (দরখাস্তকারী/বাদী) বনাম মো: শামসুদ্দিন মণ্ডল এবং অন্যান্য (প্রতিপক্ষ/বিবাদী)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব মো: সাইদুল আলম খান, অ্যাডভোকেট
প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব ষষ্ঠী সরকার, অ্যাডভোকেট
উৎস ও বিচারিক আদালত অতিরিক্ত জেলা জজ ১ম আদালত, কুষ্টিয়া (বিবিধ আপিল নং ৪৬/২০১০, রায়: ২০.০২.২০১২)
যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালত, কুষ্টিয়া (বাটোয়ারা মোকদ্দমা নং ৭২/১৯৯৪, বিবিধ মামলা নং ০৪/২০০৯)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি: ১৭ ও ১৮ জুন ২০২৬
চূড়ান্ত রায়: ১৮ জুন ২০২৬ (৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)
মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও নজির Code of Civil Procedure, 1908 (Order IX Rule 8 & 9, Order XVII Rules 1 & 3, Section 115(1))
নজির: Harmuj Sikder Vs. Ayub Ali Sikder, 28 BLD (HCD) 457
অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক 📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড
🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button