ওয়ারিশি বিরোধে বিবাদীর জবানবন্দিতে স্বীকৃতি ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রাসঙ্গিকতা: সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, দেওয়ানী স্বত্ব মামলায় ওয়ারিশি স্বত্ব বা পিতৃত্ব (Genealogy and Paternity) নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী বিবাদীর নিজস্ব কাঠগড়ায় প্রদত্ত স্পষ্ট স্বীকারোক্তি (Categorical Judicial Admission) সাক্ষ্য আইনের দৃষ্টিতে সর্বোৎকৃষ্ট মৌলিক প্রমাণ (Substantive Best Evidence)। মোকদ্দমায় প্রধান প্রতিপক্ষ ১ নং বিবাদী (সৎ ভাই) জেরা চলাকালে যখন অকপটে স্বীকার করেন যে—”নাসির আমার আপন ভাই”, তখন সেই অখণ্ডনীয় স্বীকারোক্তি এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রমাণিত ওয়ারিশ ও মৃত্যু সনদ উপেক্ষা করে নিছক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ওয়ারিশি বাতিল করা আপিল আদালতের মারাত্মক আইনগত ভুল ও সাক্ষ্যের অপ্রয়োগ (Misreading and Non-reading of evidence)। উচ্চ আদালত আরও পর্যবেক্ষণ প্রদান করেছেন যে, পারিবারিক সম্পর্কে আদালতের মনে কোনো সন্দেহ থাকলে অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষার (DNA Test) নির্দেশ দেওয়া উচিত ছিল। চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্ট জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের খারিজ রায় বাতিল করে সহকারী জজ আদালতের স্বত্বের ডিক্রি পুনর্বহাল করেছেন।

১. মামলার সূচনা ও বংশলতিকার বিরোধ (Background & Genealogy Dispute)

আলোচ্য মামলার সূচনা জামালপুর জেলার ইসলামপুর সহকারী জজ আদালতে ২০০৬ সালে দায়েরকৃত ১৬০ নম্বর অপর শ্রেণি মোকদ্দমা (Other Class Suit No. 160 of 2006) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন নাসরিন বেগম এবং অন্যান্য ওয়ারিশগণ (বাদী-দরখাস্তকারীগণ) তাঁদের স্বামী/পিতা মরহুম নাসিরুদ্দিন সরকারের অংশের নালিশি ভূমিতে স্বত্ব ঘোষণার (Declaration of Title) প্রার্থনায়।

আরজির বর্ণনানুসারে, নালিশি জমিসহ অন্যান্য জোতের মূল সি.এস. রেকর্ডীয় প্রজা ছিলেন ইয়ার হোসেন সরকার। তাঁর মৃত্যুর পর চার পুত্র—মোফাজ্জল হক সরকার ওরফে মফিজুল হক সরকার, তোফাজ্জল হক সরকার, ফজলুল হক সরকার এবং ওয়াসীউদ্দিন সরকার ওয়ারিশ সূত্রে সম্পত্তি লাভ করেন। মফিজুল হক সরকার মারা গেলে তাঁর অংশে তিন পুত্র—মতিয়ার রহমান, সিরাজুল ইসলাম ও লুৎফর রহমান এবং দুই কন্যা—আম্বিয়া ও মাজেদা স্বত্ববান হন। পরবর্তীতে এস.এ. রেকর্ড লুৎফর রহমান ও অন্যান্যদের নামে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়।

মূল বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু লুৎফর রহমানের পরবর্তী ওয়ারিশান নিয়ে। বাদিদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো—লুৎফর রহমানের দুই স্ত্রী ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে মুকুল সরকার ও নাসিরুদ্দিন সরকারের জন্ম হয়। পরবর্তীতে লুৎফর রহমান দ্বিতীয় বিবাহ করেন গোল্লা বেওয়াকে এবং সেই গর্ভে কামাল সরকার ও রানী সরকারের জন্ম হয়। লুৎফর রহমানের মৃত্যুর পর চার পুত্র ও এক কন্যা পারিবারিকভাবে আপস-বণ্টনসূত্রে নিজ নিজ অংশে দখলে থাকেন। নাসিরুদ্দিন সরকারের মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী ও কন্যারা যখন বিগত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখে স্থানীয় তহশিল অফিসে খাজনা পরিশোধ ও নামজারির জন্য যান, তখন তহশিলদার জানান যে বি.আর.এস. খতিয়ানে নাসিরুদ্দিনের নাম বাদ দিয়ে কেবল সৎ ভাইদের নামে রেকর্ড হয়েছে! বিবাদীগণ নাসিরুদ্দিনকে লুৎফর রহমানের সন্তান হিসেবেই অস্বীকার করায় বাদিগণ স্বত্বের মোকদ্দমা দায়ের করতে বাধ্য হন।

২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)

বিচারিক আদালতে উভয় পক্ষ স্ব-স্ব দাবির পক্ষে বিস্তারিত লিখিত জবাব ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন।

🏛️ বাদীপক্ষের বক্তব্য ও আইনি দাবি

  • লুৎফর রহমানের বৈধ পুত্র: নাসিরুদ্দিন সরকার ছিলেন লুৎফর রহমানের প্রথম স্ত্রীর বৈধ সন্তান; মুকুল সরকার তাঁর সহোদর ভাই।
  • পারিবারিক আপসে দখল: পিতার মৃত্যুর পর নাসিরুদ্দিন অন্যান্য ভাইদের সাথে বসতবাড়ি ও চাষের জমিতে আপসে নিরবচ্ছিন্ন ভোগদখলে ছিলেন।
  • ইউপি সনদ (Exhibits 10 & 11): স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক ইস্যুকৃত ওয়ারিশ ও মৃত্যু সনদে নাসিরুদ্দিনের পিতৃত্ব সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।
  • চেয়ারম্যানের অকাট্য সাক্ষ্য: পিডব্লিউ-৬ (চেয়ারম্যান) আদালতে শপথ নিয়ে স্পষ্ট সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি জানেন নাসিরের পিতা লুৎফর রহমান।
  • বি.আর.এস. রেকর্ডের ভুল: জরিপ বিভাগের ভুলে বা সৎ ভাইদের কারসাজিতে বি.আর.এস. খতিয়ানে নাম বাদ পড়লেও জন্মগত ওয়ারিশি স্বত্ব নষ্ট হতে পারে না।

🛡️ বিবাদীপক্ষের জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি

  • পিতৃত্ব ও ওয়ারিশি অস্বীকার: লুৎফর রহমানের কোনো নাসিরুদ্দিন নামের পুত্র ছিল না; তিনি কেবল মুকুল, কামাল, রানী ও স্ত্রী গোল্লা বেওয়াকে রেখে মারা যান।
  • কোনো খতিয়ানে নাম নেই: সি.এস., এস.এ. বা বি.আর.এস. কোনো রেকর্ডেই নাসিরুদ্দিনের নাম কোনোদিন লিপিবদ্ধ হয়নি।
  • সঠিক বি.আর.এস. জরিপ: সরকারি জরিপ বিভাগ সরেজমিন দখল ও সঠিক ওয়ারিশানের ভিত্তিতে বিবাদীদের নামে নির্ভুল খতিয়ান প্রস্তুত করেছে।
  • ইউপি সনদের ত্রুটি: ইউপি চেয়ারম্যানের সনদে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বারের স্বাক্ষর নেই এবং চেয়ারম্যান জেরায় মৃত্যুর তারিখ বা কবর নিশ্চিত করতে পারেননি।
  • স্বত্ব ও দখলের অভাব: বাদিপক্ষ নালিশি জমিতে কখনোই কোনো বসতবাড়ি তৈরি করেনি বা দখল ভোগ করেনি; তারা অনধিকার প্রবেশকারী।

৩. বিচারিক ও আপিল আদালতের বিচারিক পর্যালোচনা (Subordinate Courts’ Findings)

ইসলামপুর সহকারী জজ আদালতে উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণকালে চাঞ্চল্যকর তথ্যাদি উদঘাটিত হয়। বাদিপক্ষ তাঁদের দাবির সমর্থনে ইউপি চেয়ারম্যানকে (পিডব্লিউ-৬) কাঠগড়ায় হাজির করেন, যিনি প্রদর্শন-১০ (ওয়ারিশ সনদ) ও প্রদর্শন-১১ (মৃত্যু সনদ) প্রমাণ করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘটে বিবাদীপক্ষের সাক্ষ্যকালে—ডিডব্লিউ-১ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়ান মুকুল মিয়া (১ নং বিবাদী), যিনি লুৎফর রহমানের প্রথম স্ত্রীর সন্তান। তিনি জেরার মুখে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেন যে—“নাসির আমার আপন ভাই”!

বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত ডিডব্লিউ-১ এর এই অকাট্য স্বীকারোক্তি এবং ইউপি চেয়ারম্যানের সনদ পর্যালোচনা করে বিগত ২৭ জুন ২০১০ তারিখে বাদিদের পক্ষে নালিশি ভূমিতে স্বত্বের ডিক্রি প্রদান করেন।

উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে ২-৪ নম্বর বিবাদীগণ জামালপুরের জেলা জজ আদালতে অপর আপিল নং ৪১/২০১০ দায়ের করেন, যা নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে প্রেরিত হয়। বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা জজ বিগত ১৭ জুন ২০১৪ তারিখে আপিল মঞ্জুর করে সহকারী জজ আদালতের ডিক্রি বাতিল করে দেন। আপিল আদালত যুক্তি দেখান যে, ইউপি চেয়ারম্যান জেরায় বলেছেন তিনি নাসিরকে বড় হওয়ার পর দেখেননি, মৃত্যু রেজিস্ট্রার আনেননি বা কবরের অবস্থান জানেন না; সুতরাং চেয়ারম্যান স্বয়ং সন্দিহান। কিন্তু আপিল আদালত ডিডব্লিউ-১ মুকুল মিয়ার “নাসির আমার আপন ভাই” মর্মে প্রদত্ত স্পষ্ট স্বীকারোক্তিটি রায়ে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান এবং আরজি সংশোধনের মাধ্যমে জমির যে সুস্পষ্ট পরিচিতি দেওয়া হয়েছিল তা উপেক্ষা করে নালিশি জমি অনিশ্চিত দাবি করে মোকদ্দমা খারিজ করেন। সংক্ষুব্ধ বাদিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন নং ৪১২৫/২০১৪ দায়ের করেন।

৪. মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পর্যালোচিত আইনি প্রশ্নসমূহ (Core Legal Issues)

মহামান্য একক বেঞ্চে শুনানিকালে নিম্নলিখিত মৌলিক আইনি বিরোধসমূহ নিষ্পত্তির জন্য চিহ্নিত হয়:

  1. বিচারিক স্বীকারোক্তির আইনি প্রভাব (Judicial Admission): দেওয়ানী মোকদ্দমায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান বিবাদী যখন জবানবন্দিতে অন্য পক্ষকে তার সহোদর ভাই হিসেবে স্বীকার করেন, তখন সেই স্বীকারোক্তিকে উপেক্ষা করে আদালত বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে কি না?
  2. প্রথম আপিল আদালতের সীমাবদ্ধতা ও প্রমাণের অপব্যাখ্যা: সহকারী জজ আদালতের বস্তুনিষ্ঠ ও সাক্ষ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ খণ্ডন না করে কেবল একজন সাক্ষীর জেরার বিচ্ছিন্ন বাক্যের ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ স্বত্ব নস্যাৎ করা আপিল আদালতের জন্য আইনসংগত কি না?
  3. পিতৃত্ব নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষা ও বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান: বংশলতিকা বা জৈবিক সম্পর্ক (Biological relationship) নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে অনুমানভিত্তিক অনুসিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে ডিএনএ পরীক্ষার মতো বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির গুরুত্ব কতখানি?

৫. আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দের বক্তব্য ও সওয়াল-জওয়াব (Submissions & Arguments)

দরখাস্তকারী বাদিপক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জনাব মো: বদরুদ্দোজা (Mr. Md. Bodruddoza, Senior Advocate) এবং মিস লায়লা নাসরিন শুনানিতে অংশ নেন। অপরপক্ষে প্রতিপক্ষগণ ওকালতনামা দাখিল করা সত্ত্বেও চূড়ান্ত শুনানিতে কোনো আইনজীবী উপস্থিত হননি।

বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিবেদন করেন যে, অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত আরজির বাইরে গিয়ে এমন একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যা বিবাদীগণ লিখিত জবাবে কখনো দাবি করেননি। নালিশি জমির পরিচিতি নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না এবং বিচারিক আদালত বিগত ০১.০৪.২০০৮ তারিখে ২৭ নং আদেশে আরজি সংশোধনের অনুমতি দিয়েছিলেন, যা আপিল আদালত সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন।

বিজ্ঞ কৌঁসুলি জোর দিয়ে বলেন যে, বিবাদীপক্ষের প্রধান সাক্ষী ডিডব্লিউ-১ মুকুল মিয়া স্বয়ং লুৎফর রহমানের প্রথম স্ত্রীর সন্তান। তিনি জেরার মুখে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেছেন যে নাসিরুদ্দিন তাঁর সহোদর আপন ভাই। সাক্ষ্য আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, কোনো পক্ষের নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া স্বীকারোক্তিই হলো শ্রেষ্ঠ সাক্ষ্য। এই স্বীকারোক্তি কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাহার বা খণ্ডন করা হয়নি। তদুপরি পিডব্লিউ-৬ ইউপি চেয়ারম্যান জেরায় স্পষ্টভাবে বলেছেন—”আমি নাসিরের পিতা লুৎফর এটা জানি।” আপিল আদালত চেয়ারম্যানের এই ইতিবাচক বক্তব্য ও ডিডব্লিউ-১ এর স্বীকারোক্তি পাশ কাটিয়ে চরম ভুল করেছেন।

৬. সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনগত অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Precedents)

মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান মামলার নথিপত্র এবং উভয় আদালতের রায় গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন:

(এক) বিচারিক স্বীকারোক্তির অকাট্য সাক্ষ্যমূল্য:
নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ১ নং বিবাদী মুকুল মিয়া হলেন লুৎফর রহমানের ১ম স্ত্রীর পুত্র। তিনি জেরার মুখে সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে নাসিরুদ্দিন তাঁর আপন ভাই। বিবাদীপক্ষের এই প্রধান সাক্ষীর নিজের দেওয়া স্বীকারোক্তি সাক্ষ্য আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী বাদিপক্ষের দাবির পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী দালিলিক ভিত্তি। বিবাদীপক্ষ এই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি। আপিল আদালত এই মৌলিক স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চরম আইনগত ভুল (Error of law) করেছেন।

(দুই) জৈবিক সম্পর্ক নির্ধারণে অনুমান বনাম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (ডিএনএ টেস্ট):
আদালত সুদূরপ্রসারী পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন যে, পিতা-পুত্রের সম্পর্ক বা জৈবিক রক্তসম্পর্ক (Biological relationship) নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো আদালতের যদি সামান্যতম সংশয় থাকত, তবে আদালতের উচিত ছিল ডিএনএ টেস্ট (DNA Test) বা অন্য কোনো আইনসম্মত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া। কোনো উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক বা অকাট্য বিপরীত প্রমাণ ছাড়া নিছক অনুমানের ওপর ভর করে একটি বৈধ ওয়ারিশি অধিকারকে অস্বীকার করা দেওয়ানী বিচারনীতির পরিপন্থী।

(তিন) আপিল আদালতের বিপরীত সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতা:
সুপ্রতিষ্ঠিত আইনগত নীতি হলো, প্রথম আপিল আদালত তথ্যের চূড়ান্ত আদালত হলেও বিচারিক আদালতের রায় উল্টাতে হলে বিচারিক আদালতের প্রতিটি যুক্তি ও সাক্ষ্য স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করে খণ্ডন করতে হয়। বিচারিক আদালত যেখানে সাক্ষীদের আচরণ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে, সেখানে তাদের বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্তকে আইনসম্মত যুক্তি ছাড়া বাতিল করা নথির মারাত্মক অপব্যাখ্যা হিসেবে গণ্য হয়।

৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আদেশ (Final Decision & Order)

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনায় জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের রায় আইনবহির্ভূত মর্মে সাব্যস্ত করেন এবং নিম্নোক্ত আদেশ ঘোষণা করেন:

  • রুল অ্যাবসোলিউট: দেওয়ানী রিভিশন রুল নং ৪১২৫/২০১৪ কোনো প্রকার খরচা ছাড়াই পরম (Absolute without costs) ঘোষণা করা হলো।
  • আপিল আদালতের রায় বাতিল: জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত কর্তৃক অপর আপিল নং ৪১/২০১০-এ বিগত ১৭.০৬.২০১৪ তারিখে (ডিক্রি স্বাক্ষরিত ২৬.০৬.২০১৪) প্রদত্ত রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও রদ করা হলো।
  • সহকারী জজ আদালতের ডিক্রি পুনর্বহাল: ইসলামপুর সহকারী জজ আদালত, জামালপুর কর্তৃক অপর ক্লাস মোকদ্দমা নং ১৬০/২০০৬-এ বিগত ২৭.০৬.২০১০ তারিখে (ডিক্রি স্বাক্ষরিত ০৪.০৭.২০১০) প্রদত্ত স্বত্বের রায় ও ডিক্রি পূর্ণাঙ্গরূপে পুনর্বহাল (Restored) করা হলো। বাদিগণ নালিশি জমিতে নাসিরের অংশীদার হিসেবে বৈধ স্বত্ববান ঘোষিত হলেন।
  • স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার: হাইকোর্ট কর্তৃক ইতিপূর্বে জারিকৃত স্থিতাবস্থার আদেশ প্রত্যাহার ও সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো।
  • নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: বিচারিক আদালতের নথি রায়ের অনুলিপিসহ অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট অধস্তন আদালতে প্রেরণ করার আদেশ দেওয়া হলো।

৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)

আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই যুগান্তকারী রায়ের সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিম্নের টেবিলে সন্নিবেশিত হলো:

বিষয়বস্তু মামলার বিস্তারিত তথ্য
উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman)
মামলা নম্বর ও শ্রেণি দেওয়ানী রিভিশন নং ৪১২৫ / ২০১৪ (Civil Revision No. 4125 of 2014)
পক্ষগণের নাম নাসরিন বেগম এবং অন্যান্য (দরখাস্তকারী/বাদী) বনাম মো: কামাল সরকার এবং অন্যান্য (প্রতিপক্ষ/বিবাদী)
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব মো: বদরুদ্দোজা, জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট এবং মিস লায়লা নাসরিন, অ্যাডভোকেট
প্রতিপক্ষ পক্ষে: কেউ উপস্থিত হননি
উৎস ও বিচারিক আদালত অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, জামালপুর (অপর আপিল নং ৪১/২০১০, রায়: ১৭.০৬.২০১৪)
সহকারী জজ আদালত, ইসলামপুর, জামালপুর (অপর ক্লাস মোকদ্দমা নং ১৬০/২০০৬, ডিক্রি: ২৭.০৬.২০১০)
শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ শুনানি: ২২ ও ২৮ জুন ২০২৬
চূড়ান্ত রায়: ২৮ জুন ২০২৬ (১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)
মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও বিষয় Evidence Act, 1872 (Admission, Paternity & Biological Proof / DNA Test), Code of Civil Procedure (Section 115(1), Order VI Rule 17)
অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক 📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড
🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল

Related Articles

Back to top button