ব্যাংক ঋণের জামানতের চেকে পুরো ঋণের অংক বসিয়ে ১৩৮ ধারায় দণ্ড দেওয়া বেআইনি: হাইকোর্টের নজির
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়: ব্যাংকিং ঋণ বিতরণের প্রাক্কালে জামানত (Security) হিসেবে গৃহীত অগ্রিম খালি চেকে ঋণগ্রহীতার সম্মতি ছাড়া ব্যাংকের ইচ্ছামতো সুদসহ বকেয়া অংক ও তারিখ বসিয়ে এনআই অ্যাক্ট (The Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারায় ফৌজদারি সাজা প্রদান করা আইনসম্মত নয়। এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মূল ভিত্তি হলো ‘সুনির্দিষ্ট বিদ্যমান দেনা বা দায় পরিশোধের উদ্দেশ্যে চেক প্রদান’ (Discharge of existing debt or liability)। জামানতের চেক কোনো একক নির্দিষ্ট দেনা পরিশোধের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় না, বরং তা কেবল সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার অতিরিক্ত গ্যারান্টি। ব্যাংক ঋণ আদায়ের একমাত্র সঠিক ফোরাম অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, পিটিশনার আলহাজ্ব মো. নুরুল ইসলাম একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড থেকে একটি সিসি (হাইপোথিকেশন) ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস অনুযায়ী পিটিশনারের নিকট থেকে একটি স্বাক্ষরযুক্ত তারিখ ও অংকবিহীন খালি চেক (Blank Cheque) জামানত হিসেবে জমা নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা ও ব্যবসায়িক অচলাবস্থার কারণে ঋণ হিসাবটি খেলাপি হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অর্থ ঋণ আদালতে মামলা না করে দ্রুত ঋণগ্রহীতাকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে উক্ত জামানতের চেকে একতরফাভাবে সুদে-আসলে মোট ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বসিয়ে ব্যাংকে উপস্থাপন করে ডিজঅনার করায় এবং লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে ১৩৮ ধারায় নালিশি মামলা দায়ের করে। দায়রা জজ আদালত পিটিশনারকে ১ বছরের কারাদণ্ড ও চেকের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড প্রদান করেন।
👤 আসামির আইনি যুক্তি
আসামিপক্ষের বিজ্ঞ কৌঁসুলি সওয়াল করেন যে, ব্যাংক ঋণ মঞ্জুরিপত্রের শর্তে স্পষ্ট লেখা রয়েছে যে চেকটি জামানত বা সিকিউরিটি হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। জামানতের চেক কোনো বিদ্যমান নির্দিষ্ট ঋণ পরিশোধের জন্য জারি করা হয়নি। তদুপরি ব্যাংকের হিসাবের দাবি অডিট ছাড়া চূড়ান্ত নয়।
👥 ব্যাংকের যুক্তি
ব্যাংক দাবি করে যে, এনআই অ্যাক্টের ১১৮ ও ১৩৯ ধারা অনুযায়ী চেকে স্বাক্ষর থাকলে ধরে নিতে হবে তা দায় পরিশোধের জন্যই দেওয়া হয়েছে। গ্রাহক দায় অস্বীকার করতে পারেন না।
হাইকোর্ট বিভাগ পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, বিচারিক দায়রা আদালত ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নথি এবং সিকিউরিটি ডকুমেন্টস পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা না করে কেবলমাত্র চেকের স্বাক্ষর দেখে একতরফা সাজার আদেশ দিয়েছেন। জামানতের চেকের আইনি মর্যাদা ও ঋণচুক্তির সম্পর্কের বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
হাইকোর্ট বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের নজিরসমূহ 68 DLR (AD) 298 এবং 72 DLR (AD) 88 উদ্ধৃত করে রায় দেন যে, সিকিউরিটি চেক কোনো লেনদেন নিষ্পত্তির চেক নয়। ব্যাংকের উচিত অর্থ ঋণ আদালতে গিয়ে হিসাবের প্রমাণ সাপেক্ষে ডিক্রি আদায় করা। জামানতের চেক দিয়ে কোনো ব্যবসায়ীকে জেলে পাঠানো অর্থ ঋণ আদালত আইনের উদ্দেশ্য ও নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী।
চূড়ান্ত আদেশ: মহামান্য হাইকোর্ট ক্রিমিনাল রিভিশন মঞ্জুর করেন। দায়রা আদালত কর্তৃক প্রদত্ত সাজা ও অর্থদণ্ড বাতিল করে পিটিশনারকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অর্থ ঋণ আদালতে নিয়মিত মামলার মাধ্যমে আইনগত পাওনা আদায়ের স্বাধীনতা বহাল রাখা হয়।
- জামানতের চেকের ফৌজদারি দায়মুক্তি: ঋণচুক্তিতে যে চেক জামানত হিসেবে গৃহীত হয়েছে তা সরাসরি ১৩৮ ধারার অধীন অপরাধ গঠন করে না।
- অর্থ ঋণ আদালত আইনের অগ্রাধিকার: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সকল খেলাপি ঋণ আদায়ের বিশেষ আইন হলো অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩।
- ধারা ১৩৯-এর অনুমানের খণ্ডন: আসামিপক্ষ যদি প্রমাণ করতে পারে যে চেকটি ব্লাঙ্ক সিকিউরিটি ছিল, তবে ১৩৯ ধারার আইনি অনুমান খণ্ডিত হয়।
- ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন: ব্যাংকে কোনো চেক জামানত হিসেবে দিলে চেকের উপরে স্পষ্ট করে “Security Cheque Only” সিল বা লিখে দিন।
- রিসিট বা প্রাপ্তিস্বীকার সংরক্ষণ: চেকটি কোন ঋণের জামানত হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে তার লিখিত প্রমাণপত্র নিজের ফাইলে সংরক্ষণ করুন।
- নোটিশের জবাবে সিকিউরিটির দাবি তোলা: ব্যাংকের লিগ্যাল নোটিশ পাওয়া মাত্রই ১৫ দিনের মধ্যে উত্তর দিয়ে জানান যে এটি জামানতের চেক ছিল।
- ট্রায়াল কোর্টে মঞ্জুরিপত্র প্রদর্শন: নিম্ন আদালতে শুনানির সময় ব্যাংকের ঋণ মঞ্জুরিপত্র (Sanction Letter) সাক্ষ্য হিসেবে দাখিল করুন।
- আপিলের সময় জামানত জমার নিয়ম: সাজা হলে আপিল দায়েরের সময় ৫০% অর্থ জমাদানের বিষয়ে দ্রুত আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
