দেওয়ানি মামলা স্থানান্তর (Transfer of Suit) বিধি ও আইনজীবীর করণীয় | CPC 1908

খ. D এবং C যথাক্রমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী। C তার প্রতিনিধির মাধ্যমে ঢাকায় D এর নিকট থেকে কিছু পণ্য ক্রয়ের চুক্তি করেন। চুক্তি মোতাবেক D তা সরবরাহ করলেও C তার মূল্য পরিশোধ করেননি। D মূল্য আদায়ের জন্য ঢাকার উপযুক্ত আদালতে মামলা করেন। C মামলাটি চট্টগ্রামের উপযুক্ত আদালতে বদলী করতে চান। C এর বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে আপনার করণীয় কী? সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান উল্লেখে উত্তর দিন।

ভূমিকা ও আইনি ধারা:

দেওয়ানি কার্যবিধি (Code of Civil Procedure), ১৯০৮ এর ২২, ২৩ এবং ২৪ ধারা-তে দেওয়ানি মামলা এক আদালত থেকে অন্য আদালতে স্থানান্তরের সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। যখন কোনো মামলা একাধিক এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে দায়ের করা সম্ভব হয়, তখন বিবাদী চাইলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে উক্ত মামলা উপযুক্ত আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করতে পারেন।

ঘটনার আইনি বিশ্লেষণ ও এখতিয়ার (Jurisdiction):

দেওয়ানি কার্যবিধির ২০ ধারা অনুযায়ী, একটি চুক্তির মামলা দুই জায়গায় দায়ের করা যায়:

  • ১. যেখানে নালিশের কারণ (Cause of action) আংশিক বা সম্পূর্ণ উদ্ভব হয়েছে।
  • ২. যেখানে বিবাদী বসবাস করেন বা ব্যবসা পরিচালনা করেন।

প্রদত্ত সমস্যা অনুযায়ী, চুক্তির উদ্ভব ও পণ্য সরবরাহ ঢাকায় হওয়ায় ঢাকার আদালতের এখতিয়ার রয়েছে। অন্যদিকে, বিবাদী ‘C’ চট্টগ্রামে ব্যবসা করেন বা বসবাস করেন, তাই চট্টগ্রামের আদালতেরও এই মামলা বিচারের এখতিয়ার রয়েছে। অর্থাৎ, ঢাকা এবং চট্টগ্রাম উভয় আদালতেরই সমান্তরাল এখতিয়ার (Concurrent Jurisdiction) রয়েছে।

বিবাদী ‘C’-এর বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে আমার করণীয়:

যেহেতু বাদী ‘D’ মামলাটি ঢাকায় দায়ের করেছেন এবং আমার মক্কেল ‘C’ মামলাটি চট্টগ্রামে বদলি করতে চান, তাই দেওয়ানি কার্যবিধির ২২ ও ২৩(২) ধারার আলোকে আমাকে নিম্নোক্ত আইনি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:

  • ১. নোটিশ প্রদান (Prior Notice): দেওয়ানি কার্যবিধির ২২ ধারা অনুযায়ী, মামলা স্থানান্তরের আবেদন করার পূর্বে আমাকে অবশ্যই অপরপক্ষকে (বাদী ‘D’-কে) লিখিত নোটিশ প্রদান করতে হবে।
  • ২. আবেদনের সঠিক সময় (Earliest Opportunity): আদালতে বিচার্য বিষয় নির্ধারণের (Settlement of Issues) পূর্বে অথবা সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাকে স্থানান্তরের আবেদনটি দাখিল করতে হবে।
  • ৩. উপযুক্ত আদালতে আবেদন (Application to Proper Court): দেওয়ানি কার্যবিধির ২৩(২) ধারা অনুযায়ী, যদি একাধিক এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত ভিন্ন ভিন্ন আপিল আদালত (অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন জেলা জজ)-এর অধীন হয়, কিন্তু একই হাইকোর্ট বিভাগের অধীন হয়, তবে মামলা স্থানান্তরের আবেদনটি হাইকোর্ট বিভাগে (High Court Division) করতে হবে। যেহেতু ঢাকা এবং চট্টগ্রামের দেওয়ানি আদালতগুলো দুটি আলাদা জেলার জেলা জজের অধীন, তাই আমাকে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ২৪ ধারার সাধারণ ক্ষমতার সাথে মিলিয়ে ২২ ও ২৩(২) ধারার অধীনে একটি স্থানান্তরের মিস মামলা (Transfer Misc. Case) দায়ের করতে হবে।
  • ৪. যুক্তির ভিত্তি (Grounds of Transfer): শুনানিতে আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে, মামলাটি চট্টগ্রামে পরিচালিত হলে বিবাদীর আত্মপক্ষ সমর্থনে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে অধিকতর সুবিধা হবে এবং এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):

  • ১. “Forum Conveniens” (সুবিধাজনক ফোরাম): এর আইনি অর্থ হলো এমন একটি উপযুক্ত এবং সুবিধাজনক আদালত, যেখানে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম সব পক্ষের জন্য সবচেয়ে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে। আদালত মামলা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে পক্ষগণের “সুবিধার ভারসাম্য” (Balance of convenience) বিবেচনা করে থাকেন।
  • ২. “Audi Alteram Partem” (অপর পক্ষকেও শোনো): ২২ ধারার বিধানে অপরপক্ষকে নোটিশ দেওয়ার যে পূর্বশর্ত রয়েছে, তা মূলত প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের এই নীতিরই বাস্তব প্রয়োগ।

উদাহরণ (Example):

ধরা যাক, ‘C’-এর পক্ষে ঢাকায় এসে মামলার নিয়মিত হাজিরা দেওয়া আর্থিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তার ব্যবসার জন্য চরম ক্ষতিকর। তাছাড়া, পণ্য কেনা সংক্রান্ত চুক্তিটি প্রতিনিধির মাধ্যমে হলেও, ডেলিভারি চালান গ্রহণ করা বা চুক্তির মূল সাক্ষী ও দলিলাদি সব চট্টগ্রামে রয়েছে। এই বিষয়গুলো হাইকোর্ট বিভাগে তুলে ধরা হলে, আদালত “সুবিধার ভারসাম্য” (Balance of Convenience) বিবাদী ‘C’-এর অনুকূলে রয়েছে মর্মে সন্তুষ্ট হতে পারেন। তখন হাইকোর্ট বিভাগ ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে নথিপত্র তলব করে মামলাটি বিচারের জন্য চট্টগ্রামের উপযুক্ত আদালতে বদলির আদেশ দিবেন।

উপসংহার (Conclusion):

পরিশেষে বলা যায়, সমান্তরাল এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের ক্ষেত্রে মামলা কোথায় দায়ের হবে তা প্রাথমিকভাবে বাদীর পছন্দের ওপর নির্ভর করলেও, বিবাদীরও যুক্তিসঙ্গত কারণে তা স্থানান্তরের আইনি অধিকার রয়েছে। ‘C’-এর আইনজীবী হিসেবে আমার মূল আইনি দায়িত্ব হলো— সঠিক সময়ে বাদীকে নোটিশ দিয়ে সরাসরি হাইকোর্ট বিভাগে স্থানান্তরের আবেদন করা এবং যুক্তিতর্কের মাধ্যমে আদালতকে বোঝানো যে, মামলাটি চট্টগ্রামে বদলি করা হলেই সার্বিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

Related Articles

Back to top button