দেওয়ানি কার্যবিধির ১৭ আদেশের ১ বিধি: মামলা মূলতবী ও দ্রুত নিষ্পত্তি

প্রশ্ন: ২০০৩ সালের ৪০ নং আইনের দ্বারা The Code of Civil Procedure, 1908 Order XVII rule 1 এ মামলা মূলতবী সংক্রান্ত যে বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে তা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে? বিস্তারিত উত্তর দিন।
ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক ধারা: দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা বা মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ২০০৩ সালের ৪০ নং আইন দ্বারা দেওয়ানি কার্যবিধি (Code of Civil Procedure), ১৯০৮-এর ১৭ আদেশের ১ বিধিতে (Order XVII, Rule 1) মামলা মূলতবী বা সময় প্রার্থনা (Adjournment) সংক্রান্ত বিধানে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বে যখন-তখন সময় নেওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, তা রোধ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই ছিল এই সংশোধনীর মূল লক্ষ্য।
২০০৩ সালের সংশোধনীতে প্রবর্তিত মূল বিধানসমূহ:
১৭ আদেশের ১ বিধিতে মূলত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে:
- শুনানির পর্যায়ক্রম (Day-to-day hearing): বিচার্য বিষয় নির্ধারণের পর মামলার শুনানি প্রতিদিন (Day-to-day) ধারাবাহিকভাবে চলবে।
- মূলতবীর কারণ: আদালত কোনো পক্ষকে সময় বা মূলতবী মঞ্জুর করবেন না, যদি না আদালত সন্তুষ্ট হন যে, পরিস্থিতি উক্ত পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে (Beyond control) ছিল।
- মূলতবীর সর্বোচ্চ সীমা: মামলার চূড়ান্ত শুনানির (Peremptory Hearing) পর্যায়ে আদালত কোনো পক্ষকে ৬ (ছয়) বারের বেশি মূলতবী বা সময় মঞ্জুর করবেন না।
- খরচ বা ক্ষতিপূরণ (Adjournment Cost): কোনো পক্ষ মূলতবীর আবেদন করলে আদালত উক্ত পক্ষকে কমপক্ষে ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ (Cost) প্রদানের আদেশ দেবেন।
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে উক্ত বিধানের ভূমিকা:
২০০৩ সালের এই সংশোধনী দেওয়ানি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে নিম্নলিখিতভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে:
- ইচ্ছাকৃত কালক্ষেপণ রোধ: আগে বিবাদী বা দুর্বল পক্ষ মামলা প্রলম্বিত করার জন্য তুচ্ছ কারণে বারবার সময় নিতো। ৬ বারের নির্দিষ্ট সীমা থাকায় এখন আর অনন্তকাল ধরে মামলা ঝুলিয়ে রাখা বা “তারিখের পর তারিখ” নেওয়া সম্ভব নয়।
- আর্থিক জবাবদিহিতা: সময় নেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক জরিমানার (Cost) বিধান থাকায় পক্ষগণ অহেতুক সময় নেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকছে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
- আদালতের সময়ের সদ্ব্যবহার: Day-to-day শুনানির বাধ্যবাধকতা থাকায় বিচারকগণ দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত করে রায়ের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছেন এবং মামলার জট (Case backlog) হ্রাস পাচ্ছে।
লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):
- “Interest reipublicae ut sit finis litium”: এর অর্থ হলো— ‘মামলা-মোকদ্দমার একটি শেষ থাকা রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থেই প্রয়োজন।’ মূলতবীর লাগাম টেনে ধরে এই নীতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
- “Justice delayed is justice denied”: বিচার পেতে দেরি হওয়া মানে বিচার না পাওয়ারই নামান্তর। অহেতুক মূলতবী রোধ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই চিরন্তন নীতিরই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
উদাহরণ (Example):
ধরা যাক, ‘ক’ এবং ‘খ’ এর মধ্যে একটি জমি বন্টন মোকদ্দমা চলছে। বিচার্য বিষয় নির্ধারণের পর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হলো। বিবাদী ‘খ’ ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা দীর্ঘায়িত করার জন্য তার সাক্ষীদের হাজির না করে বারবার সময় প্রার্থনা করছে। ২০০৩ সালের পূর্বের আইন হলে ‘খ’ অনির্দিষ্টকাল সময় নিতে পারতো। কিন্তু বর্তমান ১৭ আদেশের ১ বিধি অনুযায়ী, আদালত ‘খ’ কে ৬ বারের বেশি সময় দেবেন না এবং প্রতিবার সময় নেওয়ার জন্য ২০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ (Cost) আরোপ করবেন। ফলে ‘খ’ বাধ্য হয়েই দ্রুত সাক্ষ্য উপস্থাপন করবে এবং মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।
উপসংহার (Conclusion):
পরিশেষে বলা যায়, দেওয়ানি মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকার পেছনে ‘অযথা মূলতবী’ একটি বড় কারণ ছিল। ২০০৩ সালের ৪০ নং আইন দ্বারা ১৭ আদেশের ১ বিধিতে যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, তা দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি লাঘব করে দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

