আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বলতে কি বুঝায়?
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: দেওয়ানী কার্যবিধি
প্রশ্ন: দেওয়ানী আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Inherent Powers of Court) বলতে কি বুঝায়? দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারার পরিধি, উদ্দেশ্য এবং এই ক্ষমতা প্রয়োগের আইনি সীমাবদ্ধতাসমূহ বিশদভাবে আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সংবিধিবদ্ধ ধারণা
কোনো বিধিবদ্ধ আইনই মানুষের জীবনের সমস্ত জটিলতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট আগে থেকে নিখুঁতভাবে অনুমান করে শতভাগ বিধান তৈরি করতে পারে না। আইনের এই অনিবার্য শূন্যতা বা সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং ন্যায়বিচার অক্ষুণ্ণ রাখতে আদালতকে সহজাত বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে।
দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ (CPC)-এর ধারা ১৫১-তে আদালতের এই অসাধারণ অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে সংরক্ষণ (Saved) করা হয়েছে। লক্ষণীয় যে, ১৫১ ধারা আদালতকে নতুন কোনো ক্ষমতা প্রদান করেনি, বরং আদালত হিসেবে বিদ্যমান সহজাত ক্ষমতাকেই স্বীকৃতি ও অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
১৫১ ধারায় বলা হয়েছে:
“এই বিধির কোনো কিছুই ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণার্থে কিংবা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধকল্পে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদানে আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে সীমিত বা কোনো প্রকারে প্রভাবিত করিবে না।”
২. অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য
১৫১ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানী আদালত কেবল দুটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন:
- ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে (For the Ends of Justice): বিচারিক প্রক্রিয়ায় যদি এমন কোনো পরিস্থিতি দেখা দেয় যার কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান কার্যবিধিতে নেই, অথচ সুবিচার নিশ্চিত করতে একটি আদেশ দেওয়া অপরিহার্য, তখন আদালত ১৫১ ধারা মতে ব্যবস্থা নিবেন।
- আদালতের কার্যধারার অপব্যবহার রোধকল্পে (To Prevent Abuse of the Process of Court): কোনো পক্ষ যদি প্রতারণা বা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে আদালতের সময় নষ্ট করে বা অন্য পক্ষকে অযথা হয়রানি করার চেষ্টা করে, তবে আদালত তা প্রতিহত করতে এই ক্ষমতার প্রয়োগ করেন।
৩. ১৫১ ধারা প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহ
ব্যবহারিক আদালতে ১৫১ ধারার ব্যাপক প্রয়োগ দেখা যায়:
- আদালতের ভুল সংশোধন: আদালতের নিজস্ব কোনো কেরানি বা টাইপিং ভুলের কারণে কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ল্যাটিন ম্যাক্সিম “Actus curiae neminem gravabit” (আদালতের ভুলে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না) অনুযায়ী ১৫১ ধারায় তা সংশোধন করা।
- একাধিক মোকদ্দমার একত্রীকরণ (Consolidation of Suits): একই পক্ষ ও একই বিষয়বস্তু নিয়ে একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকলে অপচয় ও বিরোধ এড়াতে একত্রিকরণের আদেশ প্রদান।
- অন্যায়ভাবে খারিজ হওয়া মামলা পুনরুজ্জীবিতকরণ: কার্যবিধির ৯ আদেশের আওতায় না পড়া কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে খারিজ হওয়া দরখাস্ত বা মামলা পুনরুজ্জীবিত করা।
- প্রতারণামূলক আদেশ প্রত্যাহার: আদালতের সাথে প্রতারণা (Fraud upon Court) করে কোনো আদেশ বা ডিক্রি হাসিল করা হলে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ১৫১ ধারায় তা বাতিল করতে পারেন।
৪. অন্তর্নিহিত ক্ষমতার আইনি সীমাবদ্ধতা (Limitations)
আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কোনো সীমাহীন বা স্বৈরাচারী ক্ষমতা নয়। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এর কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- সুনির্দিষ্ট বিধানের বিকল্প নয়: দেওয়ানী কার্যবিধিতে যে বিষয়ে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বিধান (Express provision) রয়েছে, সে বিষয়ে ১৫১ ধারা খাটিয়ে ভিন্ন কোনো আদেশ দেওয়া যাবে না। যেমন: আদেশ ৩৯-এর শর্ত পূরণ না করে ১৫১ ধারা খাটিয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায় না।
- আইনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে নয়: আইনের কোনো সুস্পষ্ট নিষেধ বা তামাদির আইনকে পাশ কাটাতে ১৫১ ধারা প্রয়োগ করা যায় না।
- আপিলযোগ্য আদেশের বিরুদ্ধে নয়: যে আদেশের বিরুদ্ধে আইনত আপিলের বিধান রয়েছে, সেখানে ১৫১ ধারায় প্রতিকার চাওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।
৫. উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ
- মনোহর লাল বনাম শেঠ হীরালাল (AIR 1962 SC 527): ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করা হয় যে, ১৫১ ধারা আদালতকে নতুন কোনো ক্ষমতা দেয় না, বরং ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতের সহজাত ক্ষমতাকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
- আব্দুল খালেক বনাম বাংলাদেশ (45 DLR 112): কার্যবিধিতে স্পষ্ট বিধান না থাকলে আদালত সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৫১ ধারার আশ্রয় নিতে সম্পূর্ণ এখতিয়ারবান।
- কাউসার আলী বনাম রাষ্ট্র (33 DLR 245): আদালতের সাথে জালিয়াতি করে ডিক্রি হাসিল করা হলে ১৫১ ধারায় তা সরাসরি বাতিলযোগ্য।
৬. উপসংহার
দেওয়ানী আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিচার প্রশাসনের শেষ রক্ষাকবচ। বিধিবদ্ধ আইনের অসম্পূর্ণতা যেন কখনো অবিচারের কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতেই ১৫১ ধারার মহৎ উপস্থিতি। তবে আদালতকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যাতে এটি বিদ্যমান আইনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
৪.১. দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতার সীমারেখা ও সুপ্রিম কোর্টের অনুশাসন
দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তা কোনো লাগামহীন এখতিয়ার নয়:
- Ex debito justitiae: প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার (Abuse of the process of the court) রোধ করার জন্যই কেবল ১৫১ ধারা ব্যবহৃত হবে;
- সুনির্দিষ্ট বিধানের বিকল্প নয়: যেখানে দেওয়ানি কার্যবিধিতে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিকারের বিধান রয়েছে (যেমন- নিষেধাজ্ঞা বা আরজি খারিজ), সেখানে ১৫১ ধারা প্রয়োগ সম্পূর্ণ বেআইনি;
- সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল মজিদ বনাম সুফিয়া খাতুন, 44 DLR 210) নজিরে সিদ্ধান্ত দেন যে, আদালতের ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিককে ১৫১ ধারার সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে সমমর্যাদার প্রত্যর্পণ (Inherent Restitution) মঞ্জুর করতে হবে।
আইনি সিদ্ধান্ত: পরিশেষে, বিধিবদ্ধ আইনের অসম্পূর্ণতা দূর করে অবিচার প্রতিরোধে ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা দেওয়ানি আদালতের শেষ পরম আশ্রয়স্থল।
৪.২. ইনহেরেন্ট পাওয়ার প্রয়োগে আপিল বা রিভিশন প্রতিকার
দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় প্রদত্ত কোনো আদেশ কোনো ডিক্রি নয় এবং ৪৩ আদেশে আপিলযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়। অতএব ১৫১ ধারায় প্রদত্ত যেকোনো অন্যায্য আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত বা মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫ ধারায় সরাসরি রিভিশন দায়ের করার অধিকারী।
৪.৩. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও পরীক্ষার্থীর জন্য দিকনির্দেশনা
সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল মজিদ বনাম সুফিয়া খাতুন, 44 DLR 210) নজিরে স্পষ্ট করেছেন যে, আদালতের নিজস্ব ভুলের জন্য কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করাই ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতার মূল আইনশাস্ত্রীয় দর্শন। পরীক্ষায় এই নীতির গভীরতা তুলে ধরতে হবে।
আদালতের নজির: (মকবুল আহমেদ বনাম আব্দুল বারী, 38 DLR 124) অনুযায়ী ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বিধিবদ্ধ আইনের অসম্পূর্ণতা নিরাময়ে আদালতের পরম সংবিধিবদ্ধ শক্তি।

