[পরিপত্র] আংশিক খাস ও ব্যক্তি-মালিকানাধীন ভূমির সীমানা নির্ধারণপূর্বক নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় পরিপত্র, ২০২৬: সহকারী কমিশনারদের প্রতি ৫ দফা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা
📌 পরিপত্রের মূল নির্যাস ও নাগরিক সুবিধা:
পূর্বে কোনো একটি দাগের জমি আংশিক খাস বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট (যেমন: অর্পিত বা পরিত্যক্ত বা খাস) হলে উপজেলা ভূমি অফিসগুলো সমগ্র দাগের জন্য ব্যক্তি-মালিকানাধীন অংশের নামজারি আবেদন সরাসরি নামঞ্জুর করত অথবা ভূমি উন্নয়ন কর আদায় বন্ধ রাখত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই যুগান্তকারী পরিপত্রের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তি-মালিকের বৈধ নামজারি ও কর আদায় বন্ধ রাখা যাবে না। সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিনে কানুনগো ও সার্ভেয়ার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ ও যৌথ স্বাক্ষরিত খণ্ড নকশা প্রস্তুত করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি মঞ্জুর করবেন এবং ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করবেন। এর জন্য আলাদা কোনো বিবিধ কেস (Mis Case) খুলতে হবে না।
১. পরিপত্র জারির প্রেক্ষাপট ও পূর্ববর্তী প্রশাসনিক জটিলতা
বাংলাদেশের মাঠ পর্যায়ের ভূমি প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা বিদ্যমান ছিল। কোনো একটি মৌজার নির্দিষ্ট দাগের মোট জমির কিছু অংশ যদি সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত, অর্পিত সম্পত্তি বা অন্য কোনো সরকারি স্বার্থযুক্ত হতো এবং অবশিষ্ট অংশ বৈধ ব্যক্তিমালিকানাধীন হতো, তবে উপজেলা ভূমি অফিসগুলো ঢালাওভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি নামঞ্জুর করত। ভূমি সহকারীরা “উক্ত দাগে সরকারি স্বার্থ বা খাস জমি রয়েছে” মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করতেন এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাগরিকের বৈধ স্বত্বের নামজারি আবেদন খারিজ করে দিতেন।
একইভাবে ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলো উক্ত ব্যক্তি-মালিকের নিকট থেকে বার্ষিক ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) গ্রহণ করত না। ফলে লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক বৈধ দলিল ও ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিক হওয়া সত্ত্বেও জমি নামজারি করতে পারতেন না, জমি বিক্রয় বা ব্যাংকে বন্ধক দিতে পারতেন না এবং চরম ভূমি হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তেন। ভূমি মন্ত্রণালয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই ঐতিহাসিক পরিপত্র জারি করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ৫ দফা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে।
২. ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৫ দফা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও আইনি বিশ্লেষণ
পরিপত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি), কানুনগো, সার্ভেয়ার এবং ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের প্রতি নিম্নবর্ণিত কার্যপদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
(ক) সরেজমিনে পৃথকীকরণ ও রেকর্ড পর্যালোচনা:
এক বা একাধিক দাগে খাস বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমি এবং ব্যক্তি-মালিকানাধীন ভূমি একত্রে থাকলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তা পৃথকভাবে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করবেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবেক ও হাল রেকর্ড, দাগসূচি, মৌজা ম্যাপ, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং বিবেচ্য দাগ সংশ্লিষ্ট মালিকগণের দলিলাদি পর্যালোচনায় খাস বা সরকারি ভূমি পৃথক করবেন। উক্তরূপ পৃথকীকরণ অবশ্যই সরেজমিন ও বাস্তবভিত্তিক হতে হবে।
(খ) যৌথ তদন্ত, খণ্ড নকশা ও নামজারি অনুমোদন:
সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট আবেদন দাখিলের পর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদন দেবেন। তদন্তের আলোকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁর কানুনগো/সার্ভেয়ার দ্বারা সরেজমিনে স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগণের উপস্থিতিতে তদন্তপূর্বক সরকারি ভূমি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি আলাদাভাবে চিহ্নিত করে যৌথ স্বাক্ষরিত ‘খণ্ড নকশা’ প্রস্তুত করবেন। প্রয়োজনে শুনানি গ্রহণ, সাবেক ও হাল রেকর্ড, দাগসূচি, মৌজা ম্যাপ ও দলিলাদি পর্যালোচনায় ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমির নামজারি আবেদন অনুমোদন করবেন এবং ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করবেন।
(গ) পৃথক বিবিধ কেস (Mis Case) সৃজনের বাধ্যবাধকতা বিলোপ:
যেসকল ক্ষেত্রে নামজারির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমির পৃথকীকরণ করা হবে, সেক্ষেত্রে পৃথক বিবিধ কেস (Mis Case) নথি সৃজনের কোনো প্রয়োজন হবে না। উক্তরূপ কার্য্যাদি মূল নামজারি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই পরিগণিত ও নিষ্পত্তি হবে। তবে নামজারি ব্যতীত অন্য সরকারি প্রয়োজনে বা ভূমি মালিকের স্বতন্ত্র আবেদনের প্রেক্ষিতে পৃথকীকরণের প্রয়োজন হলে আলাদা বিবিধ কেস নথি সৃজন করা যাবে।
(ঘ) সৃজিত খতিয়ানের মন্তব্য কলামে স্পষ্টীকরণ ও সরকারি স্বত্ব সুরক্ষা:
ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমির জন্য সম্পাদিত নামজারি কেবল তফসিলে বর্ণিত ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের জন্য কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্ট দাগ ও খতিয়ানের অবশিষ্ট খাস বা সরকারি ভূমির উপর আবেদনকারী বা খতিয়ানের মালিকগণের কোনো স্বত্ব, মালিকানা বা দখল প্রতিষ্ঠিত হবে না। এছাড়া সৃজিত খতিয়ানের মন্তব্য কলামে সংশ্লিষ্ট দাগের মধ্যে সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশের তথ্য স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে।
(ঙ) আদালতে বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে সতর্কতা:
সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমির বিষয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকলে অথবা আদালতের কোনো রায় বা নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান থাকলে তা সতর্কতার সাথে পর্যালোচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আদালতের আদেশের মাধ্যমে কোনো স্বত্ব নির্ধারিত হলে প্রচলিত আইন অনুসরণে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন (Digital Land Service System)-এ সফটওয়্যার আপডেট
পরিপত্রের ৩ নম্বর দফায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক (ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন অনলাইন ভূমিসেবা সফটওয়্যার ও ই-নামজারি সিস্টেমে বর্ণিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ফিচার ও মডিউল দ্রুত সংযোজন করা হয়। ফলে এখন নাগরিকগণ অনলাইনে ই-নামজারি আবেদনের সময় দাগে আংশিক সরকারি স্বার্থ থাকলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের বিবরণ দিয়ে অনলাইনে আবেদন ও খণ্ড নকশা ট্র্যাকিং করতে পারবেন।
৪. সাধারণ নাগরিক ও জমির মালিকদের জন্য করণীয় চেকলিস্ট
| ধাপ | কার্যপদ্ধতি ও করণীয় | প্রয়োজনীয় কাগজপত্র |
|---|---|---|
| ১. অনলাইন আবেদন | mutation.land.gov.bd পোর্টালে গিয়ে দাগের মোট জমির মধ্যে নিজের ক্রয়কৃত বা পৈতৃক অংশের সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি ও হিস্যা উল্লেখ করে আবেদন করুন। | মূল দলিল, ভায়া দলিল, পূর্বতন খতিয়ান, ওয়ারিশ কায়েম সনদ ও এনআইডি কপি। |
| ২. সরেজমিন সীমানা নির্ধারণ | সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস থেকে সার্ভেয়ার বা কানুনগো সরেজমিনে গেলে উপস্থিত থেকে নিজের দখল ও সীমানা প্রদর্শন করুন। | জমির বাস্তব দখল প্রমাণ, বাউন্ডারি ওয়াল বা সীমানা চিহ্ন। |
| ৩. যৌথ খণ্ড নকশা স্বাক্ষর | সার্ভেয়ার কর্তৃক প্রস্তুতকৃত খণ্ড নকশায় নিজের ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশ পৃথকভাবে চিহ্নিত আছে কি না তা দেখে যৌথ স্বাক্ষরে অংশ নিন। | সার্ভেয়ার প্রতিবেদন ও খণ্ড নকশা কপি। |
| ৪. নামজারি খতিয়ান ও কর প্রদান | নামজারি অনুমোদনের পর অনলাইনে ১,১০০ টাকা রেকর্ড সংশোধন ও ডিসিআর ফি পরিশোধ করে খতিয়ান ডাউনলোড করুন এবং ldtax.gov.bd-তে গিয়ে নিজ অংশের কর পরিশোধ করুন। | ই-নামজারি ডিসিআর ও অনলাইন দাখিলা রশিদ। |
📥 অফিশিয়াল সরকারি পরিপত্রের মূল কপি ও PDF ডাউনলোড
ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত মূল অফিস আদেশ ও পরিপত্রের স্বাক্ষরিত স্ক্যান কপি (স্মারক নং ৩১.০০.০০০০.০৪৪.০৪৪.৬৮.০০০৩.২১.৯০) নিচে সরাসরি সংযুক্ত করা হলো। নাগরিক, আইনজীবী ও গবেষকগণ সরাসরি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে পারেন:
স্মারক নং: ৩১.০০.০০০০.০৪৪.০৪৪.৬৮.০০০৩.২১.৯০ | তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আকার: ১.২৩ মেগাবাইট | উৎস: ভূমি মন্ত্রণালয়
📄 এই পেজেই সরাসরি পরিপত্রের কপি দেখুন (ক্লিক করুন)

