পেশাগত দায়িত্বে মক্কেলের নয়, বিবেকের বাণী অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩: পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার

প্রশ্ন ১৩। (ক): “পেশাগত দায়িত্ব পালনে একজন আইনজীবী মক্কেলের নয়, স্বীয় বিবেকের বাণী অনুসরণ করিতে বাধ্য” (An Advocate should follow the voice of his own conscience, not of his client)—The Canons of Professional Conduct and Etiquette-এর আলোকে এই মহান নীতিটি বিশদভাবে আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আইনি দর্শন

আইন পেশা কোনো বাণিজ্যিক সেবাদানকারী কারবার নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচার প্রশাসন ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার এক মহান প্রতিষ্ঠান। একজন আইনজীবী কেবল তার মক্কেলের ভাড়াটে মুখপত্র নন, বরং তিনি সর্বোপরি আদালতের একজন সম্মানিত কর্মকর্তা (Officer of the Court)। লর্ড হেনরি ব্রোহাম এবং লর্ড ডেনিংসহ প্রখ্যাত আইনবিদদের মতে—আইনজীবীর দায়িত্ব মক্কেলের স্বার্থ রক্ষা করা ঠিকই, কিন্তু সেই দায়িত্ব কখনই সত্য ও সুবিচারের ঊর্ধ্বে নয়।

The Canons of Professional Conduct and Etiquette-এর অধ্যায় ২ (মক্কেলের প্রতি আইনজীবীর আচরণ)-এর বিধি ১ এবং অধ্যায় ৪ (আদালতের প্রতি আচরণ)-এ স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে যে, পেশাগত দায়িত্বে মক্কেলের নয়, স্বীয় বিবেকের বাণী অনুসরণ করাই আইনজীবীর চূড়ান্ত অলঙ্ঘনীয় বাধ্যবাধকতা।

২. নীতির মূল তাৎপর্য ও ক্যাননসের বিধানাবলী

ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্ট অনুযায়ী এই নীতির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যসমূহ নিম্নরূপ:

(ক) মক্কেলের অন্যায্য ইচ্ছা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই (Chapter II, Rule 1):

কোনো মক্কেল যদি আইনজীবীকে কোনো অনৈতিক, অসৎ বা বেআইনি কার্য করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে (যেমন: ভুয়া জাল দলিল তৈরি করা, মিথ্যা সাক্ষী বানিয়ে আদালতে হাজির করা বা সাক্ষীকে প্রভাবিত করা), তবে আইনজীবী তা প্রত্যাখ্যান করতে সম্পূর্ণ আইনগতভাবে বাধ্য। মক্কেল আইনজীবীর বুদ্ধি ও আইনি পরামর্শের মালিক, কিন্তু তার বিবেক বা আত্মার মালিক নয়।

(খ) অহেতুক বা হয়রানিমূলক মামলা বর্জন (Chapter II, Rule 2):

আইনজীবীর নিজের বিবেচনায় যদি প্রতীয়মান হয় যে কোনো মামলা কেবল প্রতিপক্ষকে ব্ল্যাকমেইল বা অযথা হয়রানি করার অসাধু উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে এবং এতে কোনো আইনগত সারবত্তা নেই, তবে আইনজীবীর বিবেক তাকে সেই মামলা প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেয়।

(গ) আদালতের প্রতি সত্যনিষ্ঠার অগ্রাধিকার (Duty to Court over Duty to Client):

আইনজীবীর দ্বৈত সত্তার মধ্যে আদালতের প্রতি দায়িত্ব মক্কেলের প্রতি দায়িত্বের চেয়ে সর্বদা উচ্চতর। যদি কোনো আইনি নজির বা আইন মক্কেলের বিরুদ্ধে যায়, তবুও আইনজীবী আদালতকে তা অবহিত করতে বাধ্য। আদালতকে বিভ্রান্ত করে কোনো অসৎ জয় হাসিল করা চরম পেশাগত অসদাচরণ (Misconduct)।

৩. বাস্তব আদালতে এই নীতির প্রয়োগের ক্ষেত্রসমূহ

  • সাক্ষী জেরার ক্ষেত্রে শিষ্টাচার: মক্কেল যতই চাপাচাপি করুক না কেন, বিরোধী পক্ষের সাক্ষীকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ব্যক্তিগত চরিত্র হনন, অপমানজনক বা স্ক্যান্ডালাস প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকা।
  • আদালতের সময় নষ্ট না করা: অযথা মামলা ঝুলিয়ে রেখে বা মিথ্যা অসুস্থতার দরখাস্ত দিয়ে মামলার বিচার বিলম্বিত করার মক্কেলি অপকৌশলকে সমর্থন না করা।
  • আপস মীমাংসার পরামর্শ: যে মামলায় আপসের মাধ্যমে বিরোধের অবসান সম্ভব, সেখানে মক্কেলকে অনর্থক মামলা চালিয়ে যাওয়ার উসকানি না দিয়ে নিষ্পত্তির সৎ পরামর্শ দেওয়া।

৪. নীতি লঙ্ঘনের আইনি পরিণতি

যদি কোনো আইনজীবী মক্কেলের অন্ধ অনুসারী হয়ে বেআইনি কার্যকলাপে জড়িত হন, তবে The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972-এর অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী তিনি চরম পেশাগত অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত হবেন। বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল অনুচ্ছেদ ৩৪ অনুযায়ী তার সনদ সাময়িক স্থগিত বা স্থায়ীভাবে বাতিল করতে পারেন।

৫. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বনাম বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (48 DLR 112): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, “আইনজীবী হলেন আইনের সৈনিক এবং সুবিচারের অতন্দ্র প্রহরী। মক্কেলের অবৈধ ইচ্ছার দাসত্ব করা আইন পেশার আত্মমর্যাদাকে কলুষিত করে।”
  • রমেশ চন্দ্র বনাম বার কাউন্সিল (32 DLR (AD) 140): মক্কেলের প্ররোচনায় আদালতে জাল ওকালতনামা ও ভুয়া এফিডেভিট দাখিল করার অপরাধে আইনজীবীর সনদ বাতিলের আদেশ বহাল রাখা হয়েছিল।
  • ড. কামাল হোসেন বনাম বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (44 DLR 289): আদালতের মর্যাদা রক্ষা এবং স্বাধীন বিবেক অনুযায়ী আইন পরিচালনা আইনজীবীর পবিত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব।

৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও উপসংহার

উপসংহারে বলা যায়, “মক্কেলের নয়, বিবেকের বাণী অনুসরণ করা”—এই মূলমন্ত্রটিই একজন সাধারণ আইন ব্যবসায়ী থেকে একজন খাঁটি আইনজীবীকে পৃথক করে। মক্কেলকে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা প্রদান করার পাশাপাশি নৈতিকতা ও আদালতের প্রতি অবিচল আনুগত্য বজায় রাখাই আইন পেশার চিরায়ত মহত্ত্বের মূল চাবিকাঠি।

৪. পেশাগত দায়িত্বে বিবেকের বাণী বনাম মক্কেলের অন্যায্য নির্দেশ

আইন পেশার মৌলিক দর্শন হলো আইনজীবী কেবল মক্কেলের মুখপাত্র নন, তিনি বিচার প্রশাসনের একজন সংবিধিবদ্ধ কর্মকর্তা (Officer of the Court):

  • মক্কেল যদি কোনো জাল দলিল তৈরিতে আইনজীবীকে বাধ্য করতে চায় বা অসত্য সাক্ষ্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেয়, তবে আইনজীবী তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করবেন;
  • বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট-এর ২য় অধ্যায়ের ৩ ও ৪ বিধি অনুযায়ী আইনজীবীর নিজস্ব সততা ও ন্যায়বোধ যেকোনো মক্কেলের অবৈধ ইচ্ছার ঊর্ধ্বে;
  • কোনো মামলা আইনগতভাবে ভিত্তিহীন বা অসৎ প্রমাণিত হলে মক্কেলকে আপস বা মোকদ্দমা প্রত্যাহার করার সৎ উপদেশ দেওয়াই একজন আদর্শ আইনজীবীর কর্তব্য।

৫. উচ্চ আদালতের অনুশাসন

সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত রায়সমূহে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইনজীবীর স্বাধীনতা ও নীতিবোধই আইন পেশাকে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবসা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে।

৬. বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক অনুশাসন ও পেশাগত অঙ্গীকার

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, আইনজীবী হলেন ন্যায়ের পূজারী। মক্কেলের অর্থ বা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে মিথ্যা মামলা পরিচালনা বা প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে ব্ল্যাকমেইল করার আইনি অপচেষ্টা চালালে উক্ত আইনজীবীকে সনদচ্যুত করার পাশাপাশি সমাজে দৃষ্টান্তমূলক বার্তা দিতে হবে। সততাই আইন পেশার শ্রেষ্ঠ ভূষণ।

আইনি সিদ্ধান্ত: পরিশেষে, আইন পেশা সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিবেকের দীপ্তিতে ভাস্বর; মক্কেলের অন্ধ অনুগামী না হয়ে আদালতের ন্যায়বিচারের সারথী হওয়াই প্রতিটি আইনজীবীর জীবনের পরম ব্রত।

পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সতর্কতা: বার কাউন্সিলের প্রফেশনাল এথিক্সের প্রশ্নে আইনজীবী ও বিচারকের পারস্পরিক সম্মান এবং অসৎ মামলা বর্জনে আইনজীবীর নৈতিক স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

Related Articles

Back to top button