দলিল বাতিলের সংজ্ঞা উপাদান এবং দলিলের পক্ষের ঘোষণা মামলার রক্ষণীয়তা – বার কাউন্সিল ২০১৫

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৫: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭

প্রশ্ন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী দলিল বাতিল (Cancellation of Instruments) বলিতে কি বুঝায়? দলিল বাতিলের ডিক্রি পাইতে হইলে বাদীকে কি কি উপাদান প্রমাণ করিতে হয়? যে ব্যক্তি কোনো দলিলের পক্ষ (Party to an instrument), সে কি দলিল বাতিলের প্রার্থনা না করিয়া কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণামূলক মোকদ্দমা দায়ের করিতে পারে? আরজির আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা ও সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ বিশদ আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও দলিল বাতিলের ধারণা

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী কোনো লিখিত দলিল বাতিল বা রদকরণের প্রতিকার প্রদান করা হয়। কোনো দলিল যদি প্রতারণা, জবরদস্তি, ভুল বা অবৈধ প্রতিদানের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় এবং উক্ত দলিলটি বাজারে বলবৎ থাকলে তা কোনো ব্যক্তির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বা আশঙ্কার কারণ হয়, তবে আদালত উক্ত দলিলটি বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিকার দেন। এর আইনশাস্ত্রীয় দর্শন হলো—“Prevention is better than cure”; অর্থাৎ দলিলটি ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা বা প্রতারণার অস্ত্র হিসেবে যাতে ব্যবহৃত হতে না পারে, আদালত তা কার্যকর হওয়ার আগেই ধ্বংস বা বাতিল করে দেন।

২. ৩৯ ধারায় দলিল বাতিলের ৩টি আবশ্যিক আইনি উপাদান

বিজ্ঞ আদালত হতে ৩৯ ধারার অধীনে দলিল বাতিলের অনুকূল ডিক্রি লাভ করতে হলে বাদীকে ৩টি মৌলিক উপাদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়:

  1. দলিলটির বাতিলযোগ্য বা বাতিল প্রকৃতি (Void or Voidable): যে দলিলটি বাতিলের দাবি করা হচ্ছে, তা আইনের দৃষ্টিতে হয় সম্পূর্ণ বাতিল (Void ab initio) অথবা বাদীর অভিপ্রায়ে বাতিলযোগ্য (Voidable under Contract Act, 1872)।
  2. যুক্তিসঙ্গত গুরুতর আশঙ্কার উপস্থিতি (Reasonable Apprehension of Serious Injury): বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে, উক্ত লিখিত দলিলটি যদি বাতিল না করে বলবৎ বা অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা বাদীর সম্পত্তি বা বৈধ অধিকারের ওপর অপূরণীয় গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
  3. আদালতের স্বেচ্ছাধীন বিচারিক বিবেচনা (Judicial Discretion): ৩৯ ধারার প্রতিকার কোনো বাধ্যকর অধিকার নয়, এটি আদালতের ন্যায়পরায়ণ ও স্বেচ্ছাধীন বিচারিক ক্ষমতা (Discretionary Relief)। আদালত দলিলের আংশিক বাতিল বা সংশোধনও করতে পারেন (ধারা ৪০)।

তামাদির মেয়াদ: তামাদি আইন, ১৯০৮-এর প্রথম তফসিলের ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলিল বাতিলের মোকদ্দমা দায়েরের সাধারণ তামাদির মেয়াদ হলো ৩ (তিন) বৎসর (দলিলের বিষয়বস্তু বা প্রতারণা জানার তারিখ হতে, ধারা ১৮)।

৩. দলিলের পক্ষ কি কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা মামলা করতে পারে? (Proviso to Section 42)

এই আইনগত প্রশ্নটি দেওয়ানি মোকদ্দমা পরিচালনার একটি অত্যন্ত মৌলিক ও বিতর্কিত বিষয়। এর সমাধান নিহিত রয়েছে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তাংশ (Proviso to Section 42) এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত অনুশাসনে:

“Provided that no Court shall make any such declaration where the plaintiff, being able to seek further relief than a mere declaration of title, omits to do so.”
অর্থাৎ, বাদী যেখানে কেবল স্বত্ব বা অধিকারের ঘোষণার চেয়েও অতিরিক্ত বা আনুষঙ্গিক কোনো কার্যকর প্রতিকার চাইতে সক্ষম ছিল, কিন্তু তা চায়নি, সেখানে আদালত কোনো নিছক ঘোষণামূলক ডিক্রি প্রদান করবেন না।

আইনি সিদ্ধান্ত:

  • বাদী যদি দলিলের পক্ষ হন (Party to the Instrument): যে ব্যক্তি কোনো বিক্রয় দলিল, হেবা বা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দাতা বা গ্রহীতা হিসেবে পক্ষভুক্ত, উক্ত দলিলটি তার ওপর সরাসরি বাধ্যকর (Binding on him) থাকে যতক্ষণ না তা কোনো উপযুক্ত আদালত বাতিল ঘোষণা করে। অতএব, দলিলের কোনো পক্ষ যদি ৩৯ ধারার আনুষঙ্গিক প্রতিকার (দলিল বাতিলের প্রার্থনা) না চেয়ে কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা চায় যে “দলিলটি অবৈধ বা কার্যহীন”, তবে ৪২ ধারার শর্তাংশ অনুযায়ী উক্ত মোকদ্দমা আইনত বারিত ও অচল (Not Maintainable) হবে। তাকে অবশ্যই পূর্ণ অ্যাড-ভ্যালেরম কোর্ট ফি প্রদানপূর্বক ৩৯ ধারায় দলিল বাতিলের সুনির্দিষ্ট প্রার্থনা করতে হবে।
  • বাদী যদি দলিলের পক্ষ না হন (Stranger / Non-Party): পক্ষান্তরে, কোনো দলিল যদি বাদীর অজ্ঞাতে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি কর্তৃক সৃজিত হয় যাতে বাদী স্বাক্ষর করেননি বা পক্ষভুক্ত নন, তবে সেই দলিল আইনের চোখে বাদীর ওপর শুরু থেকেই কোনো বাধ্যকর ক্ষমতা রাখে না। সে ক্ষেত্রে বাদী কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা চাইতে পারেন যে “উক্ত দলিল জাল এবং বাদীর স্বার্থের ওপর বাধ্যকর নয়”। সেখানে ৩৯ ধারায় সরাসরি বাতিল না চাইলেও মামলা রক্ষণীয় হবে।

৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ৩৯ ধারা (দলিল বাতিল) বনাম ৪২ ধারা (ঘোষণামূলক মোকদ্দমা)

তুলনার ক্ষেত্র ধারা ৩৯ (দলিল বাতিলের মোকদ্দমা) ধারা ৪২ (ঘোষণামূলক মোকদ্দমা)
প্রতিকারের প্রকৃতি লিখিত দলিল সরাসরি বাতিল ও খতম করার নির্দেশ। কোনো আইনি চরিত্র বা সম্পত্তিতে অধিকারের নিছক স্বীকৃতি।
কোর্ট ফি দলিলের মূল্যমানের ওপর সম্পূর্ণ অ্যাড-ভ্যালেরম কোর্ট ফি। সুনির্দিষ্ট ফিক্সড কোর্ট ফি (Court Fees Act Schedule II)।
দলিলের রেজিস্ট্রারের কাছে কপি আদালত সাব-রেজিস্ট্রারের নিকট বাতিলের কপি পাঠান ভলিউমে নোট রাখার জন্য। সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর কোনো কপি পাঠানোর সংবিধিবদ্ধ বিধান নেই।
তামাদির মেয়াদ তামাদি আইনের অনুচ্ছেদ ৯১ অনুযায়ী ৩ বৎসর। অধিকার অস্বীকারের তারিখ হতে সাধারণ তামাদি ৬ বৎসর (অনুচ্ছেদ ১২০)।

৫. বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৩৯ ধারার আরজির পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা

বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সদর, ঢাকা

দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪

বাদী: মো: আব্দুল জলিল, পিতা- মৃত কাশেম আলী, সাং- সূত্রাপুর, ঢাকা।
— বনাম —
১. মো: সেলিম রেজা, ২. সাব-রেজিস্ট্রার, সদর, ঢাকা — বিবাদীগণ

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারা মতে প্রতারণামূলক সাফ-কবলা দলিল বাতিলের আরজি

মোকদ্দমার কারণ ও বিবরণ:

  1. বাদী নিম্ন তপশিল বর্ণিত সম্পত্তির একমাত্র বৈধ মালিক ও শান্তিপূর্ণ দখলে অধিষ্ঠিত রহিয়াছেন।
  2. ১ নং বিবাদী বাদীর সহজ-সরলতার সুযোগ নিয়ে বন্ধকী ঋণ গ্রহণের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে গত ১৫/০২/২০২২ তারিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে প্রতারণার আশ্রয়ে একটি সাফ-কবলা বিক্রয় দলিলে বাদীর স্বাক্ষর গ্রহণ করে (দলিল নং- ১২৩৪/২০২২)।
  3. বাদী উক্ত দলিলের মাধ্যমে কখনোই জমি বিক্রয় করেন নাই এবং কোনো বিক্রয়মূল্য বা পণ গ্রহণ করেন নাই।
  4. উক্ত দলিলটি সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক ও বাতিলযোগ্য হওয়ায় বলবৎ থাকিলে বাদীর সম্পত্তিতে চরম অপূরণীয় ক্ষতি হইবে। বাদী গত ১০/০১/২০২৪ তারিখে উক্ত প্রতারণার দলিল আবিষ্কার করিয়াছেন এবং ৩ বছরের তামাদি মেয়াদের মধ্যে আরজি দাখিল করিলেন।
  5. দলিল মূল্যের ওপর প্রয়োজনীয় অ্যাড-ভ্যালেরম কোর্ট ফি দাখিল করা হইল।

প্রার্থনা:
অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে—
ক) ঢাকা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত গত ১৫/০২/২০২২ তারিখের ১২৩৪ নং সাফ-কবলা দলিলটি প্রতারণামূলক, বাতিল এবং বাদীর ওপর বাধ্যকর নয় মর্মে ঘোষণা দিয়া উক্ত দলিলটি বাতিলের ডিক্রি প্রদান করিতে;
খ) উক্ত বাতিলের ডিক্রির একটি অনুলিপি ২ নং বিবাদী সাব-রেজিস্ট্রার বরাবরে প্রেরণ করিয়া রেজিস্ট্রেশন ভলিউমে বাতিলের নোট অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দিতে;
গ) মোকদ্দমার সমুদয় খরচাদি বাদীর অনুকূলে ডিক্রি দান করিতে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।

৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • আব্দুল খালেক বনাম মমতাজ বেগম (42 DLR (AD) 89): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, যে ব্যক্তি কোনো দলিলের সরাসরি পক্ষ, তাকে উক্ত দলিল এড়াতে হলে ৩৯ ধারায় বাতিলের সুনির্দিষ্ট প্রার্থনা করতেই হবে; কেবল ৪২ ধারায় ঘোষণা মামলা আইনত অচল।
  • মো: মহিউদ্দিন বনাম সিরাজুল হক (52 DLR 505): হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন যে, দলিলের বাইরে কোনো তৃতীয় পক্ষ দলিলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেবল ৪২ ধারায় দলিলটি তার স্বার্থের প্রতিকূল ও অকার্যকর মর্মে ঘোষণা চাইতে পারে।
  • সুধীর রঞ্জন বনাম রাজ্যেশ্বরী (34 DLR 287): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ৩৯ ধারার বাতিলের ডিক্রি হলে আদালত সাব-রেজিস্ট্রারকে ভলিউমে বাতিলের এন্ট্রি নিশ্চিত করার সংবিধিবদ্ধ নির্দেশ পাঠাতে বাধ্য।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, দলিল বাতিলের সংজ্ঞা উপাদান এবং দলিলের পক্ষের ঘোষণা মামলার রক্ষণীয়তা বিচার করতে গিয়ে আদালত কঠোরভাবে দেখতে পান যে দলিলের কোনো পক্ষ আনুষঙ্গিক প্রতিকার এড়িয়ে আদালতের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কেবল ঘোষণা চাইতে পারেন না। ন্যায়বিচার ও ৪২ ধারার শর্তাংশ রক্ষা করতে ৩৯ ধারার অধীনে বাতিল প্রার্থনাই একমাত্র বিধিসম্মত পথ।

Related Articles

Back to top button