স্থানীয় তদন্ত ও কমিশনার নিয়োগের বিরোধিতায় ৫টি আইনি যুক্তি (Order XXVI Rule 9 CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | দেওয়ানী কার্যবিধি
প্রশ্ন ২। (খ): আপনার প্রতিপক্ষের বিজ্ঞ কৌশুলি নালিশী জমির বাজার মূল্য নির্ধারণ, বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা ও এর বর্তমান দখলকার নির্ধারণের জন্য The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order-XXVI, rule-9 অনুযায়ী স্থানীয় তদন্তের প্রার্থনায় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, পঞ্চগড় এ আবেদন দাখিল করেছেন। এই দরখাস্তের বিরোধিতায় আপনার ৫ টি যুক্তি সংশ্লিষ্ট আইনের বরাতসহ লিপিবদ্ধ করুন।
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
দেওয়ানী কার্যবিধির Order XXVI, Rule 9 অনুযায়ী স্থানীয় তদন্তের (Local Investigation) জন্য আদালত কর্তৃক অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের সুনির্দিষ্ট আইনগত সীমা রয়েছে। কোনো পক্ষ যখন নিজের মোকদ্দমার সাক্ষ্য সংগ্রহের দায়িত্ব আদালতের কমিশনারের ঘাড়ে চাপাতে চায় (Fishing inquiry / Collecting evidence), বিশেষ করে দখল প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে কমিশনার নিয়োগের দাবি করে, তখন আইনত তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য। অত্র প্রশ্নে পঞ্চগড় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে প্রতিপক্ষের দাখিলকৃত স্থানীয় তদন্তের দরখাস্তের বিরুদ্ধে ৫টি অকাট্য আইনি যুক্তি প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Code of Civil Procedure, 1908:
- Order XXVI, Rule 9: Commissions to make local investigations (যেকোনো বিরোধীয় বিষয়ে ঘটনা স্পষ্টীকরণ বা সম্পত্তির বার্ষিক বা বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য)।
- Order XXVI, Rule 10: কমিশনারের রিপোর্ট ও সাক্ষ্যের মর্যাদা।
- The Evidence Act, 1872: Sections 101, 102 & 110 (দখল ও স্বত্ব প্রমাণের দায়িত্ব বাদীর নিজের)।
৩. স্থানীয় তদন্তের দরখাস্ত বিরোধিতায় ৫টি আইনি যুক্তি
বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে প্রতিপক্ষের Order XXVI, Rule 9-এর আবেদনের বিরোধিতায় ৫টি সুনির্দিষ্ট ও জোরালো যুক্তি নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো:
- যুক্তি ১: দখল প্রমাণের জন্য স্থানীয় তদন্ত বা কমিশনার নিয়োগ আইনত বারিত (Possession cannot be investigated by Commission):
সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তিতে বর্তমানে কার বাস্তব দখল রয়েছে তা প্রমাণের দায়িত্ব পক্ষগণের নিজেদের (The Evidence Act, 1872, Sec 101)। মৌখিক ও প্রামাণ্য দলিলি সাক্ষ্যের মাধ্যমেই দখল প্রমাণ করতে হবে। অ্যাডভোকেট কমিশনার পাঠিয়ে সরেজমিনে “কে দখলে আছে” তা নিরূপণ করা আদালতের কাজ নয় এবং এর মাধ্যমে পক্ষগণের প্রমাণের দায় এড়ানো যায় না। - যুক্তি ২: সাক্ষ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কমিশন নিয়োগ নিষিদ্ধ (Commission cannot be issued to collect evidence):
কমিশনের উদ্দেশ্য পক্ষগণের পক্ষে সাক্ষ্য কুড়ানো (Fishing out evidence) নয়। মোকদ্দমায় যে পক্ষ দাবি করে, তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়ে দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে বা সাক্ষ্য সংগ্রহের জন্য Order XXVI, Rule 9 এর অপব্যবহার করা বেআইনি। - যুক্তি ৩: প্রাথমিক সাক্ষ্য গ্রহণের পূর্বে স্থানীয় তদন্ত অপ্রয়োজনীয় ও অকালপক্ব (Premature Application):
দেওয়ানী কার্যবিধির সুপ্রতিষ্ঠিত রীতি হলো, পক্ষগণ আদালতে দাঁড়িয়ে মূল সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করার পর যদি কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখা বা জটিল অবস্থা স্পষ্টীকরণের প্রয়োজন পড়ে, তখনই কেবল আদালত স্থানীয় তদন্তের আদেশ বিবেচনা করবেন। সাক্ষ্যগ্রহণের পূর্বে প্রাথমিক পর্যায়েই কমিশনার নিয়োগের আবেদন অকালপক্ব (Premature)। - যুক্তি ৪: বাজার মূল্য নির্ধারণের জন্য দেওয়ানী মোকদ্দমার কারণ অপ্রাসঙ্গিক (Valuation Issue):
প্রতিপক্ষ জমির বর্তমান বাজার মূল্য নির্ধারণের কথা বলেছেন। যদি মোকদ্দমার আরজিতে কোর্ট ফি বা আর্থিক এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ না হয়ে থাকে, তবে মূল মামলার শুনানিতে বাজার মূল্য নির্ধারণের কোনো আইনগত আবশ্যকতা নেই; এটি কেবল মামলা দীর্ঘায়িত করার অপপ্রয়াস। - যুক্তি ৫: মামলা দীর্ঘায়িত করা ও অযথা কালক্ষেপণের অসদুপায় (Malafide attempt to delay the trial):
প্রতিপক্ষের আবেদনটি সদুদ্দেশ্যমূলক নয়; বরং বিচার বিলম্বিত করা এবং অযৌক্তিক ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে বিচারপ্রার্থীকে হয়রানি করার হীন উদ্দেশ্যে দাখিল করা হয়েছে।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- আবুল কালাম বনাম আফসার উদ্দিন, ৪১ ডিএলআর (এডি) ৯৯: আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে রায় দিয়েছেন যে, সম্পত্তিতে কার দখল বিদ্যমান তা প্রমাণের জন্য Order XXVI Rule 9 CPC মতে স্থানীয় তদন্তের আদেশ প্রদান সম্পূর্ণ বেআইনি। দখল প্রমাণের দায়িত্ব পক্ষদের নিজস্ব মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে।
- মনোরঞ্জন সাহা বনাম অমূল্য চন্দ্র সাহা, ৩৫ ডিএলআর ২৩৪: কোনো পক্ষ নিজের মামলা প্রমাণের সাক্ষ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে অ্যাডভোকেট কমিশনারের সাহায্য নিতে পারে না (A party cannot utilize the process of Court under Order 26 Rule 9 to collect evidence in support of his claim)।
৫. উপসংহার
স্থানীয় তদন্তের বিধান কোনো পক্ষকে সাক্ষ্য সৃষ্টির লাইসেন্স দেয় না। দখল ও প্রাথমিক অবস্থা নির্ধারণে প্রতিপক্ষের দরখাস্তটি আইনগতভাবে ভিত্তিহীন হওয়ায় তা সরাসরি নামঞ্জুরযোগ্য।
৪.১. স্থানীয় তদন্ত কমিশনারের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আইনি আপত্তি ও জেরা
দেওয়ানি কার্যবিধির ২৬ আদেশের ৯ ও ১০ নিয়ম অনুযায়ী কমিশনারের প্রতিবেদন মোকদ্দমার একটি সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হয়, তবে তা চূড়ান্ত নয়:
- সংক্ষুব্ধ পক্ষ কমিশনারের প্রতিবেদন দাখিলের পর তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লিখিত আপত্তি (Written Objection) দাখিল করতে পারে;
- আদালতের অনুমতি নিয়ে বিজ্ঞ আইনজীবী কমিশনারকে কাঠগড়ায় তুলে জেরা করতে পারেন যে তিনি উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে চেইন টেনে সঠিক সীমানা নির্ধারণ করেছেন কি না;
- প্রতিবেদনে মারাত্মক পক্ষপাতিত্ব বা ভুল প্রমাণিত হলে বিজ্ঞ আদালত ২৬ আদেশের ১০(৩) নিয়ম মতে উক্ত প্রতিবেদন বাতিল করে পুনরায় নতুন কমিশনার নিয়োগের নির্দেশ দিতে পারেন (আমির আলী বনাম রোকেয়া, 46 DLR 140)।
৪.২. কমিশনারের কাজের নিরপেক্ষতা রক্ষায় আদালতের সতর্কতা
দেওয়ানি কার্যবিধির ২৬ আদেশের ৯ নিয়মে স্থানীয় তদন্তের আদেশ দেওয়ার পূর্বে আদালত নিশ্চিত হবেন যে বিরোধীয় তথ্যটি আদালতে উপস্থাপিত মৌখিক বা দালিলিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। নিছক কোনো পক্ষের জন্য সাক্ষ্য সংগ্রহ (Collection of Evidence) করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কমিশনার নিয়োগ বেআইনি।
আইনি সিদ্ধান্ত: পরিশেষে, বিজ্ঞ আদালত উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে প্রস্তুতকৃত নিরপেক্ষ ও নিখুঁত সীমানা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই জমি বিরোধের ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি করবেন।

