সালিসি পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ দণ্ডনীয় অপরাধ এবং দেনমোহর তাৎক্ষণিক প্রদেয়: হাইকোর্ট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক রায়: মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ৬ ধারার বিধান অনুযায়ী বিদ্যমান স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় সালিসি পরিষদ (Arbitration Council)-এর পূর্বানুমতি গ্রহণ না করে দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিবাহ সম্পাদন করা একটি সুনির্দিষ্ট শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। উক্ত অপরাধের জন্য স্বামী ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। শুধু তাই নয়, ৬(৫) ধারার অপরিহার্য বিধান মোতাবেক এই বেআইনি দ্বিতীয় বিবাহ সম্পাদনের সাথে সাথেই প্রথম স্ত্রীর যাবতীয় দেনমোহর (আশু ও বিলম্বিত উভয় অংশই) তৎক্ষণাৎ তলবযোগ্য (Immediately Payable) হয়ে যায় এবং স্বামী এককালীন তা পরিশোধ করতে আইনত বাধ্য।
মামলার বিবরণে প্রকাশ, মোসাম্মৎ নাজমা আক্তারের সাথে মো. শফিকুল ইসলামের ২০১২ সালে ৮ লাখ টাকা দেনমোহরে বিবাহ সম্পন্ন হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। ২০২০ সালে স্বামী প্রথম স্ত্রীকে কোনো কিছু না জানিয়ে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সালিসি পরিষদে কোনো আবেদন না করে গোপনে অন্য এক নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন এবং প্রথম স্ত্রীকে অস্বীকার করেন।
প্রথম স্ত্রী বিষয়টি জানতে পেরে বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬(৫) ধারায় ফৌজদারি নালিশি মামলা দায়ের করেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে স্বামীকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত উক্ত সাজা বহাল রাখেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে স্বামী হাইকোর্টে ক্রিমিনাল রিভিশন দায়ের করেন।
👤 স্বামীর আইনি যুক্তি
স্বামী দাবি করেন যে, মুসলিম শরিয়ত আইনে পুরুষকে একাধিক বিবাহের অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম স্ত্রী অবাধ্য হওয়ায় তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, যার কারণে কোনো ফৌজদারি সাজা হতে পারে না।
👥 প্রথম স্ত্রীর যুক্তি
স্ত্রীর বিজ্ঞ কৌঁসুলি জানান যে, ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৬ ধারা একটি রাষ্ট্রীয় আইন। চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা স্পষ্টত ফৌজদারি অপরাধ এবং দেনমোহর তাৎক্ষণিক আদায়যোগ্য।
হাইকোর্ট বিভাগ দেখতে পান যে, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দ্বিতীয় বিয়ের নিকাহনামা, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র যথাযথভাবে পরীক্ষা করেছেন। চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে স্বামী কোনো অনুমতি চাননি। কাজেই অপরাধ প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণিত।
হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ 34 DLR 227 এবং 41 DLR 139 বিশ্লেষণ করে রায় দেন যে, ১৯৬১ সালের আইনের ৬ ধারা নারীদের বহুবিবাহের অত্যাচার থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রণীত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আইনকে অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিগত খেয়ালখুশিমতো বিয়ে করার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় স্বামী কারাদণ্ডের উপযুক্ত এবং প্রথম স্ত্রীর মোহরানা চাওয়ার অধিকার জন্ম নিয়েছে।
চূড়ান্ত রায়: ক্রিমিনাল রিভিশনটি খারিজ করা হয়। অধস্তন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত ৬ মাসের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের সাজা সম্পূর্ণরূপে বহাল রাখা হয় এবং স্বামীকে অবিলম্বে সাজা ভোগার্থে ট্রায়াল কোর্টে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সাথে প্রথম স্ত্রী বকেয়া দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে সার্টিফিকেট কেস বা ডিক্রি জারির অধিকার লাভ করেন।
- সালিসি পরিষদের অনুমতি ব্যতিরেকে বহুবিবাহ দণ্ডনীয়: চেয়ারম্যানের লিখিত অনুমোদন ছাড়া গোপনে বিয়ে করলে ১ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।
- বিলম্বিত দেনমোহর অবিলম্বে তলবযোগ্য: দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রীর বিলম্বিত দেনমোহর তৎক্ষণাৎ পরিশোধযোগ্য হয়ে যায়।
- প্রথম স্ত্রীর মর্যাদার সুরক্ষা: রাষ্ট্রীয় আইনে পুরুষদের বহুবিবাহের স্বেচ্ছাচারী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
- দ্বিতীয় বিয়ের পূর্বশর্ত মেনে চলা: বিশেষ প্রয়োজনে দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে আগে ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনে বৈধ আবেদন করুন।
- প্রথম স্ত্রীর আইনি প্রতিকার: স্বামী গোপনে বিয়ে করলে দ্রুত নিকাহনামার সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৬ ধারায় মামলা করুন।
- একসাথে পারিবারিক আদালতে মোহরানা মামলা: ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি পারিবারিক আদালতে সম্পূর্ণ দেনমোহরের ডিক্রি চেয়ে মামলা দায়ের করুন।
- কাজীদের সতর্কতা: প্রথম স্ত্রীর অনুমতিপত্র ছাড়া বিয়ে রেজিস্ট্রি করলে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।
- আইনজীবীদের জন্য গাইডলাইন: আরজির সাথে চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি সংক্রান্ত প্রত্যয়ন দাখিল করলে মামলা দ্রুত সাজা পর্যন্ত এগিয়ে যায়।
