আরজি প্রত্যাখ্যান (Order 7 Rule 11) ও আইন ও ঘটনার মিশ্র প্রশ্ন | CPC 1908

১। ক. “Plaint cannot be rejected on Mixed question of law and fact.” The Code of Civil Procedure, 1908 এর বিধান অনুযায়ী আরজি প্রত্যাখ্যানের সুনির্দিষ্ট কারণসমূহ উল্লেখপূর্বক মন্তব্যটি ব্যাখ্যা করুন।

ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক ধারা:

দেওয়ানি কার্যবিধি (Code of Civil Procedure), ১৯০৮ এর ৭ আদেশের ১১ বিধি (Order VII, Rule 11) অনুযায়ী আদালত কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে একটি মামলা প্রাথমিক পর্যায়েই বাতিল বা আরজি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। তবে আরজি প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা আদালতের একটি বিশেষ ক্ষমতা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করতে হয়। একটি আরজি প্রত্যাখ্যান করা হবে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আদালতকে শুধুমাত্র আরজিতে উল্লেখিত বিবৃতিগুলো বিবেচনা করতে হয়। যদি আরজির বিবৃতি থেকে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যা প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য গ্রহণের প্রয়োজন, অর্থাৎ তা যদি “আইন ও ঘটনার মিশ্র প্রশ্ন” (Mixed question of law and fact) হয়, তবে সেই যুক্তিতে আরজি প্রত্যাখ্যান করা যায় না।

আরজি প্রত্যাখ্যানের সুনির্দিষ্ট কারণসমূহ (Grounds for Rejection of Plaint):

দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এর ৭ আদেশের ১১ বিধি অনুযায়ী নিম্নোক্ত ৪টি কারণে আদালত আরজি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন:

  • ১. নালিশের কারণ না থাকলে [Order 7, Rule 11(a)]: আরজিতে যদি এমন কোনো বিবৃতি না থাকে যা থেকে বাদীর মামলা করার বা নালিশের কোনো সুস্পষ্ট কারণ (Cause of Action) উদ্ঘাটিত হয়, তবে আরজি প্রত্যাখ্যাত হবে।
  • ২. প্রতিকারের মূল্য কম দেখালে [Order 7, Rule 11(b)]: আরজিতে দাবিকৃত প্রতিকারের মূল্য যদি অবমূল্যায়ন (Undervalued) করা হয় এবং আদালতের নির্দেশিত সময়ের মধ্যে বাদী তা সংশোধন করতে ব্যর্থ হন।
  • ৩. অপর্যাপ্ত স্ট্যাম্প পেপার ব্যবহার করলে [Order 7, Rule 11(c)]: দাবিকৃত প্রতিকারের সঠিক মূল্যায়ন করা হয়েছে, কিন্তু আরজিটি অপর্যাপ্ত স্ট্যাম্পযুক্ত কাগজে লেখা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প সরবরাহ করতে বাদী ব্যর্থ হলে।
  • ৪. আইন দ্বারা বারিত হলে [Order 7, Rule 11(d)]: আরজির বিবৃতি থেকে যদি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মামলাটি কোনো আইন দ্বারা (যেমন: তামাদি আইন, বা Res Judicata দ্বারা) বারিত (Barred by Law)।

“Plaint cannot be rejected on Mixed question of law and fact” – উক্তিটির আইনি ব্যাখ্যা:

উক্ত মন্তব্যের মূল অর্থ হলো— যখন কোনো আইনি প্রশ্ন নির্ধারণের জন্য আগে কোনো ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করার প্রয়োজন হয়, তখন তাকে “আইন ও ঘটনার মিশ্র প্রশ্ন” বলা হয়। দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, ৭ আদেশের ১১ বিধির অধীনে আরজি প্রত্যাখ্যান করার সময় আদালত শুধুমাত্র আরজির চারকোণায় (Four corners of the plaint) থাকা বক্তব্যগুলোকেই সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নেবেন। বিবাদীর লিখিত জবাব (Written Statement) বা অন্য কোনো সাক্ষ্য এই পর্যায়ে বিবেচনায় নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

যদি কোনো মামলা তামাদি দ্বারা বারিত (Time-barred) কি না বা আদালতের এখতিয়ার আছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য সাক্ষীদের জেরা বা দলিলাদি প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে, তবে সেটি আর নিছক আইনের প্রশ্ন থাকে না, বরং তা আইন ও ঘটনার মিশ্র প্রশ্নে পরিণত হয়। যেহেতু আরজি প্রত্যাখ্যান পর্যায়ে সাক্ষ্য গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই, তাই মিশ্র প্রশ্নের উদয় হলে বিচারিক আদালত (Trial Court) আরজি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। তখন মামলাটি বিচারিক প্রক্রিয়ায় (Trial) যেতে হবে এবং বিচার্য বিষয় (Framing of Issues) নির্ধারণ করে নিষ্পত্তি করতে হবে।

লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):

  • ১. “Ubi jus ibi remedium” (যেখানে অধিকার আছে, সেখানে প্রতিকার আছে): আদালতের প্রাথমিক কাজ হলো বিচারপ্রার্থীর অধিকার নিশ্চিত করা। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই তড়িঘড়ি করে আরজি প্রত্যাখ্যান করলে বাদীর এই মৌলিক আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে। তাই মিশ্র প্রশ্ন থাকলে আদালতকে অবশ্যই সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
  • ২. “Demurrer must be decided on the face of the plaint”: এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি যার অর্থ হলো, আরজি প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ‘আরজির দৃশ্যমান ত্রুটি’ (ex facie defect)-এর ওপর ভিত্তি করেই হতে হবে। ঘটনার গভীরে গিয়ে বা অনুমান নির্ভর হয়ে আরজি প্রত্যাখ্যান করা বিধিসম্মত নয়।

উদাহরণ (Example):

ধরা যাক, ‘ক’ জমি পুনরুদ্ধারের জন্য ‘খ’-এর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করলো। আরজিতে ‘ক’ দাবি করলো যে, সে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি জমি থেকে বেদখল হয়েছে। সে অনুযায়ী মামলাটি তামাদি আইনের অধীনে ১২ বছরের সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই দায়ের করা হয়েছে (যা আরজির দৃশ্যমান বক্তব্য অনুযায়ী আইনসিদ্ধ)।

কিন্তু বিবাদী ‘খ’ আদালতে হাজির হয়ে দাবি করলো যে, সে ২০ বছর ধরে ঐ জমি ভোগদখল করছে, সুতরাং মামলাটি তামাদি আইনে বারিত বা বাতিলযোগ্য (Barred by Limitation)।

এখানে, ‘ক’ কবে বেদখল হয়েছে (২০২২ সালে নাকি ২০ বছর আগে)— এটি একটি ঘটনার প্রশ্ন (Question of fact)। এবং এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে মামলাটি তামাদি দোষে দুষ্ট কি না— তা হলো আইনের প্রশ্ন (Question of law)। দুটি মিলে এটি একটি “আইন ও ঘটনার মিশ্র প্রশ্ন”।

এক্ষেত্রে ৭ আদেশের ১১(ঘ) বিধি অনুযায়ী আদালত শুধুমাত্র বিবাদীর কথার ওপর ভিত্তি করে আরজি প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না। আদালতকে অবশ্যই সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে যে বাদী আসলেই কবে বেদখল হয়েছে।

উপসংহার (Conclusion):

পরিশেষে বলা যায়, দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধির উদ্দেশ্য হলো ভিত্তিহীন এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলোকে শুরুতেই বাতিল করে আদালতের মূল্যবান সময় বাঁচানো। কিন্তু এই ক্ষমতা প্রয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। আরজি প্রত্যাখ্যান করতে হলে আরজির নিজের বক্তব্য থেকেই মামলাটির অযোগ্যতা শতভাগ প্রমাণিত হতে হবে। যেখানে আইন প্রয়োগের আগে কোনো ঘটনার সত্যতা প্রমাণের বাধ্যবাধকতা চলে আসে (Mixed question of law and fact), সেখানে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই আরজি প্রত্যাখ্যান না করে মামলাটির পূর্ণাঙ্গ বিচার (Full Trial) হওয়া বাঞ্ছনীয়। উচ্চ আদালত বিভিন্ন নজিরের (Precedents) মাধ্যমে বারবার এই নীতিরই সমর্থন দিয়েছেন যে, সংশয়ের বশবর্তী হয়ে বিচারপ্রার্থীর আদালতের দরজা বন্ধ করে দেওয়া আইনের উদ্দেশ্য নয়।

 

Related Articles

Back to top button