২০০৫ সালের পর মুসলিম আইনে মৌখিক হেবা আইনত অকার্যকর ও অবৈধ: সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ (Registration Act, 1908)-এর ১৭(১)(aa) ধারা সংশোধনের মাধ্যমে ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে মুসলিম পারিবারিক হেবার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। এই সংশোধনীর পর কোনো পক্ষ যদি দাবি করে যে ২০০৫ সালের পরবর্তী সময়ে তার পিতা, মাতা বা কোনো আত্মীয় তাকে মৌখিকভাবে জমি দান বা হেবা করেছেন এবং তিনি দখলে আছেন, তবে সেই মৌখিক হেবা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ, অস্তিত্বহীন ও অকার্যকর (Void ab initio)। রেজিস্ট্রিকৃত হেবা ঘোষণাপত্র (Registered Instrument of Heba) ব্যতীত মৌখিক হেবার অজুহাতে বৈধ ওয়ারিশদের হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় মরহুম আবদুস সামাদের মৃত্যুর পর তার কন্যা ও পুত্রদের মধ্যে যৌথ এজমালি স্থাবর সম্পত্তি বণ্টনের বিরোধ দেখা দেয়। বাদী মোসাম্মৎ রওশন আরা বেগম ও অন্যান্য কন্যারা তাদের পিতার ত্যক্ত সম্পত্তিতে মুসলিম ফরায়েজ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশের দাবিতে বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়ের করেন।
বিবাদী পুত্র আবুল কাশেম ও অন্যান্য ভাইয়েরা লিখিত জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে, পিতা জীবদ্দশায় ২০১০ সালে এক ঘরোয়া মজলিসে সমস্ত ভিটাবাড়ি ও ধানি জমি পুত্রদের অনুকূলে মৌখিকভাবে হেবা (Oral Gift) করে দখল বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। কাজেই এই জমি এজমালি বা বাটোয়ারাযোগ্য নয় এবং কন্যারা কোনো হিস্যা পাবেন না। সহকারী জজ আদালত মৌখিক হেবার স্বপক্ষে মৌখিক সাক্ষ্য বিশ্বাস করে বাদীদের বাটোয়ারা মোকদ্দমা খারিজ করে দেন। জেলা জজ আদালতও তা বহাল রাখেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে কন্যারা হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন।
👤 বাদী কন্যাদের আইনি যুক্তি
বাদীদের বিজ্ঞ আইনজীবী দৃঢ়ভাবে যুক্তি দেন যে, ২০০৫ সালের পর রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(aa) ধারা সংযোজনের ফলে বাংলাদেশে কোনো প্রকার মৌখিক হেবা আইনসিদ্ধ নয়। ২০১০ সালের কথিত মৌখিক হেবা একটি কাল্পনিক ও প্রতারণামূলক গল্প, যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
👥 বিবাদী পুত্রদের আত্মপক্ষ সমর্থন
বিবাদীদের কৌঁসুলি দাবি করেন যে, মোহামেডান ল-এর ১২৩ ধারায় মৌখিক প্রস্তাব, গ্রহণ ও দখল অর্পণে হেবা সম্পূর্ণ হয়। তারা জমিতে বাড়ি তৈরি করে দীর্ঘকাল দখলে আছেন, কাজেই তাদের স্বত্ব বিনষ্ট হতে পারে না।
হাইকোর্ট বিভাগ পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, সহকারী জজ ও জেলা জজ আদালত উভয়ই ২০০৫ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের যুগান্তকারী সংশোধনী এড়িয়ে গিয়ে সেকেলে নীতির আলোকে রায় দিয়েছেন। আইন প্রণেতাগণ যখন স্পষ্ট ভাষায় আইন সংশোধন করে মৌখিক হেবা নিষিদ্ধ করেছেন, তখন কোনো বিচারক ব্যক্তিগত ধারণার বশবর্তী হয়ে স্ট্যাটিউট লঙ্ঘন করতে পারেন না।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ 64 DLR 212 এবং 70 DLR 340 উদ্ধৃত করে রায় দেন যে, রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(aa) ও ৪৯ ধারার বিধানাবলি বাধ্যতামূলক ও অনুপেক্ষণীয়। ২০০৫ সালের ১ জুলাই বা তার পরবর্তী যেকোনো তারিখের হেবা প্রমাণ করতে হলে অবশ্যই ‘রেজিস্টার্ড হেবা দলিল’ দেখাতে হবে। মৌখিক সাক্ষ্যের জোরে নিবন্ধনের ঘাটতি পূরণ করা যায় না (সাক্ষ্য আইনের ৯১ ও ৯২ ধারা)। অতএব কথিত মৌখিক হেবা বাতিল এবং সম্পত্তিটি পিতা মারা যাওয়ার পর সকল ওয়ারিশের এজমালি সম্পত্তি হিসেবে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন রুলটি পরম (Absolute) করা হয়। অধস্তন উভয় আদালতের রায় ও ডিক্রি রদ ও রহিত করা হয়। বাটোয়ারা মোকদ্দমা মঞ্জুর করে বাদীদের পক্ষে তাদের বৈধ শরীয়তি অংশের প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree) প্রদান করা হয় এবং বিজ্ঞ ট্রায়াল কোর্টকে ৩ মাসের মধ্যে সার্ভেয়ার অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে সাহাম বণ্টন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
- বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নীতি: ২০০৫ সালের ১ জুলাই পরবর্তী যেকোনো মুসলিম হেবা বা দানের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি ব্যতীত স্বত্ব হস্তান্তরিত হয় না।
- কন্যা ও নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষা: মৌখিক হেবার অজুহাত দিয়ে কন্যা ও বোনদের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করার কুপ্রথা এই রায়ের মাধ্যমে কঠোরভাবে প্রতিহত হয়েছে।
- সাক্ষ্য আইনের বাধা: আইনের অধীন যে দলিল লিখিত ও নিবন্ধিত হওয়া বাধ্যতামূলক, তার প্রমাণে মৌখিক সাক্ষ্য সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য।
- হেবা গ্রহণের সময় দলিল রেজিস্ট্রি: পিতা-মাতা বা আত্মীয় কারও কাছ থেকে হেবা গ্রহণ করলে কেবল নামমাত্র ফি দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি করে নিন।
- মৌখিক হেবার ভিত্তিতে জমি ক্রয় নয়: কেউ যদি দাবি করে যে সে মৌখিক হেবামূলে জমির মালিক এবং রেজিস্ট্রি দলিল নেই, তবে এমন জমি কখনোই ক্রয় করবেন না।
- বাটোয়ারা মামলায় ওয়ারিশদের আইনি পদক্ষেপ: ভাইয়েরা মৌখিক হেবার গল্প সাজালে সরাসরি রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭(১)(aa) ধারার ব্যত্যয় তুলে ধরে আবেদন করুন।
- ২০০৫ সালের পূর্বের ও পরের পার্থক্য: মনে রাখবেন, ২০০৫ সালের ১ জুলাইয়ের পূর্বে মৌখিক হেবার ডিক্লারেশন বৈধ ছিল, কিন্তু ১ জুলাই ২০০৫ থেকে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- আইনজীবীদের জন্য আর্জি তৈরির কৌশল: বাটোয়ারা আরজিতে বিবাদীদের কথিত মৌখিক হেবা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ ঘোষণা করার সুস্পষ্ট প্রতিকার প্রার্থনা রাখুন।

