স্বীকৃতির ভিত্তিতে রায় (Judgment on Admissions) | ১২ আদেশ ৬ বিধি | CPC 1908

২। ক. Judgment on Admissions’ কী? আদালত কোন ক্ষেত্রে উক্তরূপ রায় প্রদান করেন? সংশ্লিষ্ট বিধান উল্লেখে উত্তর দিন।

ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক ধারা:

দেওয়ানি মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো পক্ষগণের মধ্যকার বিরোধীয় বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা। কিন্তু মামলার কোনো পর্যায়ে যদি একপক্ষ অপরপক্ষের কোনো দাবি বা ঘটনা স্বীকার করে নেয়, তবে সেই স্বীকৃত বিষয়ের জন্য দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। এই নীতিকে কার্যকর করতেই দেওয়ানি কার্যবিধি (Code of Civil Procedure), ১৯০৮ এর ১২ আদেশের ৬ বিধি (Order XII, Rule 6)-তে ‘স্বীকৃতির ভিত্তিতে রায়’ বা ‘Judgment on Admissions’ এর সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।

‘Judgment on Admissions’ বা ‘স্বীকৃতির ভিত্তিতে রায়’ কী?

‘Judgment on Admissions’ বলতে এমন একটি রায়কে বোঝায়, যা মামলার কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া বা সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য অপেক্ষা না করে, কেবল পক্ষগণের মধ্যে কোনো ঘটনার স্বীকৃতির (Admission of Fact) ওপর ভিত্তি করে আদালত প্রদান করেন।

সহজ কথায়, বাদীর আরজিতে উল্লেখিত কোনো দাবি বা ঘটনা যদি বিবাদী তার লিখিত জবাবে বা অন্য কোনোভাবে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে স্বীকার করে নেয়, তবে আদালত ঐ স্বীকৃত দাবির সাপেক্ষে যে রায় প্রদান করেন, তাকেই ‘স্বীকৃতির ভিত্তিতে রায়’ বলা হয়।

আদালত কোন ক্ষেত্রে উক্তরূপ রায় প্রদান করেন?

দেওয়ানি কার্যবিধির ১২ আদেশের ৬ বিধি অনুযায়ী, আদালত নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে এবং শর্ত সাপেক্ষে স্বীকৃতির ভিত্তিতে রায় প্রদান করতে পারেন:

  • ১. স্বীকৃতির ধরন: ঘটনা বা দাবির স্বীকৃতিটি আরজিতে বা লিখিত জবাবে (In the pleadings) হতে পারে, অথবা অন্য কোনোভাবে যেমন- মৌখিক বা লিখিতভাবে (or otherwise) হতে পারে।
  • ২. আবেদনের প্রেক্ষিতে বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে: মামলার যেকোনো পক্ষ এই রায়ের জন্য আদালতে আবেদন করতে পারে। অথবা, আদালত চাইলে নিজ উদ্যোগেও (Suo motu) এই রায় প্রদান করতে পারেন।
  • ৩. মামলার যেকোনো পর্যায়ে: এই রায় প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্তর নেই। মামলার যেকোনো পর্যায়ে (At any stage of the suit) আদালত এই রায় দিতে পারেন।
  • ৪. অন্য বিচার্য বিষয়ের জন্য অপেক্ষা না করে: মামলার অন্য কোনো বিতর্কিত বা বিচার্য বিষয় (Other questions) নিষ্পত্তির জন্য অপেক্ষা না করেই আদালত শুধুমাত্র স্বীকৃত অংশের ওপর দ্রুত রায় ও ডিক্রি প্রদান করতে পারেন।

লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):

  • ১. “Facts admitted need not be proved” (স্বীকৃত ঘটনা প্রমাণের প্রয়োজন নেই): এটি সাক্ষ্য আইনের অন্যতম একটি মূলনীতি, যা সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ৫৮ ধারাতেও বিধৃত রয়েছে। ১২ আদেশের ৬ বিধি মূলত এই আইনি নীতিরই একটি পদ্ধতিগত প্রয়োগ।
  • ২. “Justice delayed is justice denied” (বিচারিক বিলম্ব মানেই বিচারহীনতা): স্বীকৃতির ভিত্তিতে রায় প্রদানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমানো এবং বিচারপ্রার্থীকে দ্রুততম সময়ে আইনি প্রতিকার প্রদান করা।

উদাহরণ (Example):

ধরা যাক, ‘ক’ তার পাওনা ১০ লক্ষ টাকা আদায়ের জন্য ‘খ’-এর বিরুদ্ধে আদালতে একটি মানি স্যুট (Money Suit) দায়ের করলো। বিবাদী ‘খ’ আদালতে হাজির হয়ে তার লিখিত জবাবে (Written Statement) দাবি করলো যে, সে ‘ক’-এর কাছে ১০ লক্ষ নয়, বরং ৬ লক্ষ টাকা ঋণী এবং বাকি ৪ লক্ষ টাকার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এখানে, ৬ লক্ষ টাকার বিষয়টি বিবাদী ‘খ’ কর্তৃক একটি সুস্পষ্ট স্বীকৃতি (Admission)। এক্ষেত্রে ১২ আদেশের ৬ বিধি অনুযায়ী আদালত চাইলে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করেই, তাৎক্ষণিকভাবে ওই ৬ লক্ষ টাকার জন্য ‘ক’-এর অনুকূলে একটি ‘Judgment on Admission’ প্রদান করতে পারেন। আর বাকি ৪ লক্ষ টাকার বিতর্কিত দাবির জন্য মামলার সাধারণ বিচারিক প্রক্রিয়া (Trial) চলমান থাকবে।

উপসংহার (Conclusion):

পরিশেষে বলা যায়, দেওয়ানি কার্যবিধির ১২ আদেশের ৬ বিধির অধীন ‘Judgment on Admissions’ আদালতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা (Discretionary Power)। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যেসব বিষয়ে পক্ষগণের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, সেগুলো নিয়ে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে দ্রুত রায় প্রদানের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত করা। তবে আদালতকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে, স্বীকৃতিটি ছিল সুস্পষ্ট, নিঃশর্ত এবং দ্ব্যর্থহীন।

Related Articles

Back to top button