ডাক্তারের ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া মৃত্যুকালীন জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না: সুপ্রিম কোর্ট

⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (Evidence Act, 1872)-এর ৩২(১) ধারা অনুযায়ী মৃত্যুকালীন জবানবন্দি (Dying Declaration) জবানবন্দিকারীর জেরা করার সুযোগ না থাকায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করতে হয়। ভিকটিম যদি গুরুতর বা মারাত্মকভাবে দগ্ধ (Severe Burn Injuries) হয়ে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে আসেন, তবে জবানবন্দি গ্রহণের প্রাক্কালে তিনি কথা বলার মতো সুস্থ ও সচেতন মানসিক অবস্থায় (Fit state of mind to make statement) ছিলেন কিনা—তা কর্তব্যরত চিকিৎসকের লিখিত প্রত্যয়নপত্র ছাড়া কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না। নিরপেক্ষ ডাক্তারের সার্টিফিকেট ছাড়া এবং কোনো জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ব্যতিরেকে পুলিশের উপস্থিতিতে স্বজনদের প্ররোচনায় লিখিত অবিশ্বস্ত জবানবন্দির ওপর এককভাবে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা বিচারিক সুবিবেচনার চরম লঙ্ঘন।

১. মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ (Facts of the Case)

মামলার বিবরণে জানা যায়, কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে এক গৃহবধূ আগুনে দগ্ধ হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বার্ন ইউনিটে ভর্তির পর পুলিশ একটি তথাকথিত মৃত্যুকালীন জবানবন্দি গ্রহণ করে যাতে অভিযোগ করা হয় যে তার স্বামী রুবেল হোসেন কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। ঘটনার দুই দিন পর ভিকটিম মারা যান।

পুলিশ স্বামীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করে চার্জশিট দাখিল করে। বিচারকালে দেখা যায়, উক্ত জবানবন্দিতে চিকিৎসকের কোনো স্বাক্ষর বা প্রত্যয়ন নেই যে রোগী তখন কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন। বরং মেডিকেল রেকর্ডে দেখা যায় রোগীকে ভারী সিডেটিভ (Sedative/Painkiller) দেওয়া হয়েছিল এবং তার গলার শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠান।

👤 আসামিপক্ষের মূল যুক্তি

আসামির বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি দেন যে, ৮৫% পুড়ে যাওয়া এবং ট্রাকিয়া ক্ষতিগ্রস্ত একজন রোগী যেখানে শ্বাস নিতে পারছিলেন না, সেখানে কোনো ডাক্তারের প্রত্যয়ন ছাড়া পুলিশের তৈরি জবানবন্দি একটি জাল নথি এবং তা প্ররোচিত (Tutored)।

👥 রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি

রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে যে, মরহুম ব্যক্তি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মিথ্যা অভিযোগ করবেন না—এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা উচিত।

৩. ট্রাইব্যুনালের বিচারিক ভুলের আইনি মূল্যায়ন (Errors of Trial Court)

হাইকোর্ট বিভাগ লক্ষ্য করেন যে, ট্রাইব্যুনাল মেডিকেল এভিডেন্স এবং ডাক্তারদের জবানবন্দি নিরপেক্ষভাবে পরখ না করে অন্ধভাবে মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে সত্য ধরে নিয়েছেন। বার্ন কেসের ক্ষেত্রে রোগীর সচেতনতা ও কথা বলার সক্ষমতা নিশ্চিত হওয়া পূর্বশর্ত, যা ট্রাইব্যুনাল উপেক্ষা করেছেন।

৪. হাইকোর্টের আইনি ব্যাখ্যা ও রেশিও ডেসাইডেনডি (High Court’s Reasoning)

হাইকোর্ট বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত নজির 46 DLR (AD) 186 এবং 51 DLR (AD) 205 পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উদ্ধৃত করেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো: “A dying declaration can form the sole basis of conviction only if it is found to be true, voluntary and made in a fit state of mind, duly certified by a medical officer.” যখন এই মৌলিক সুরক্ষা অনুপস্থিত এবং স্বজনদের উপস্থিতি প্রমাণিত, তখন তা সন্দেহের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।

৫. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও খালাসের আদেশ (Final Verdict)

চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ ডেথ রেফারেন্স প্রত্যাখ্যান (Rejected) করেন এবং আসামির জেল আপিল মঞ্জুর করেন। মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে কনডেমড প্রিজনার মো. রুবেল হোসেনকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয় এবং তাকে অবিলম্বে কনডেম সেল থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তরপূর্বক মুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।

৬. রায়ের মূল আইনি শিক্ষা ও নজির (Core Principles)
  • ডাক্তারের সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক: মৃত্যুকালীন জবানবন্দি গ্রহণের সময় ডাক্তার কর্তৃক রোগীর মানসিক সুস্থতার লিখিত প্রত্যয়ন ছাড়া তা আদালতে প্রমাণহীন।
  • ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে রেকর্ডিংয়ের গুরুত্ব: পুলিশের চেয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ হলে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত হয়।
  • সন্দেহমুক্ত মৃত্যুর সাজার নীতি: মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ দণ্ডে সামান্যতম যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকলে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া আইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

৭. তদন্ত কর্মকর্তা ও ফৌজদারি আইনজীবীদের জন্য ৫টি জরুরি পরামর্শ
  1. অবিলম্বে ম্যাজিস্ট্রেটকে খবর দেওয়া: ভিকটিম সংকটাপন্ন হলে পুলিশ নিজে না লিখে দ্রুততম সময়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে কল করুন।
  2. বেডহেড টিকিট ও ডাক্তারকে জেরা: আসামিপক্ষের উচিত হাসপাতালের বেডহেড টিকিটে দেওয়া ইনজেকশন ও সিডেটিভের মাত্রা নিয়ে ডাক্তারকে জেরা করা।
  3. স্বজনদের সরিয়ে জবানবন্দি গ্রহণ: জবানবন্দি গ্রহণের সময় কোনো আগ্রহী স্বজনকে পাশে রাখা যাবে না যাতে প্ররোচনার অভিযোগ না ওঠে।
  4. ভিডিও রেকর্ডিংয়ের আধুনিক প্রযুক্তি: সম্ভব হলে জবানবন্দি গ্রহণের মুহূর্তটি সিসিটিভি বা ক্যামেরায় ভিডিও রেকর্ড করে রাখুন।
  5. আইনজীবীদের জন্য আপিল প্রস্তুতি: ডেথ রেফারেন্স মামলায় পোস্টমর্টেম ও বেডহেড টিকিটের প্রতিটি লাইনের অসংগতি তুলে ধরুন।

📑 মামলার পরিচিতি ও অফিসিয়াল রেকর্ড রেফারেন্স
মামলার নম্বর Death Reference No. 42 of 2020
আদালত ও বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (মাননীয় বিচারপতি ডিভিশন বেঞ্চ)
পক্ষদ্বয় রাষ্ট্র বনাম মো. রুবেল হোসেন
আইন ও ধারা Penal Code, 1860 (Section 302); Evidence Act, 1872 (Section 32(1))
অফিসিয়াল রায় (PDF) 📥 সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন

Related Articles

✍️ আইনি মতামত বা প্রশ্ন প্রকাশ করুন

Back to top button