নোটিশ ও শুনানির সুযোগ ছাড়া এসি ল্যান্ড কর্তৃক দীর্ঘদিনের নামজারি ও জমাভাগ বাতিল সম্পূর্ণ বেআইনি: হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (State Acquisition and Tenancy Act, 1950)-এর অধীনে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সৃজিত কোনো বৈধ নামজারি (Mutation) ও জমাভাগ (Jamabhag) খতিয়ান সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা রাজস্ব কর্তৃপক্ষ কারো মৌখিক বা একতরফা অভিযোগের ভিত্তিতে হঠাৎ বাতিল করতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট খতিয়ানধারী বা রেকর্ডীয় মালিককে সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ প্রদান ব্যতীত গৃহীত এমন যেকোনো বাতিল আদেশ প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি (Natural Justice)-এর পরিপন্থী এবং আইনত সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য ও এখতিয়ারবহির্ভূত (Ultra Vires)।
মামলার বিবরণে প্রকাশ, পিটিশনার মো. আবদুর রহিম ১৯৮৮ সালের রেজিস্ট্রিকৃত সাফ-কবলা দলিলমূলে ঢাকার সাভার উপজেলাধীন মৌজায় ৫২ শতাংশ জমি ক্রয় করে বিগত ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তিপূর্ণ খাস দখলে আছেন। ক্রয়ের পরপরই তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট বিধিমোতাবেক আবেদন করে ১৯৯০ সালে একটি পৃথক নামজারি জোত খতিয়ান সৃজন করেন এবং নিয়মিত সরকার নির্ধারিত ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধপূর্বক দাখিলা সংগ্রহ করে আসছিলেন।
হঠাৎ করে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি স্বার্থান্বেষী স্থানীয় মহলের প্ররোচনায় ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা একটি একপেশে রিপোর্ট দাখিল করেন যাতে দাবি করা হয় উক্ত নামজারি খতিয়ানটি পূর্বতন সিএস বা এসএ রেকর্ডের সাথে মিল নেই। উক্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পিটিশনারকে কোনো ধরনের নোটিশ প্রদান না করে, কোনো সমন জারি না করে এবং শুনানির দিন ধার্য না করেই সরাসরি একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে পিটিশনারের ৩৫ বছরের পুরনো নামজারি খতিয়ান ও ডিসিআর বাতিল করে মূল ১ নং খতিয়ানে ফেরত পাঠান। এর ফলে পিটিশনার তার বৈধ জমিতে ব্যাংক ঋণ নেওয়া এবং খাজনা প্রদান থেকে বঞ্চিত হন। পিটিশনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর নিকট আপিল করেও প্রতিকার না পেয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট পিটিশন দায়ের করেন।
👤 রিট পিটিশনারের মূল যুক্তি
পিটিশনারের বিজ্ঞ কৌঁসুলি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, সংবিধানের ৩১ ও ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের আশ্রয় লাভ ও সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিটি নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার। ৩৫ বছর ধরে বহাল থাকা একটি খতিয়ান কারো আড়ালে প্রশাসনিক ক্ষমতার খেয়ালখুশি প্রয়োগ করে বাতিল করা যায় না। এসি ল্যান্ডের এই একতরফা আদেশ ল্যাটিন ম্যাক্সিম ‘Audi Alteram Partem’ (কাউকে না শুনে বিচার বা দণ্ড দেওয়া যাবে না)-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
👥 রেসপনডেন্ট সরকারের আত্মপক্ষ সমর্থন
রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেন যে, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ আইনের ১৪৩ ধারায় রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ভুল রেকর্ড সংশোধন করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। যেহেতু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রাথমিক তদন্তে মূল প্যারেন্ট দলিলের খতিয়ানের সাথে গরমিল পেয়েছেন, তাই সরকারি স্বার্থ ও রাজস্ব সুরক্ষার্থে উক্ত নামজারি বাতিল করা হয়েছে এবং পিটিশনারের বিকল্প ফোরামে রিভিশন করার সুযোগ ছিল।
হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট রাজস্ব নথি ও এসি ল্যান্ডের মিস কেস রেকর্ড তলব করে পর্যালোচনা করেন। নথিপত্র পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে যে, এসি ল্যান্ডের মিস কেস রেজিস্টারে পিটিশনারের প্রতি নোটিশ জারির কোনো প্রমাণপত্র (Service Return / SR) নেই। এমনকি কোনো নোটিশ জারি ছাড়াই একই দিনে প্রতিবেদন গ্রহণ এবং নামজারি বাতিলের চূড়ান্ত আদেশ স্বাক্ষর করা হয়েছে। রাজস্ব কর্তৃপক্ষের এই খামখেয়ালিপনা সম্পূর্ণ এখতিয়ারবিহীন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করেন যে, প্রজাস্বত্ব আইনের ১৫০ ধারার ক্ষমতা বা রাজস্ব ক্ষমতাবলে এসি ল্যান্ড বা এডিসি কাজ করলেও তারা কখনোই ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বা আইনের ঊর্ধ্বের কোনো সত্তা নন। যখন কোনো নাগরিকের পক্ষে দীর্ঘ তিন দশক ধরে একটি রেকর্ড প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং তার ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তি অধিকার অর্জিত হয়, তখন সেই রেকর্ড বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া একটি সাংবিধানিক শর্ত। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির 51 DLR (AD) 233 এবং 27 BLC (AD) 89 অনুযায়ী, নোটিশবিহীন যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জন্মগতভাবেই মৃত (Void ab initio)।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ পিটিশনারের পক্ষে রুল পরম (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক পিটিশনারের নামজারি খতিয়ান বাতিলের আদেশটি আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই সাথে আদালত পিটিশনারের নামজারি জোত খতিয়ান তাৎক্ষণিকভাবে পুনর্বহাল করার এবং যথারীতি সরকারি খাজনা গ্রহণপূর্বক দাখিলা প্রদান করার জন্য এসি ল্যান্ড ও তহশিলদারকে নির্দেশ দেন।
- প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি সাংবিধানিক অংশ: কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আধা-বিচারিক কর্তৃপক্ষ কারও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো অধিকার হরণ করার পূর্বে তাকে নোটিশ ও শুনানির সুযোগ না দিলে তা সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
- দীর্ঘদিনের মিউটেশন খতিয়ানের সুরক্ষা: কোনো নামজারি খতিয়ান দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকলে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে একতরফাভাবে তা বাতিল করা যায় না; নিয়মিত মিস কেস খুলে উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
- ভূমি মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের বাধ্যবাধকতা: ভূমি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সরকারি পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো রেকর্ড বাতিলের পূর্বে অন্তত ১৫ দিনের নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করতে হবে।
- অনলাইন নামজারি ও ই-পর্চা যাচাই: নিজের জমির নামজারি খতিয়ানটি নিয়মিত ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে সক্রিয় আছে কিনা এবং নিয়মিত খাজনা পরিশোধ হচ্ছে কিনা তা পরখ করুন।
- নোটিশ ছাড়া বাতিল হলে রিট পিটিশন: যদি এসি ল্যান্ড বা এডিসি কোনো নোটিশ না দিয়ে গোপনে আপনার নামজারি বাতিল করে, তবে সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে স্থগিতাদেশ চাওয়া অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রতিকার।
- আইনজীবীদের জন্য নোটিশের ঘাটতি প্রমাণের কৌশল: সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের মিস কেসের মূল নথির ‘সমন জারির তলবানা ও প্রসেস সার্ভারের রিপোর্ট’ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করুন।
- খাজনার দাখিলা সংরক্ষণ: পূর্ববর্তী সকল খাজনা পরিশোধের মূল দাখিলা ও ডিসিআর কপি পরম যত্নে সংরক্ষণ করুন, যা আদালতের চোখে দখলের মজবুত দলিল।
- দেওয়ানি আদালতে স্বত্বের আশ্রয়: নামজারি নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে পাশাপাশি দেওয়ানি আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মোকদ্দমা (Suit for Declaration of Title) দায়ের করে রাখা অধিকতর নিরাপদ।

