মা স্বাবলম্বী বা চাকরিজীবী হলেও নাবালক সন্তানের খরচ বহন করা পিতার একক দায়িত্ব: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: মুসলিম আইন ও পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ অনুযায়ী নাবালক বা নাবালিকা সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করা পিতার একটি একক, পরম ও অলঙ্ঘনীয় সংবিধিবদ্ধ এবং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। সন্তানের মাতা যত উচ্চশিক্ষিত, স্বাবলম্বী বা সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ চাকরিজীবীই হোন না কেন, কিংবা মাতার বিপুল নিজস্ব সম্পদ থাকলেও পিতা কখনোই এই অজুহাত তুলতে পারেন না যে মাতার আয়ে সন্তান পালিত হবে। সন্তানের হেফাজত (Custody) মাতার নিকট থাকলেও পিতা প্রতি মাসে সন্তানের সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী ন্যায্য ভরণপোষণ প্রদানে আইনত বাধ্য।
মামলার বিবরণে জানা যায়, মোসাঃ নাসরিন আক্তার একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা। তার স্বামী ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বৈবাহিক কলহের জেরে তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। তাদের দুটি নাবালক সন্তান (একটি পুত্র ও একটি কন্যা) মায়ের হেফাজতে বসবাস করতে থাকে। বিচ্ছেদের পর পিতা মিজানুর রহমান সন্তানদের খোঁজখবর নেওয়া এবং স্কুল ফি ও ভরণপোষণ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।
মা নাসরিন আক্তার পারিবারিক আদালতে দুই সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৫০,০০০ টাকা হারে মাসিক খোরপোষ দাবি করে মামলা দায়ের করেন। পিতা আদালতে জবাব দাখিল করে দাবি করেন যে, মা নিজেই প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা এবং তার মাসিক বেতন ও পারিবারিক সম্পত্তি অত্যন্ত সমৃদ্ধ; পক্ষান্তরে পিতার ওপর বয়োবৃদ্ধ পিতামাতার দায় রয়েছে। ফলে মায়ের আর্থিক সক্ষমতা থাকায় পিতার ওপর খোরপোষের সম্পূর্ণ চাপ চাপানো অযৌক্তিক। পারিবারিক আদালত পিতার যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে দুই সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩৫,০০০ টাকা খোরপোষ ডিক্রি দেন এবং জেলা জজ আদালত উক্ত রায় বহাল রাখেন। সংক্ষুব্ধ হয়ে পিতা হাইকোর্টে এই রিভিশন মামলা দায়ের করেন।
👤 আবেদনকারী পিতার আইনি যুক্তি
পিতার আইনজীবী যুক্তি দেন যে, পিতা-মাতা উভয়েরই সন্তানের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। আধুনিক যুগে মা যখন সমান আয় করছেন, তখন সমস্ত খরচ একা পিতার ওপর চাপানো বৈষম্যমূলক এবং ৩৫,০০০ টাকা অতিরিক্ত।
👥 বিপরীতপক্ষ মাতার যুক্তি
মাতার আইনজীবী যুক্তি দেখান যে, ইসলামী শরিয়াহ এবং বাংলাদেশের বিধিবদ্ধ আইনে সন্তান প্রতিপালনের একক আর্থিক দায় পিতার। মা শারীরিক সেবা ও হেফাজত দিচ্ছেন, কিন্তু আর্থিক দায়িত্ব পিতার একক।
পারিবারিক আদালত এবং জেলা জজ আদালত উভয়েই নিখুঁতভাবে আইনের অবস্থান অনুধাবন করেছেন। পিতা একজন প্রথম শ্রেণির অধ্যাপক এবং তার পর্যাপ্ত আয় রয়েছে। সন্তানের উন্নত স্কুলে পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার মান পিতার সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সামর্থ্যের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির 50 DLR (AD) 124 এবং 58 DLR (AD) 172 বিস্তারিত উল্লেখ করেন। আপিল বিভাগ দ্ব্যর্থহীনভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন: “Under Muslim law, the duty of maintaining minor children rests solely upon the father. Even if the mother is in affluent circumstances or holds a gainful employment, the father is not relieved of his legal and moral obligation to provide for his children. The financial independence of the mother cannot be set up as a defence to escape liability.”
চূড়ান্ত রায়: সিভিল রিভিশন মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ (Dismissed) করা হয়। পারিবারিক আদালত কর্তৃক নির্ধারিত মাসিক ৩৫,০০০ টাকা খোরপোষ ডিক্রি সম্পূর্ণ বহাল রাখা হয়। পিতাকে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে পারিবারিক আদালতে উক্ত অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পূর্বে জমাকৃত বকেয়া বাবদ সমুদয় অর্থ আগামী ৯০ দিনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
- পিতার একক আর্থিক দায়: সন্তানের ভরণপোষণ মাতা ধনী হলেও পিতার একক সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব।
- পিতার মর্যাদানুযায়ী খোরপোষ: খোরপোষের অংক নির্ধারিত হবে পিতার সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রকৃত আয়ের ওপর ভিত্তি করে।
- মেয়ের বিবাহ পর্যন্ত দায়: পুত্রসন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং কন্যাসন্তান বিবাহ হওয়া পর্যন্ত পিতা সমস্ত খরচ দিতে বাধ্য।
- পিতার আয়ের প্রমাণ সংগ্রহ: পিতার আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও চাকরির পে-স্লিপ আদালতে প্রদর্শনী করান।
- সন্তানের ব্যয়ের রসিদ দাখিল: স্কুলের টিউশন ফি, কোচিং রসিদ ও চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন আদালতে উপস্থাপন করুন।
- মায়ের আয়ের অজুহাত প্রতিহত করা: পিতা মায়ের আয়ের কথা তুললে আপিল বিভাগের ৫০ ডিএলআর (এডি) ১২৪ রায় রেফার করুন।
- বেতন থেকে কর্তনের আবেদন: পিতা ডিক্রির পর টাকা না দিলে সরাসরি পিতার কর্মস্থলে বেতন কর্তনের আদেশ নিন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: বকেয়া খোরপোষের পাশাপাশি বাৎসরিক ১০% মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শর্ত যুক্ত করার আবেদন জানান।


