তালাক আইন ও তালাক রেজিস্ট্রি করার পদ্ধতি (তালাক ফি): বাংলাদেশের আইনি গাইডলাইন

ইসলামী শরীয়ত এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিবাহ (Marriage) হলো একটি পবিত্র দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract)। তবে মানবজীবনে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর একত্রে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায় এবং একত্রে থাকলে উভয়েরই ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন শেষ আইনি ও ধর্মীয় বিধান হিসেবে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ (Divorce)-এর বিধান রাখা হয়েছে। ইসলামে তালাককে সবচেয়ে অপছন্দনীয় বৈধ কাজ বলা হলেও, বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি অধিকার।

আমাদের সমাজে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে চরম অজ্ঞতা এবং নানাবিধ ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন রাগের মাথায় মুখে মুখে তিনবার ‘তালাক’ বললেই বুঝি তালাক কার্যকর হয়ে যায়, অথবা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট (Affidavit) করলেই বুঝি আইনি প্রক্রিয়া শেষ। এই ভুল ধারণাগুলোর কারণে পরবর্তীতে স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই ভয়াবহ আইনি জটিলতা, এমনকি ফৌজদারি মামলার (যেমন- বহুবিবাহ বা ব্যভিচার) মুখোমুখি হতে হয়। আজকের এই সুদীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী কলামে আমরা বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর আলোকে তালাকের আইনি ভিত্তি, প্রকারভেদ, তালাক প্রদানের সঠিক পদ্ধতি, নোটিশ পাঠানোর নিয়ম, আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ এবং তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন প্রদান করব।

১. তালাকের আইনি ভিত্তি এবং প্রকারভেদ (Legal Basis and Types of Divorce)

মুসলিম আইনে তালাকের ক্ষমতা প্রধানত স্বামীর হাতে ন্যস্ত থাকলেও, নির্দিষ্ট শর্তে স্ত্রীও তালাক প্রদান করতে পারেন। তালাককে প্রধানত নিম্নলিখিত কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়:

ক. স্বামীর দ্বারা তালাক (Talaq by Husband)

স্বামী যেকোনো সময় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তার স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা রাখেন। ইসলামী আইনশাস্ত্র অনুযায়ী এই তালাক তিন প্রকার: আহসান (সবচেয়ে উত্তম), হাসান (উত্তম) এবং বিদআত (নিষিদ্ধ বা জঘন্য)। এক বসায় তিন তালাক প্রদান করাকে ‘তালাক-ই-বিদআত’ বলা হয়। তবে বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ পাসের পর থেকে এক বসায় তিন তালাকের কোনো আইনি বৈধতা নেই। স্বামী মুখে যতবারই তালাক উচ্চারণ করুক না কেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা পর্যন্ত তা কার্যকর হবে না।

খ. স্ত্রীর দ্বারা তালাক বা তালাক-ই-তৌফিজ (Delegated Divorce)

ইসলামী আইনে স্ত্রীর তালাক প্রদানের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, তবে স্বামী যদি বিয়ের সময় বা পরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেন, তবে স্ত্রী সেই ক্ষমতা বলে নিজেকে তালাক দিতে পারেন। একে তালাক-ই-তৌফিজ বলা হয়। বাংলাদেশের সরকারি কাবিননামার (নিকাহনামা) ১৮ নম্বর কলামে এই ক্ষমতার কথা উল্লেখ থাকে (ঠিক যেমন ১৪ নম্বর কলামে দেনমোহরের কথা থাকে)। সেখানে যদি ‘হ্যাঁ’ লেখা থাকে এবং কোনো বিশেষ শর্ত যুক্ত না থাকে, তবে স্বামী যেভাবে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন, স্ত্রীও ঠিক একইভাবে একই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বামীকে তালাক দিতে পারেন।

গ. খুলা এবং মুবারাত (Khula and Mubarat)

খুলা: এটি স্ত্রীর প্রস্তাবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিবাহ বিচ্ছেদ। এক্ষেত্রে স্ত্রী সাধারণত তার দেনমোহরের অধিকার ছেড়ে দিয়ে বা স্বামীকে কিছু বিনিময় প্রদান করে বিচ্ছেদের প্রস্তাব দেন এবং স্বামী তাতে রাজি হলে ‘খুলা’ কার্যকর হয়।
মুবারাত: যখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করতে আগ্রহী হন এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিচ্ছেদ ঘটান, তখন তাকে মুবারাত বলা হয়। এই ক্ষেত্রে কেউ কারো প্রতি কোনো দাবি রাখেন না (দেনমোহরের দাবি ছাড়া, যদি তা মাফ করা না হয়)।

ঘ. আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ (Dissolution by Court)

যদি কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রীকে তালাক-ই-তৌফিজ বা তালাকের ক্ষমতা দেওয়া না থাকে, এবং স্বামীও যদি তালাক বা খুলাতে রাজি না হন, তখন স্ত্রী The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939 (মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯)-এর অধীনে পারিবারিক আদালতে (Family Court) মামলা দায়ের করে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি (Decree) নিতে পারেন। এই আইনে ৯টি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ রয়েছে, যার যেকোনো একটি প্রমাণ করতে পারলে আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের আদেশ দেবেন। কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: চার বছর ধরে স্বামীর নিখোঁজ থাকা, দুই বছর ধরে স্ত্রীর খোরপোষ দিতে ব্যর্থ হওয়া, স্বামীর সাত বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড হওয়া, বিনা কারণে স্বামীর তিন বছর ধরে দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া, স্বামীর পুরুষত্বহীনতা বা উন্মাদনা এবং স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ (Cruelty)।

২. মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৭ ধারা: তালাক কার্যকর হওয়ার মূল চাবিকাঠি

বাংলাদেশে তালাক কার্যকর করার জন্য শরীয়াহ আইনের পাশাপাশি Muslim Family Laws Ordinance, 1961 (MFLO)-এর Section 7 (ধারা ৭) কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। এই আইনের ৭ ধারাতেই তালাক প্রদানের সম্পূর্ণ পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। আপনি মুখে মুখে তালাক দিন, স্ট্যাম্পে লিখে দিন বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করুন— আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে (চেয়ারম্যান/মেয়র) লিখিত নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত তালাক কোনোভাবেই আইনগতভাবে কার্যকর হবে না।

নোটিশ প্রদান (Section 7(1)):

কোনো ব্যক্তি (স্বামী বা স্ত্রী) তার স্বামী/স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইলে তাকে অবশ্যই তালাক ঘোষণার পর লিখিতভাবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে একটি নোটিশ প্রদান করতে হবে। একই সাথে উক্ত নোটিশের একটি অনুলিপি (Copy) তার স্বামী বা স্ত্রীকে পাঠাতে হবে। কেউ যদি চেয়ারম্যানকে এই নোটিশ দিতে ব্যর্থ হন, তবে আইন অনুযায়ী তিনি ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

৯০ দিনের অপেক্ষমাণ সময় (Iddat Period – Section 7(3)):

চেয়ারম্যানের কাছে যেদিন নোটিশ পৌঁছাবে, ঠিক সেই দিন থেকে ৯০ দিন (Three months) অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তালাক আইনত কার্যকর হবে না। এই ৯০ দিনের সময়কালকে আইনি ভাষায় ‘ইদ্দত’ (Iddat) কাল বলা হয়। এই সময়ের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপস-মীমাংসার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং স্ত্রী গর্ভবতী কি না তা নিশ্চিত হওয়া। এই ৯০ দিন পার হওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রী চাইলে তাদের তালাকের নোটিশ প্রত্যাহার (Revoke) করে নিতে পারেন।

গর্ভবতী স্ত্রীর ক্ষেত্রে তালাক (Section 7(5)):

যদি তালাক প্রদানের সময় স্ত্রী গর্ভবতী (Pregnant) থাকেন, তবে চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর পর ৯০ দিন পার হলেও তালাক কার্যকর হবে না। গর্ভাবস্থা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত তালাকের কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে। সন্তান প্রসবের পর তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। এখানে একটি ভুল ধারণা আছে যে, গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যায় না। আইন বলছে— তালাক দেওয়া যাবে এবং নোটিশও পাঠানো যাবে, কিন্তু তা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে আইনত ‘কার্যকর’ (Effective) হবে না।

৩. তালাকের নোটিশ পাঠানোর সঠিক পদ্ধতি (Step-by-Step Procedure)

বাস্তব জীবনে একটি বৈধ তালাক সম্পন্ন করার জন্য নিচের আইনি ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে অনুসরণ করতে হয়:

ধাপ ১: এফিডেভিট বা হলফনামা প্রস্তুতকরণ

যদিও আইন অনুযায়ী শুধু সাদা কাগজে তালাক লিখে সই করলেই হয়, কিন্তু দালিলিক প্রমাণ (Documentary Evidence) শক্ত করার জন্য একজন আইনজীবীর মাধ্যমে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে (সাধারণত ২০০ বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে) একটি তালাকনামা (Affidavit of Divorce) প্রস্তুত করতে হয়। এতে নোটারি পাবলিক (Notary Public) বা প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সিল ও স্বাক্ষর থাকতে হয়। এই হলফনামায় তালাকের কারণ এবং ঘোষণার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকে।

ধাপ ২: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ

নোটিশটি কাকে পাঠাতে হবে তা নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। আইন অনুযায়ী, স্ত্রী তালাক প্রদানের সময় যে এলাকায় বসবাস করছেন (অর্থাৎ স্ত্রীর বর্তমান ঠিকানা), সেই এলাকার স্থানীয় সরকার প্রধানকে নোটিশ পাঠাতে হবে। স্ত্রী যদি গ্রামে থাকেন তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভায় থাকলে মেয়র, এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় থাকলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে নোটিশ পাঠাতে হবে। স্ত্রী যদি তালাক দেন, তবে স্বামীর বর্তমান ঠিকানার জনপ্রতিনিধি বরাবর নোটিশ যাবে।

ধাপ ৩: রেজিস্টার্ড ডাকযোগে নোটিশ প্রেরণ

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রস্তুতকৃত তালাকনামা বা নোটিশের একটি কপি সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান/মেয়র বরাবর এবং আরেকটি কপি স্বামী/স্ত্রীর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় ডাকযোগে রেজিস্টার্ড এডি (Registered with A/D – Acknowledgement Due) সহ পাঠাতে হবে। এডি (A/D) মানে হলো একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র, যা প্রাপক চিঠি গ্রহণ করার পর স্বাক্ষর করে ডাকবিভাগের মাধ্যমে আবার প্রেরকের কাছে ফেরত পাঠাবেন। এই এডি রসিদ এবং ডাকঘরের বুকিং স্লিপ অত্যন্ত সযত্নে সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ ভবিষ্যতে আদালতে প্রমাণ হিসেবে এটিই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে যে নোটিশটি যথানিয়মে পাঠানো হয়েছিল।

৪. সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন এবং আপস-মীমাংসা

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(৪) ধারা অনুযায়ী, চেয়ারম্যান বা মেয়র তালাকের নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলন বা আপস-মীমাংসা ঘটানোর উদ্দেশ্যে একটি সালিশি পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করবেন।

  • চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে চিঠি দিয়ে তাদের নিজ নিজ প্রতিনিধি (Representative) মনোনীত করতে বলবেন।
  • চেয়ারম্যান নিজে বা তার মনোনীত একজন, স্বামীর একজন প্রতিনিধি এবং স্ত্রীর একজন প্রতিনিধি— এই তিনজনকে নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠিত হবে।
  • এই পরিষদ উভয় পক্ষকে ডেকে তাদের মধ্যে বিরোধ মিটিয়ে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের চেষ্টা করবে।

যদি কোনো পক্ষ হাজির না হয়? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নোটিশ পাওয়ার পর স্বামী বা স্ত্রী সালিশি পরিষদের বৈঠকে উপস্থিত হন না। আইন অনুযায়ী, কোনো পক্ষ উপস্থিত না হলেও চেয়ারম্যানের আর কিছু করার থাকে না। চেয়ারম্যান আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন— মর্মে তিনি একটি রেজুলেশন বা সিদ্ধান্ত খাতায় লিখে রাখবেন। নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তালাকটি আইনত চূড়ান্ত এবং কার্যকর বলে গণ্য হবে। আপস না হলে চেয়ারম্যান বা পরিষদের তালাক আটকানোর কোনো আইনি ক্ষমতা নেই।

৫. তালাক রেজিস্ট্রি করার আইনি বাধ্যবাধকতা এবং পদ্ধতি

তালাকের নোটিশ পাঠানো এবং ৯০ দিন পার হয়ে তালাক কার্যকর হওয়াই আইনি প্রক্রিয়ার শেষ নয়। তালাক কার্যকর হওয়ার পর সেটিকে অবশ্যই রেজিস্ট্রি (Registration) করতে হবে। The Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 (মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, ১৯৭৪)-এর Section 6 অনুযায়ী, যেকোনো তালাক কার্যকর হওয়ার পর তা নিবন্ধন করা আইনত বাধ্যতামূলক।

তালাক কোথায় রেজিস্ট্রি করবেন?

যিনি তালাক দিয়েছেন, তাকে তালাক কার্যকর হওয়ার পর (৯০ দিন পর) একজন নিবন্ধিত নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার (যিনি কাজী নামে পরিচিত)-এর অফিসে যেতে হবে। সাধারণত যে এলাকায় তালাক কার্যকর হয়েছে, সেই এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজীর কাছে তালাক রেজিস্ট্রি করতে হয়। কাজী সাহেব একটি সরকারি ভলিউম বা রেজিস্টার খাতায় তালাকের বিবরণ এন্ট্রি করবেন।

কী কী কাগজপত্র লাগবে?

  • বিয়ের কাবিননামার (নিকাহনামা) কপি। (সতর্ক থাকবেন এটি যেন কোনো ভুয়া কাবিননামা না হয়)
  • তালাকের এফিডেভিট বা হলফনামার মূল কপি।
  • চেয়ারম্যান/মেয়র এবং স্বামী/স্ত্রীকে যে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল, তার পোস্টাল বুকিং স্লিপ এবং এডি (A/D) রসিদ।
  • ৯০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর স্থানীয় চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত তালাক কার্যকর হওয়ার সনদ (Divorce Effectiveness Certificate)
  • স্বামী ও স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ২ জন সাক্ষীর এনআইডি কপি।

এই সমস্ত নথিপত্র যাচাই করার পর কাজী সাহেব তালাক রেজিস্ট্রি করবেন এবং একটি তালাকনামা সনদ (Divorce Certificate / Boinama) প্রদান করবেন। এই সনদটিই হলো আইনত আপনার তালাকের চূড়ান্ত প্রমাণপত্র, যা ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিয়ে করা, বিদেশে যাওয়া, বা যেকোনো আইনি জটিলতা মোকাবেলায় প্রয়োজন হবে।

রেজিস্ট্রি না করার শাস্তি: ১৯৭৪ সালের আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি আইনসম্মতভাবে তালাক কার্যকর হওয়ার পর তা রেজিস্ট্রি করতে ব্যর্থ হন, তবে তিনি অনূর্ধ্ব ৩ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড, বা ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

৬. তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি (Divorce Registration Fees)

আমাদের সমাজে কাজী সাহেবদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বিয়ের কাবিননামা রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে যেমন দেনমোহরের অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারিত হয় (প্রতি হাজারে ১২.৫ টাকা বা লাখে ১,২৫০ টাকা), তালাক রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে আইনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ গ্যাজেট এবং বিধিমালা অনুযায়ী, তালাক রেজিস্ট্রেশনের ফি একটি সুনির্দিষ্ট বা ফিক্সড (Fixed) অঙ্ক। দেনমোহরের পরিমাণ যত লাখ বা কোটি টাকাই হোক না কেন, তালাক রেজিস্ট্রির ফি এর ওপর নির্ভর করে না। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার তালাক নিবন্ধনের জন্য সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা (৫০০/-) ফি হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন। এর সাথে তালাকনামার বা বইনামার সার্টিফাইড কপির জন্য সাধারণত আরও ৫০ বা ১০০ টাকা ফি ধার্য থাকে।

তবে বাস্তবতায় অনেক কাজী তালাক রেজিস্ট্রির জন্য ২ হাজার থেকে শুরু করে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে বসেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের হয়রানির শিকার হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি সরাসরি জেলা রেজিস্ট্রার বা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে অথবা জেলা প্রশাসকের (DC) কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।


বিয়ের দেনমোহর অনুযায়ী আপনার কাবিন ফি কত হবে?

তালাক ফি যেমন সুনির্দিষ্ট, তেমনি বিবাহ নিবন্ধনের (কাবিন) ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সরকারের একটি নির্দিষ্ট ফি নির্ধারিত রয়েছে। অতিরিক্ত টাকা দেওয়া থেকে বাঁচতে সরকারি গেজেট অনুযায়ী আপনার দেনমোহরের ভিত্তিতে সঠিক কাবিন ফি এক ক্লিকেই হিসাব করে নিন।

কাবিন ফি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন ⟶

৭. তালাক সংক্রান্ত ভুল ধারণা ও মারাত্মক আইনি জটিলতা

সঠিক আইনি পদ্ধতি অনুসরণ না করে আবেগ বা অজ্ঞতাবশত তালাক দিলে পরবর্তীতে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তার কিছু দৃষ্টান্ত নিচে দেওয়া হলো:

ক. মুখে তালাক এবং দ্বিতীয় বিয়ে (Bigamy & Adultery):

স্বামী রাগের মাথায় মুখে মুখে স্ত্রীকে তিন তালাক দিলেন। তারা ধরে নিলেন তাদের তালাক হয়ে গেছে। স্ত্রী কিছু দিন পর অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করে ফেললেন। যেহেতু ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং ৯০ দিন পার হয়নি, তাই আইনের চোখে আগের বিবাহটি সম্পূর্ণ বলবৎ রয়েছে। এমতাবস্থায় স্বামী যদি থানায় বা আদালতে গিয়ে The Penal Code, 1860-এর Section 494 (স্বামীর জীবদ্দশায় পুনরায় বিবাহ) এবং Section 497 (ব্যভিচার)-এর অধীনে মামলা দায়ের করেন, তবে স্ত্রীর এবং তার নতুন স্বামীর ৭ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এটি বাংলাদেশে অত্যন্ত সাধারণ একটি মামলা, যা শুধুমাত্র আইনি পদ্ধতি না জানার কারণে ঘটে।

খ. নোটারি পাবলিকের এফিডেভিটকেই চূড়ান্ত মনে করা:

অনেকেই আইনজীবীর চেম্বারে গিয়ে নোটারি পাবলিকের সামনে হলফনামা করে ভাবেন তালাক হয়ে গেছে। মনে রাখবেন, নোটারি করা কাগজটি কেবল আপনার একটি ঘোষণা। এটি তালাকের প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু তালাক ‘কার্যকর’ হওয়ার প্রমাণ নয়। চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়ার প্রমাণ বা ডাকঘরের এডি রসিদ না থাকলে ওই এফিডেভিট মূল্যহীন। বিখ্যাত Sirajul Islam v. Helena Begum মামলায় উচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ৭ ধারার নোটিশ প্রদান ব্যতীত তালাক সম্পূর্ণ বেআইনি।

গ. ইদ্দতকালীন খোরপোষ (Maintenance during Iddat):

তালাক নোটিশ পাঠানোর পর যে ৯০ দিন (ইদ্দত কাল) সময় থাকে, সেই ৯০ দিন স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে আইনিভাবে সম্পূর্ণ খোরপোষ বা মেইনটেন্যান্স পাওয়ার অধিকারী। তালাক হয়ে গেছে বলে এই ৯০ দিনের খরচ দেওয়া থেকে স্বামী বিরত থাকতে পারবেন না। যদি দেন, তবে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর অধীনে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন।

ঘ. দেনমোহর (Denmohor / Dower) প্রদান:

তালাক কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর (Deferred Dower) এবং অপরিশোধিত নগদ দেনমোহর (Prompt Dower) সম্পূর্ণভাবে প্রদেয় (Payable) হয়ে যায়। তালাক যে পক্ষ থেকেই হোক না কেন (স্বামী দিক বা স্ত্রী তালাক-ই-তৌফিজ ব্যবহার করুক), স্ত্রীকে তার দেনমোহরের পুরো টাকা বুঝিয়ে দিতে হবে। শুধুমাত্র ‘খুলা’ তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বেচ্ছায় দেনমোহর মওকুফ করলে স্বামী এই দায় থেকে মুক্ত হন। দেনমোহর না দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা ডিক্রি জারির মাধ্যমে উসুল করতে পারেন এবং টাকা না দিলে স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক হতে পারে।

ঙ. সন্তানের জিম্মাদারি (Child Custody):

তালাকের সাথে সন্তানের জিম্মাদারির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকেই মনে করেন স্ত্রী তালাক দিলে তিনি সন্তান পাবেন না। এটি সম্পূর্ণ ভুল। The Guardians and Wards Act, 1890 অনুযায়ী, তালাকের পরও পুত্র সন্তান ৭ বছর বয়স পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তান বয়ঃসন্ধিকাল (Puberty) পর্যন্ত মায়ের জিম্মায় (Hizanat) থাকার অধিকারী। সন্তানের আইনি অভিভাবক (Natural Guardian) পিতা হলেও, সন্তানের কল্যাণ (Welfare of the minor) বিবেচনা করে আদালত মায়ের কাছেই সন্তানকে রাখার নির্দেশ দেন এবং পিতাকে সন্তানের সমস্ত ভরণপোষণ বহন করতে হয়।

উপসংহার

বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক একটি পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এটি একটি সম্পর্ক, দুটি পরিবার এবং সর্বোপরি সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই তালাকের মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পারিবারিক কাউন্সিলিং, মুরুব্বিদের হস্তক্ষেপ এবং সালিশির মাধ্যমে সম্পর্ক মেরামতের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।

তবে, যখন একত্রে থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বিচ্ছেদই একমাত্র সমাধান হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা অবশ্যই সম্পূর্ণ আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করে অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে সম্পন্ন করা উচিত। আবেগ বা জেদের বশবর্তী হয়ে, অথবা আইনের অজ্ঞতার কারণে নোটিশ প্রদান ও তালাক রেজিস্ট্রির প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলে, তা ভবিষ্যতে একটি সমাধানহীন আইনি জটিলতার জন্ম দেয়, যা মানুষের জীবনকে নরকে পরিণত করতে পারে। তালাক প্রদান, চেয়ারম্যানকে নোটিশ প্রেরণ, ৯০ দিনের অপেক্ষমাণ সময় পালন এবং সবশেষে রেজিস্ট্রির মাধ্যমে তালাকনামা সংগ্রহ করা— এই আইনি ধাপগুলো মেনে চলা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য। প্রয়োজনে সঠিক আইনি পরামর্শের জন্য একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা গ্রহণ করা উচিত, যাতে আইনি অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতের কোনো হয়রানিমূলক পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।

Related Articles

Back to top button