দেনমোহর আইন ও উসুল করার সঠিক নিয়ম: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনি বিশ্লেষণ

ইসলামী আইন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো দেনমোহর বা Dower। বিয়ে একটি দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract), এবং এই চুক্তির একটি অপরিহার্য শর্ত হলো দেনমোহর। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রতীক, যা পরিশোধ করা স্বামীর জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি ও ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা।

আমাদের সমাজে দেনমোহর নিয়ে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন দেনমোহর কেবল তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের সময়ই পরিশোধ করতে হয়, অথবা বাসর রাতে স্ত্রীর কাছ থেকে ‘মাফ’ চেয়ে নিলেই এর দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু আইন ও শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। আজকের এই বিস্তারিত কলামে আমরা বাংলাদেশের পারিবারিক আইন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর আলোকে দেনমোহরের আইনি সংজ্ঞা, এর প্রকারভেদ, তামাদির মেয়াদ এবং আদালত বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেনমোহর উসুল করার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ নিয়ম সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করব।

দেনমোহর (Dower বা Mahr) আসলে কী?

আইনের ভাষায়, দেনমোহর হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা অন্য কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার কারণে স্বামী তার স্ত্রীকে প্রদান করতে আইনত বাধ্য থাকেন। এটি স্ত্রীর একটি নিরঙ্কুশ অধিকার (Absolute Right)। বিখ্যাত মুসলিম আইনজ্ঞ সৈয়দ আমীর আলীর মতে, “দেনমোহর হলো বিয়ের একটি অপরিহার্য শর্ত, যা স্ত্রীর মর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে প্রদান করা হয়।” দেনমোহর কোনোভাবেই কনে-পণ (Bride price) নয়, বরং এটি স্ত্রীর ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার একটি আইনি রক্ষাকবচ। কাবিননামার (নিকাহনামা) ১৩, ১৪, ১৫ এবং ১৬ নম্বর কলামে দেনমোহরের পরিমাণ, পরিশোধের ধরন এবং উসুলের বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

দেনমোহরের আইনি ভিত্তি এবং প্রকারভেদ

বাংলাদেশের Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937 অনুযায়ী মুসলিম বিবাহ ও দেনমোহর শরিয়াহ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আইনি ও ব্যবহারিক দিক থেকে দেনমোহরকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. নির্দিষ্টকৃত দেনমোহর (Specified Dower)

যে দেনমোহরের পরিমাণ বিয়ের সময় বর ও কনে পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করে কাবিননামায় উল্লেখ করা হয়, তাকে নির্দিষ্টকৃত দেনমোহর বলা হয়। পরিশোধের সময়ের ওপর ভিত্তি করে এই নির্দিষ্টকৃত দেনমোহরকে আবার দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:

  • নগদ বা তাৎক্ষণিক দেনমোহর (Prompt Dower / মুয়াজ্জল): এই দেনমোহর বিয়ের সময় সাথে সাথেই পরিশোধ করতে হয়। তবে স্ত্রী চাইলে বিয়ের পরও যেকোনো সময় এই দেনমোহর দাবি করতে পারেন এবং দাবি করা মাত্রই স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য। নগদ দেনমোহর পরিশোধ না করা পর্যন্ত স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে দাম্পত্য জীবন বা সহবাস (Conjugal rights) প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
  • বকেয়া বা বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred Dower / মুয়াজ্জাল): এই দেনমোহর বিয়ের সাথে সাথেই পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণত বিবাহ বিচ্ছেদ (Divorce) ঘটলে অথবা স্বামীর মৃত্যু হলে এই দেনমোহর পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। তবে স্বামী চাইলে তার জীবদ্দশায় যেকোনো সময় এই দেনমোহর পরিশোধ করতে পারেন।

২. প্রথাগত বা উপযুক্ত দেনমোহর (Proper Dower / Mahr-i-Misl)

যদি বিয়ের সময় কাবিননামায় দেনমোহরের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ না থাকে, অথবা শর্ত থাকে যে স্ত্রীকে কোনো দেনমোহর দেওয়া হবে না— তবুও আইন অনুযায়ী স্ত্রী দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী হন। এ ধরনের ক্ষেত্রে স্ত্রীর পিতার বংশের অন্যান্য নারীদের (যেমন- আপন বোন, ফুফু) বিয়ের সময় যে পরিমাণ দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্ত্রীর সৌন্দর্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক মর্যাদা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে আদালত যে দেনমোহর নির্ধারণ করে দেন, তাকে ‘প্রথাগত দেনমোহর’ বা মেহর-ই-মিসল বলা হয়।

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর বিশেষ বিধান

বাংলাদেশে Muslim Family Laws Ordinance, 1961 (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১)-এর Section 10 (ধারা ১০)-এ দেনমোহরের বিষয়ে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, কাবিননামায় যদি দেনমোহরের কত অংশ নগদ (Prompt) এবং কত অংশ বকেয়া তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে (অর্থাৎ কাবিননামার ১৪ নম্বর কলাম যদি ফাঁকা থাকে), তবে আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ দেনমোহরকেই ‘নগদ বা তাৎক্ষণিক দেনমোহর’ (Prompt Dower) হিসেবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ, স্ত্রী চাওয়ামাত্রই স্বামী পুরো টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন।


সঠিক কাবিন ফি এক ক্লিকেই হিসাব করুন

মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। কাজীর কমিশন ও যাতায়াত খরচসহ আপনার দেনমোহরের ভিত্তিতে সরকারি ফি কত আসবে, তা আমাদের ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে সহজেই জেনে নিন।

বিবাহ নিবন্ধন ফি ক্যালকুলেটর ⟶

দেনমোহর কখন এবং কীভাবে প্রদেয় হয়?

দেনমোহর কখন পুরোটা বা অর্ধেক প্রদেয় হবে, তা নির্ভর করে দাম্পত্য সম্পর্ক বা বিবাহ পূর্ণতা (Consummation of Marriage) পাওয়ার ওপর। আইনি বিধানগুলো নিম্নরূপ:

  • বিবাহ পূর্ণতা পাওয়ার আগে বিচ্ছেদ: যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার আগেই (Before consummation) বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, তবে স্ত্রী কাবিননামায় উল্লিখিত মোট দেনমোহরের ঠিক অর্ধেক (Half) পাওয়ার অধিকারী হবেন।
  • বিবাহ পূর্ণতা পাওয়ার পর বিচ্ছেদ: যদি দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেন বা স্ত্রী স্বামীকে ডিভোর্স দেন, তবে স্ত্রী সম্পূর্ণ দেনমোহর (Full Dower) পাওয়ার অধিকারী হবেন।
  • স্বামীর মৃত্যু: দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হোক বা না হোক, স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করতে পারবেন এবং স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তা সবার আগে পরিশোধ করতে হবে।

আদালতের মাধ্যমে দেনমোহর উসুল করার সঠিক আইনি প্রক্রিয়া

স্বামী যদি স্বেচ্ছায় দেনমোহর পরিশোধ না করেন, অথবা বিবাহ বিচ্ছেদের পর দেনমোহরের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে একজন স্ত্রী বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিয়ে খুব সহজেই তার পাওনা উসুল করতে পারেন। এই প্রক্রিয়াটি The Family Courts Ordinance, 1985 (পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫)-এর অধীনে পরিচালিত হয়। নিচে ধাপে ধাপে এর সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া আলোচনা করা হলো:

ধাপ ১: লিগ্যাল নোটিশ বা আইনি বিজ্ঞপ্তি প্রদান

মামলা করার আগে এটি একটি ভদ্রোচিত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ। স্ত্রী তার মনোনীত একজন আইনজীবীর মাধ্যমে স্বামীকে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে পারেন। এই নোটিশে সাধারণত ১৫ বা ৩০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় এবং উল্লেখ করা হয় যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ না করলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনেক সময় এই নোটিশ পাওয়ার পরই স্বামী বা তার পরিবার আপস-মীমাংসায় এসে টাকা পরিশোধ করে দেন, ফলে মামলা করার আর প্রয়োজন হয় না।

ধাপ ২: পারিবারিক আদালতে আরজি (Plaint) দাখিল

লিগ্যাল নোটিশের জবাব না পেলে বা স্বামী টাকা দিতে ব্যর্থ হলে, স্ত্রীকে পারিবারিক আদালত (Family Court)-এ মামলা দায়ের করতে হবে। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের Section 5 (ধারা ৫) অনুযায়ী, দেনমোহর, খোরপোষ, তালাক, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার এবং শিশু সন্তানের অভিভাবকত্ব— এই পাঁচটি বিষয়ে বিচার করার নিরঙ্কুশ এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতিটি জেলার সহকারী জজ আদালতগুলোই (Assistant Judge Court) পারিবারিক আদালত হিসেবে কাজ করে। স্ত্রী যে এলাকায় স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, সেই এলাকার এখতিয়ারাধীন পারিবারিক আদালতে তিনি মামলাটি দায়ের করতে পারবেন। আরজি দাখিলের সময় নামমাত্র কোর্ট ফি (সাধারণত ৩০০ টাকা) জমা দিতে হয়, যা নারীদের আইনি সহায়তা পাওয়ার পথকে সহজ করেছে।

ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং প্রমাণাদি

মামলার আরজির সাথে কিছু অপরিহার্য নথিপত্র সংযুক্ত করতে হয়:

  • কাবিননামা বা নিকাহনামার সার্টিফাইড কপি (এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণ)। (অবশ্যই যাচাই করে নেবেন এটি কোনো ভুয়া কাবিননামা কি না)।
  • স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন সনদ।
  • তালাক হয়ে থাকলে তালাকের নোটিশ বা কাজী অফিসের রেজিস্ট্রি কপি
  • মামলায় সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম থাকবে, তাদের নামের তালিকা।
  • লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলে তার কপি এবং পোস্টাল রসিদ।

ধাপ ৪: সমন জারি (Issuance of Summons)

মামলা দায়ের হওয়ার পর আদালত স্বামীর (বিবাদী) ঠিকানায় সমন বা নোটিশ ইস্যু করেন। সমন পাওয়ার পর নির্দিষ্ট তারিখে স্বামীকে আদালতে হাজির হতে হয় এবং স্ত্রীর দাবির বিপরীতে তার লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিল করতে হয়। স্বামী যদি দাবি করেন যে তিনি ইতিমধ্যে দেনমোহর পরিশোধ করেছেন, তবে তাকে অবশ্যই তার দালিলিক প্রমাণ (যেমন- ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ বা কাবিননামায় উসুলের এন্ট্রি) আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।

ধাপ ৫: বিচারপূর্ব আপস-মীমাংসা (Pre-trial Dispute Resolution)

পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের Section 10-এর অধীনে একটি চমৎকার বিধান রয়েছে। লিখিত জবাব দাখিলের পর আদালত সরাসরি বিচার বা সাক্ষ্যগ্রহণে না গিয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয় পক্ষকে ডেকে একটি আপস-মীমাংসার (ADR – Alternative Dispute Resolution) চেষ্টা করেন। বিচারক নিজে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। যদি এই পর্যায়ে আপস হয়ে যায়, তবে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার আর প্রয়োজন হয় না।

ধাপ ৬: সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা (Trial and Cross-examination)

আপস-মীমাংসা ব্যর্থ হলে মামলার বিচার বা Trial শুরু হয়। এই পর্যায়ে আদালত স্ত্রী (বাদী) এবং তার সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। স্বামীর পক্ষের আইনজীবী তাদের জেরা (Cross-examination) করেন। একইভাবে স্বামী ও তার সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়া হয় এবং স্ত্রীর আইনজীবী তাদের জেরা করেন। কাবিননামার সত্যতা এবং দেনমোহর পরিশোধ না করার বিষয়টি এই পর্যায়ে আইনিভাবে প্রমাণিত হয়।

ধাপ ৭: বিচার-পরবর্তী আপস এবং চূড়ান্ত রায় (Judgment)

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক (Arguments) শোনার পর আদালত রায় ঘোষণার আগে Section 13 অনুযায়ী আবারও শেষবারের মতো আপসের একটি সুযোগ দেন। এতেও কাজ না হলে আদালত চূড়ান্ত রায় বা ডিক্রি (Decree) প্রদান করেন এবং স্বামীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা স্ত্রীর একাউন্টে বা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

ডিক্রি জারির প্রক্রিয়া (Execution of Decree): স্বামী টাকা না দিলে কী হবে?

আদালত রায় দেওয়ার পরও যদি স্বামী অবাধ্যতা করেন এবং টাকা পরিশোধ না করেন, তবে স্ত্রীকে সেই রায় কার্যকর করার জন্য একই আদালতে একটি ‘ডিক্রি জারি’ (Execution Suit) বা জারির মোকদ্দমা দায়ের করতে হয়। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের Section 16 অনুযায়ী, টাকা আদায়ের জন্য আদালত অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন:

  • সম্পত্তি ক্রোক (Attachment of Property): আদালত স্বামীর যেকোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি (জমি, ফ্ল্যাট, ব্যাংক একাউন্ট, গাড়ি) ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারেন। সেই সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ থেকে স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা হয়।
  • দেওয়ানি কারাবাস (Civil Prison): স্বামীর যদি কোনো সম্পত্তি না থাকে বা তিনি যদি সম্পত্তি লুকিয়ে ফেলেন, তবে আদালত স্বামীকে গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ তিন মাসের জন্য দেওয়ানি কারাগারে (Civil Jail) পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, কারাবাস ভোগ করলেও স্বামীর দেনমোহরের দায় বা ঋণ মওকুফ হয়ে যায় না; তাকে টাকা পরিশোধ করতেই হয়।

দেনমোহর আদায়ের তামাদির মেয়াদ (Period of Limitation)

আইনে অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সময়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা বা তামাদি (Limitation) থাকে। The Limitation Act, 1908 (তামাদি আইন, ১৯০৮)-এর বিধান অনুযায়ী দেনমোহর আদায়ের তামাদির মেয়াদ হলো ৩ বছর। তবে এই ৩ বছরের গণনা কখন থেকে শুরু হবে, তা দেনমোহরের প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে:

  • নগদ দেনমোহরের ক্ষেত্রে (Article 103): স্ত্রী যখন নগদ দেনমোহর দাবি করেন এবং স্বামী যখন তা দিতে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান (Refusal), ঠিক সেই অস্বীকৃতির দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে আদালতে মামলা করতে হবে। অথবা, বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর দিন থেকে ৩ বছর গণনা শুরু হবে।
  • বকেয়া দেনমোহরের ক্ষেত্রে (Article 104): বকেয়া দেনমোহরের ক্ষেত্রে দাবি করার বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। এক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার দিন থেকে অথবা স্বামীর মৃত্যুর দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।

নির্ধারিত ৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলাটি ‘Time-barred’ বা তামাদি দোষে দুষ্ট হয়ে যাবে এবং আদালত তা খারিজ করে দেবেন। তাই বিচ্ছেদের পর বা স্বামীর মৃত্যুর পর অযথা সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

দেনমোহর অধিকার রক্ষায় স্ত্রীর বিশেষ আইনি ক্ষমতাসমূহ

আইন দেনমোহরের ব্যাপারে স্ত্রীকে কিছু বিশেষ ও শক্তিশালী অধিকার প্রদান করেছে:

১. দাম্পত্য অধিকার অস্বীকার (Right to Refuse Conjugal Rights)

বিখ্যাত Abu Kadir v. Salima (1886) মামলায় প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, বিয়ের পর স্বামী যদি ‘নগদ দেনমোহর’ (Prompt Dower) পরিশোধ না করেন, তবে স্ত্রী স্বামীর সাথে একত্রে বসবাস করতে বা দাম্পত্য জীবনযাপন করতে আইনত অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। স্বামী যদি স্ত্রীকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আদালতে Restitution of Conjugal Rights (দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার)-এর মামলা করেন, তবে আদালত নির্দেশ দেবেন যে, স্বামী আগে নগদ দেনমোহর পরিশোধ করবেন, তারপর স্ত্রী তার ঘরে যাবেন।

২. বিধবা স্ত্রীর সম্পত্তি আটকে রাখার অধিকার (Widow’s Right of Retention)

স্বামীর মৃত্যুর পর যদি বিধবা স্ত্রীর দেনমোহর অপরিশোধিত থাকে এবং স্বামীর কোনো সম্পত্তি যদি আইনসম্মতভাবে স্ত্রীর দখলে থাকে, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামীর উত্তরাধিকারীরা স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পুরোপুরি পরিশোধ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রী ওই সম্পত্তি নিজের দখলে আটকে রাখতে পারবেন (Maina Bibi v. Chaudhri Vakil Ahmad মামলার নীতি)। একে Right of Retention বলা হয়। তবে তিনি ওই সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না, কেবল নিজের পাওনা আদায় না হওয়া পর্যন্ত দখলে রাখতে পারবেন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সামাজিক জিজ্ঞাসা

১. স্ত্রী ডিভোর্স (খোলা তালাক) দিলে কি দেনমোহর পাবেন?

আমাদের সমাজে একটি ভয়ংকর ভুল ধারণা রয়েছে যে, স্ত্রী নিজে থেকে স্বামীকে তালাক দিলে বা ডিভোর্স দিলে তিনি আর দেনমোহর পান না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। স্ত্রী যদি কাবিননামার ১৮ নং কলামে প্রদত্ত তালাক-ই-তৌফিজ (স্বামীর অর্পিত ক্ষমতা) বলে তালাক প্রদান করেন, তবুও তিনি সম্পূর্ণ দেনমোহর পাবেন। তবে স্ত্রী যদি ‘খুলা’ (Khula) তালাক করেন, অর্থাৎ স্বামীকে প্রস্তাব দেন যে “আমি দেনমোহরের দাবি ছেড়ে দিচ্ছি, তুমি আমাকে তালাক দাও” এবং স্বামী তাতে রাজি হন, কেবল তখনই স্ত্রী দেনমোহর থেকে বঞ্চিত হবেন। অন্যথায়, তালাক যে পক্ষ থেকেই হোক না কেন, দেনমোহর স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার।

২. ‘বাসর রাতে মাফ চাওয়া’ এবং দেনমোহর মওকুফ

প্রায়শই দেখা যায়, বাসর রাতে স্বামী আবেগের বশবর্তী হয়ে বা পরিস্থিতি তৈরি করে স্ত্রীর কাছে দেনমোহর মাফ চেয়ে নেন। আইনের দৃষ্টিতে, কোনো প্রকার মানসিক চাপ, আবেগিক ব্ল্যাকমেইল বা প্রভাব খাটিয়ে (Undue Influence) দেনমোহর মাফ করানো হলে তার কোনো আইনি বৈধতা নেই। স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায়, সুস্থ মস্তিষ্কে এবং কোনো ধরনের চাপ ছাড়া স্বপ্রণোদিত হয়ে দেনমোহর আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করেন, কেবল তখনই তা গ্রহণযোগ্য হবে। তবে বাস্তবে এমন প্রমাণ করা স্বামীর জন্য অত্যন্ত কঠিন।

৩. দেনমোহর এবং যৌতুক কি এক?

না, সম্পূর্ণ বিপরীত। যৌতুক (Dowry) হলো বিয়ের শর্ত হিসেবে বরের পক্ষ থেকে কনের পরিবারের কাছে দাবি করা অর্থ বা সম্পদ, যা যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী একটি আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। অন্যদিকে, দেনমোহর (Dower) হলো বরের পক্ষ থেকে কনেকে দেওয়া আইনসম্মত অর্থ, যা স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। যৌতুক নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, আর দেনমোহর না দেওয়া আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

৪. স্বামীর মৃত্যুর পর দেনমোহর কে দেবে?

স্বামীর মৃত্যু হলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বা সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করার আগেই তিনটি কাজ করা বাধ্যতামূলক: ১. মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের খরচ মেটানো, ২. মৃত ব্যক্তির কোনো ঋণ থাকলে তা শোধ করা, এবং ৩. স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহর পরিশোধ করা। অর্থাৎ, দেনমোহর হলো স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদের ওপর একটি Unsecured Debt (অনিশ্চিত ঋণ)। স্বামীর সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও আগে স্ত্রীর দেনমোহর দিতে হবে, তারপর বাকি সম্পত্তি স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করা হবে।

উপসংহার

দেনমোহর কোনো অনুগ্রহ, উপহার বা ভিক্ষা নয়; এটি একজন স্ত্রীর জন্য আইনি এবং ধর্মীয়ভাবে নিশ্চিত করা একটি অধিকার। বাংলাদেশের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এবং এর বিচারিক প্রক্রিয়া নারীদের এই অধিকার আদায়ের পথকে অনেক সহজ, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী করেছে। দেনমোহরের মূল উদ্দেশ্য হলো বিবাহিত জীবনে নারীর সম্মান বজায় রাখা এবং বিবাহ বিচ্ছেদ বা স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে নারীকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা।

তাই, দেনমোহর নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিয়ের সময় এমন কোনো কাল্পনিক বা আকাশচুম্বী দেনমোহর নির্ধারণ করা উচিত নয়, যা স্বামীর পরিশোধ করার সাধ্য নেই। বরং সাধ্যের মধ্যে একটি সম্মানজনক দেনমোহর নির্ধারণ করা এবং তা যথাসময়ে পরিশোধ করাই হলো আইন এবং ধর্মের প্রকৃত স্পিরিট। আর যদি অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়, তবে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো (Legal Framework) পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে সেই অধিকার ফিরিয়ে আনতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।

Related Articles

Back to top button