এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারায় চেকের স্বাক্ষর অস্বীকার ও হস্তরেখা বিশারদের মতামত: সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
আইনি সারসংক্ষেপ: চেকে স্বাক্ষরের সত্যতা নিরূপণ ও আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা
নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act), ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার মামলায় আসামি যদি নিছক বিচার বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে চেকের স্বাক্ষর অস্বীকার করে হস্তরেখা বিশারদ (Handwriting Expert) দিয়ে পরীক্ষা করানোর আবেদন করে, তবে আদালত তা গ্রহণ করতে বাধ্য নন। সাক্ষ্য আইন (Evidence Act), ১৮৭২-এর ৭৩ ধারা অনুযায়ী বিজ্ঞ বিচারক নিজেই নথিতে রক্ষিত আসামির স্বীকৃত বা নমুনা স্বাক্ষরের সাথে চেকে থাকা স্বাক্ষরের তুলনা করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন। তদুপরি ব্যাংক যদি স্বাক্ষরের অমিলের কারণে নয়, বরং “তহবিল অপ্রতুল” মর্মে চেক ফেরত দেয়, তবে ধরে নিতে হবে ব্যাংকের নথিতে থাকা নমুনা স্বাক্ষরের সাথে চেকের স্বাক্ষর মিলে গিয়েছিল।
১. মামলার প্রাথমিক তথ্য ও বেঞ্চ
মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ক্রিমিনাল রিভিশনাল জুরিসডিকশনে একক বেঞ্চে শুনানি গ্রহণ ও চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন মাননীয় বিচারপতি মো. সেলিম (Mr. Justice Md. Salim)। দায়রা জজ আদালত কর্তৃক ১৩৮ ধারায় ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও চেকে উল্লেখিত মোট সমপরিমাণ অর্থ জরিমানার আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯ ধারায় রিভিশন পিটিশন দাখিল করেছিলেন সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. ফজল হাসান।
২. বিরোধের মূল পটভূমি
বাদী ও আসামির মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেনের দেনা বাবদ আসামি মো. ফজল হাসান বাদীর অনুকূলে তার ব্যাংক হিসাবের চেক প্রদান করেন। চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে একাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় “Insufficient Funds” মেমো দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়। লিগ্যাল নোটিশ জারির পর মামলা হলে আসামি আদালতে দাবি করেন যে চেকে তিনি স্বাক্ষর করেননি, চেকটি হারিয়ে গিয়েছিল। আসামি হস্তরেখা বিশেষজ্ঞ দিয়ে স্বাক্ষর পরীক্ষার আবেদন জানালে বিচারিক আদালত ব্যাংক মেমো ও সাক্ষ্য পর্যালোচনায় তা খারিজ করে সাজা প্রদান করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি নীতি
মাননীয় বিচারপতি মো. সেলিম রায়ে উল্লেখ করেন যে, ব্যাংক কর্মকর্তা যখন চেকটি ডিজঅনার করেন, তখন তিনি “Signature Differs” লেখেননি, বরং “Insufficient Fund” লিখেছেন। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গ্রাহকের নমুনা স্বাক্ষরের সাথে মিলিয়ে দেখার পরই কেবল তহবিল ঘাটতির মেমো ইস্যু করেন। তাছাড়া চেক হারানোর বিষয়ে আসামি থানায় কোনো জিডি করেননি বা ব্যাংকে “Stop Payment” নির্দেশনা দেননি। সুতরাং কেবল মামলা দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে হস্তরেখা বিশারদের মতামত চাওয়ার আবেদন আদালত নাকচ করে দিয়ে কোনো আইনি ভুল করেননি।
৪. চূড়ান্ত রায় ও আদেশ
মহামান্য হাইকোর্ট রিভিশন আবেদনটি খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের ঘোষিত ১ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ বহাল রাখেন। আসামিকে অবিলম্বে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
৫. নাগরিক ও আইনজীবীদের জন্য পরামর্শ
- চেক হারালে দ্রুত পদক্ষেপ: কোনো চেক হারিয়ে গেলে কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ থানায় জিডি করুন এবং ব্যাংকে লিখিতভাবে “Stop Payment” আবেদন দিন।
- স্বাক্ষর অস্বীকারের ভিত্তি: কেবল মৌখিকভাবে স্বাক্ষর অস্বীকার করলেই চলবে না; উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের তলব করে জেরা করতে হবে।
- ব্যাংক মেমোর গুরুত্ব: মেমোতে ডিজঅনারের কারণ কী লেখা হয়েছে তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করুন।
৬. অফিসিয়াল তথ্য ও রেফারেন্স
| মামলা নম্বর | Criminal Revision No. 1554 of 2018 |
| বিচারপতি | Mr. Justice Md. Salim |
| আইন ও ধারা | Negotiable Instruments Act, 1881 Sec 138, 118; Evidence Act Sec 73; CrPC Sec 439 |
| অফিশিয়াল কপি | সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট থেকে মূল রায় (PDF) ডাউনলোড করুন |
