সনদ জমা না দিয়ে অন্য পেশা ও ব্যবসায় যুক্ত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ সমর্পণ না করেই অন্য পেশা, চাকরি ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া সোমবার (২৬ অক্টোবর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট আবেদনটি দাখিল করেন।

এর আগে দ্বৈত পেশায় জড়িত এবং আইন পেশায় সক্রিয় না থাকা (নন-প্র্যাকটিসিং) আইনজীবীদের চিহ্নিত করা, তাঁদের প্র্যাকটিসিং লাইসেন্স বা ওকালতির সনদ বাতিল এবং এ সংক্রান্ত পূর্বের আবেদন নিষ্পত্তির অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও আইন মন্ত্রণালয়কে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন এই আইনজীবী। নোটিশের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় তিনি রিটটি দায়ের করেন।

আইনি নোটিশের বিস্তারিত অভিযোগ ও প্রেক্ষাপট

আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ওকালতি একটি অত্যন্ত মহান, স্বাধীন ও সম্মানজনক পেশা। কিন্তু বার কাউন্সিল থেকে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে আইনচর্চা না করেও নিয়মিত ‘অ্যাডভোকেট’ পদবি ব্যবহার করে যাচ্ছেন। এমনকি তাঁদের অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের লাভজনক ব্যবসা, চাকরি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত রয়েছেন বলে নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে।

নোটিশে আইনজীবীদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার বিবরণ দিয়ে বলা হয়, সনদপ্রাপ্ত অনেক ব্যক্তি আইন পেশা ছেড়ে কার শোরুম পরিচালনা, ইট-বালু-সিমেন্ট সরবরাহ, ম্যানপাওয়ার ও দালালি ব্যবসা, ঠিকাদারি এবং পরিবহন ব্যবসার মতো পেশায় যুক্ত রয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ মোবাইল রিচার্জ বা ফ্লেক্সিলোড এবং বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) দোকান পরিচালনা করছেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া সনদ সমর্পণ না করে স্থায়ীভাবে বিদেশে অবস্থান করা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা ও করপোরেট সংস্থায় পূর্ণকালীন কিংবা খণ্ডকালীন চাকরি করার অভিযোগও নোটিশে আনা হয়েছে।

আইন ও পেশাগত নীতিমালার লঙ্ঘন

রিটকারী আইনজীবী তাঁর আবেদনে ‘দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২’-এর ৭০ অনুচ্ছেদ এবং পেশাগত আচরণবিধির ‘ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট’-এর অধ্যায়-৪, রুল ৮-এর বিধানের কথা তুলে ধরেন। এসব বিধিমালার আলোকে তিনি উল্লেখ করেন, একজন তালিকাভুক্ত সক্রিয় আইনজীবী হিসেবে বহাল থাকা অবস্থায় কোনো বাণিজ্যিক ব্যবসা বা লাভজনক পেশায় নিজেকে যুক্ত রাখা সুস্পষ্টভাবে পেশাগত আচরণবিধি এবং নৈতিকতার পরিপন্থী।

এ ছাড়া আবেদনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২০(১), ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচারিক নজির হিসেবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ‘ডা. হনিরাজ এল. চূলানি বনাম বার কাউন্সিল অব মহারাষ্ট্র অ্যান্ড গোয়া’ (Dr. Haniraj L. Chulani v. Bar Council of Maharashtra & Goa) মামলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড (BSB) এবং আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের (ABA) প্রাসঙ্গিক নীতিমালার উদাহরণও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

পূর্ববর্তী আবেদন ও রিট দায়েরের কারণ

নোটিশদাতা আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া জানান, দ্বৈত পেশায় নিয়োজিত এসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি এর আগেও একাধিকবার প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চেষ্টা করেছিলেন। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে পৃথক দুটি লিখিত আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে বার কাউন্সিল ও আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাবরে পাঠানো আইনি নোটিশে পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কয়েকটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল—

  • আইন পেশার বাইরে অন্য কোনো লাভজনক পেশা ও ব্যবসায় জড়িত থাকা আইনজীবীদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি বা ভিজিল্যান্স কমিটি গঠন করা।
  • দেশের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে নন-প্র্যাকটিসিং আইনজীবীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় সনদ সমর্পণ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া।
  • নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সনদ সমর্পণ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  • ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি দাখিল করা আগের আবেদনটি অনতিবিলম্বে নিষ্পত্তি করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্র্যাকটিসিং লাইসেন্স বাতিলের কার্যক্রম শুরু করা।

নোটিশে আরও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যে, বেঁধে দেওয়া পাঁচ দিনের মধ্যে যদি যথাযথ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে হাইকোর্টে প্রতিকার চেয়ে রিট দায়ের করা হবে। নোটিশের মেয়াদ পূর্ণ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া না পাওয়ায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী হাইকোর্টে এই রিট পিটিশনটি দায়ের করা হলো।

Related Articles

Back to top button