সৃজনশীল প্রশ্নঃ ২০১১ দেওয়ানি কার্যবিধি

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১১: দেওয়ানী কার্যবিধি

সৃজনশীল সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন: ১০.০৩.২০১১ তারিখে ‘A’ নালিশী সম্পত্তির স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল উদ্ধারের জন্য ঢাকার প্রথম সহকারী জজ আদালতে ‘B’ এর বিরুদ্ধে দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ১৫/২০১১ রুজু করেন। কিন্তু আদালত দেখেন যে, আরজিতে যে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে, তার তায়দাদ (Valuation) কম দেখানো হয়েছে। ফলে আদালত ৩১.০৩.২০১১ তারিখের মধ্যে তায়দাদ সংশোধন করার নির্দেশ দেন। বাদী আদালতের নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে আদালত ০৭.০৪.২০১১ তারিখের এক আদেশে আরজি প্রত্যাখ্যান বা খারিজ করেন। এই পরিস্থিতিতে বাদীর জন্য কি কি আইনি প্রতিকার বিদ্যমান? বিস্তারিত পর্যালোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. ঘটনার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা ও আদালতের আদেশের আইনি চরিত্র

আলোচ্য সমস্যাটিতে বাদী ‘A’ একটি স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল উদ্ধারের মোকদ্দমা দায়ের করে আরজিতে কম তায়দাদ (Undervaluation) প্রদর্শন করেন। আদালত দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১(খ) বিধি অনুযায়ী বাদীর আরজির তায়দাদ সংশোধনের জন্য ৩১.০৩.২০১১ তারিখ পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দেন। বাদী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সংশোধন করতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত ০৭.০৪.২০১১ তারিখে আরজি প্রত্যাখ্যান করেন।

আইনের দৃষ্টিতে আদালতের এই আদেশটি হলো দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭, বিধি ১১(খ) (Order VII, Rule 11(b)) অনুসারে আরজি প্রত্যাখ্যান (Rejection of Plaint)। দেওয়ানী কার্যবিধির ধারা ২(২) অনুযায়ী আরজি প্রত্যাখ্যানের আদেশ স্পষ্টতই একটি অনুমানমূলক ডিক্রি (Deemed Decree) হিসেবে গণ্য।

২. বাদীর জন্য বিদ্যমান আইনগত প্রতিকারসমূহ (Available Remedies)

বাদীর মোকদ্দমা গুণাগুণের ভিত্তিতে (on merits) নিষ্পত্তি না হওয়ায় এবং আরজি প্রত্যাখ্যান একটি ডিক্রি হওয়ায়, বাদীর জন্য আরজি প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে প্রতিকার হিসেবে নিম্নলিখিত ৪টি অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি পথ উন্মুক্ত রয়েছে:

(১) একই কারণের ওপর নতুন মোকদ্দমা দায়ের (Filing a Fresh Suit – Order VII, Rule 13 CPC)

দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ৭, বিধি ১৩ অনুযায়ী:

“৭ আদেশের ১১ বিধিতে বর্ণিত কোনো কারণে আরজি প্রত্যাখ্যান হইলে তাহা বাদীকে একই কারণের (Same cause of action) ভিত্তিতে নতুন মোকদ্দমা দায়ের করিতে স্বতঃসিদ্ধভাবে বাধা প্রদান করিবে না।”

  • প্রয়োগ ও শর্ত: বাদী ‘A’ তামাদি আইনের মেয়াদ বহাল থাকা সাপেক্ষে বিরোধীয় সম্পত্তির সঠিক তায়দাদ নির্ধারণপূর্বক এবং যথাযথ কোর্ট ফি পরিশোধ করে একই আদালতে একটি সম্পূর্ণ নতুন আরজি দাখিল করে মোকদ্দমা রুজু করতে পারেন।
  • সুবিধা: এতে কোনো উচ্চ আদালতের অনুমোদন বা দীর্ঘ শুনানির ঝামেলা নেই; যদি ১২ বছরের মূল তামাদির মেয়াদ শেষ না হয়ে থাকে তবে এটি বাদীর জন্য দ্রুততম ও সর্বোত্তম প্রতিকার।

(২) প্রথম আপিল দায়ের (Filing First Appeal – Section 96 Read with Order XLI)

যেহেতু দেওয়ানী কার্যবিধির ২(২) ধারা অনুযায়ী আরজি প্রত্যাখ্যান একটি ডিক্রী, সেহেতু কার্যবিধির ৯৬ ধারা এবং ৪১ আদেশ অনুযায়ী বাদী উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি উপযুক্ত জেলা জজ আদালতে প্রথম আপিল (Regular Civil Appeal) দায়ের করতে পারেন।

  • আপিলের যুক্তি: বাদী আপিলে যুক্তি প্রদর্শন করতে পারেন যে, ৩১.০৩.২০১১ তারিখের মধ্যে তায়দাদ সংশোধন করতে না পারার পেছনে তার গুরুতর অসুস্থতা বা অনিবার্য কারণ বিদ্যমান ছিল এবং আদালত তার বক্তব্য না শুনেই একতরফাভাবে আরজি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
  • আদালতের ক্ষমতা: আপিল আদালত সন্তুষ্ট হলে সহকারী জজের আদেশ রদ করে বাদীকে তায়দাদ সংশোধনের অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করে মোকদ্দমাটি রিমান্ডে পাঠাতে পারেন।

(৩) সময় বৃদ্ধির আবেদন (Enlargement of Time – Section 148 CPC)

দেওয়ানী কার্যবিধির ১৪৮ ধারা অনুযায়ী আদালত কর্তৃক কোনো কাজের জন্য নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আদালত স্ববিবেচনায় সেই মেয়াদ বর্ধিত করতে পারেন। বাদী যদি ০৭.০৪.২০১১ তারিখে আদেশ ঘোষণার অব্যবহিত পরেই উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে বিলম্বের কৈফিয়তসহ সময় বৃদ্ধির দরখাস্ত দাখিল করেন, তবে আদালত আরজি পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন।

(৪) রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ (Review – Section 114 Read with Order XLVII)

যদি আদেশের নথিতে প্রকাশ্য কোনো ভুল (Error apparent on the face of the record) থাকে অথবা বাদী এমন কোনো নতুন সাক্ষ্যপ্রমাণ আবিষ্কার করেন যা ইতিপূর্বে তার জানা ছিল না, তবে উক্ত সহকারী জজ আদালতেই রিভিউ দরখাস্ত দাখিল করা যায়।

৩. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • আব্দুল লতিফ বনাম মেসার্স জনতা ট্রেডার্স (46 DLR (AD) 130): সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, আরজি প্রত্যাখ্যানের আদেশ একটি ডিক্রি। সংক্ষুব্ধ বাদী চাইলে ৯৬ ধারায় আপিল করতে পারেন অথবা তামাদি থাকলে ৭ আদেশের ১৩ বিধি অনুযায়ী নতুন মামলা করতে পারেন; দুটি পথই সমভাবে উন্মুক্ত।
  • সিদ্দিকুর রহমান বনাম মোজাম্মেল হক (39 DLR 212): কোর্ট ফি বা তায়দাদ কম থাকার কারণে আরজি সরাসরি খারিজের পূর্বে বাদীকে যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান আদালতের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব।

৪. পরীক্ষার্থীর সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও উপসংহার

পরিশেষে, একজন বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে বাদী ‘A’-কে পরামর্শ দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে যে—যদি স্বত্ব ঘোষণার মূল মোকদ্দমার তামাদির মেয়াদ (১২ বছর) ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত না হয়ে থাকে, তবে আদেশ ৭, বিধি ১৩ অনুযায়ী অবিলম্বে সঠিক তায়দাদ ও কোর্ট ফি দিয়ে নতুন মোকদ্দমা (Fresh Suit) দায়ের করাই সর্বাধিক বাস্তবসম্মত ও দ্রুত ফলপ্রসূ প্রতিকার। আর যদি তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার উপক্রম থাকে, তবে অবিলম্বে ধারা ৯৬ অনুযায়ী ডিক্রির বিরুদ্ধে প্রথম আপিল দায়ের করতে হবে।

৪.১. আরজি প্রত্যাখ্যান বনাম প্লিডিংস সংশোধনের বিচারিক সমন্বয়

দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ নিয়ম এবং ৬ আদেশের ১৭ নিয়মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:

  • ৭ আদেশের ১১ নিয়ম: মামলার কার্যকারণ না থাকলে (No Cause of Action), মূল্যায়ন কম দেখালে বা আইন দ্বারা বারিত হলে আরজি প্রত্যাখ্যান হয়; তবে এটি নতুন মামলায় বাধা নয় (নিয়ম ১৩);
  • ৬ আদেশের ১৭ নিয়ম: আরজির কোনো ভুল সংশোধনের মাধ্যমে যদি বিরোধের প্রকৃত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়, তবে আদালত আরজি প্রত্যাখ্যান না করে পক্ষকে সংশোধনের সুযোগ দেবেন;
  • সুপ্রিম কোর্ট (আমির হোসেন বনাম মমতাজ, 44 DLR 170) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, আরজি প্রত্যাখ্যানের পূর্বে বাদীকে আরজি সংশোধনের যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান ন্যায়বিচারের মূল সুর।

আইনি সিদ্ধান্ত: সুতরাং, দেওয়ানি আদালত বিচার প্রক্রিয়ায় আরজি প্রত্যাখ্যানের চরম পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে সংশোধনের আইনি সুযোগ নিশ্চিত করবেন।

Related Articles

Back to top button