দেওয়ানি কার্যবিধির ১ আদেশ ১০ বিধিতে পক্ষ কর্তন ও সংযোজন এবং আবশ্যকীয় বনাম উপযুক্ত পক্ষ | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
প্রশ্ন ১। (ক): দেওয়ানি কার্যবিধির ১ আদেশ ১০ বিধিতে পক্ষ কর্তন ও সংযোজন এবং আবশ্যকীয় বনাম উপযুক্ত পক্ষ | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্য হলো বিরোধীয় বিষয়ের চূড়ান্ত ও কার্যকর নিষ্পত্তি সাধন করা যাতে একই বিষয়ে একাধিক মামলার উদ্ভব না ঘটে (Multiplicity of proceedings)। মোকদ্দমায় কাদের পক্ষ করা বাধ্যতামূলক এবং কাদের উপস্থিতি সুবিচারের স্বার্থে প্রয়োজন—তা নির্ধারণ দেওয়ানী বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রাথমিক শর্ত। অত্র প্রশ্নে দেওয়ানী কার্যবিধির ১ আদেশের ১০(২) বিধির অধীনে আদালতের পক্ষভুক্তকরণের স্বেচ্ছাধীন ও অন্তর্নিহিত ক্ষমতা, ‘আবশ্যকীয় পক্ষ’ বনাম ‘উপযুক্ত পক্ষ’-এর সূক্ষ্ম আইনি সীমারেখা, এবং পক্ষগণের পারস্পরিক স্থানান্তরণ (Transposition) সংক্রান্ত নীতিমালা পরীক্ষা করা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order I, Rule 10(2) এ আদালত কর্তৃক পক্ষ সংযোজন বা কর্তনের ক্ষমতা বিধিবদ্ধ রয়েছে:
“The Court may at any stage of the proceedings, either upon or without the application of either party, and on such terms as may appear to the Court to be just, order that the name of any party improperly joined, whether as plaintiff or defendant, be struck out, and that the name of any person who ought to have been joined, whether as plaintiff or defendant, or whose presence before the Court may be necessary in order to enable the Court effectually and completely to adjudicate upon and settle all the questions involved in the suit, be added.”
এছাড়া Order I, Rule 9 (Misjoinder ও Non-joinder), Order I, Rule 10(1) (ভুল বাদীর ক্ষেত্রে সংশোধন), এবং Order XXIII, Rule 1A (পক্ষগণের স্থানান্তরণ) অত্র বিষয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা
ক. আদালতের পক্ষ সংযোজন ও কর্তনের ক্ষমতা (Order I, Rule 10(2))
১ আদেশের ১০(২) বিধি আদালতকে অত্যন্ত সুবিশাল ও বিবেচনাধীন ক্ষমতা প্রদান করেছে:
- যেকোনো পর্যায়ে (At any stage): মামলা দায়েরের পর থেকে শুরু করে ডিক্রি জারির পূর্ব পর্যন্ত এমনকি আপিল ও রিভিশন পর্যায়েও পক্ষ সংযোজন বা কর্তন করা যায়।
- আবেদন সাপেক্ষে বা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (Upon or without application): বাদী বা বিবাদীর দরখাস্তের ভিত্তিতে কিংবা আদালত সুবিচারের স্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়ে (Suo motu) যে কাউকে পক্ষভুক্ত করতে পারেন।
- ভুল পক্ষ কর্তন (Striking out): যে ব্যক্তিকে অযথা বা ভুলবশত পক্ষ করা হয়েছে যার উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয়, তার নাম বাদ দেওয়া যায়।
- প্রয়োজনীয় পক্ষ সংযোজন (Adding parties): যাকে মামলায় পক্ষ করা সংবিধিবদ্ধভাবে উচিত ছিল অথবা যার উপস্থিতি ছাড়া মামলার বিরোধীয় বিষয়ের সম্পূর্ণ ও কার্যকর নিষ্পত্তি অসম্ভব, তাকে পক্ষভুক্ত করা যায়।
- সীমাবদ্ধতা: বাদীর অনিচ্ছায় কাউকে জোরপূর্বক ‘বাদী’ হিসেবে যুক্ত করা যায় না (তাকে বিবাদী হিসেবে পক্ষভুক্ত করা যায়)। নতুন বিবাদী যুক্ত হলে আরজি সংশোধন করতে হবে এবং নতুন সমন জারি করতে হবে (Order I, Rule 10(4))।
খ. ‘আবশ্যকীয় পক্ষ’ (Necessary Party) বনাম ‘উপযুক্ত পক্ষ’ (Proper Party) এর পার্থক্য
| পার্থক্যসূচক বিষয় | আবশ্যকীয় পক্ষ (Necessary Party) | উপযুক্ত পক্ষ (Proper Party) |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা | যাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার দাবি করা হয়েছে এবং যাঁর উপস্থিতি ছাড়া আদালত কোনো কার্যকর ডিক্রি দিতে পারেন না। | যাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো প্রতিকার দাবি করা হয়নি, কিন্তু যাঁর উপস্থিতিতে আদালত বিরোধের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারেন। |
| ২. মামলার পরিণাম | আবশ্যকীয় পক্ষকে পক্ষভুক্ত না করলে মোকদ্দমা সরাসরি খারিজ (Fatal to the suit) হতে পারে (Order I, Rule 9 Proviso)। | উপযুক্ত পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত না করলে মামলা সরাসরি খারিজ হয় না, তবে পরবর্তীতে মামলা বিলম্বিত হতে পারে। |
| ৩. উদাহরণ | বাটোয়ারা মামলায় সকল সহ-অংশীদার; চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরকরণ মামলায় চুক্তিবদ্ধ পক্ষ। | ভাড়াটিয়া কর্তৃক উচ্ছেদ মামলায় উপ-ভাড়াটিয়া (Sub-tenant); বাটোয়ারা মামলায় বন্ধকগ্রহীতা। |
গ. পক্ষগণের স্থানান্তরণ (Transposition of Parties)
দেওয়ানি কার্যবিধিতে এক পক্ষের অবস্থান পরিবর্তন করে অন্য পক্ষে রূপান্তর করাকে Transposition বলা হয়। যেমন বিবাদীকে বাদী করা কিংবা বাদীকে বিবাদী করা। এটি সাধারণত ঘটে থাকে:
- যদি মূল বাদী মামলা প্রত্যাহার বা পরিত্যাগ করতে চান (Order XXIII, Rule 1A), অথচ বিবাদীর কোনো অংশীদারি বা প্রত্যক্ষ স্বার্থ মোকদ্দমায় বিদ্যমান থাকে। যেমন বাটোয়ারা বা হিসাবের মামলায় প্রতি বিবাদীও কার্যত একজন বাদী।
- যদি বাদীদের মধ্যে কোনো একজন মামলা পরিচালনায় অসহযোগিতা বা শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করেন, তবে তাকে বাদী শ্রেণি থেকে কর্তন করে বিবাদী শ্রেণিতে স্থানান্তর করা যায়।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. মোঃ ইসমাইল বনাম আব্দুল মান্নান (42 DLR 408): সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেন যে, Order I, Rule 10(2) এর মূল লক্ষ্য হলো একই বিষয়ে বিচার প্রক্রিয়ার বহুত্ব (multiplicity of proceedings) রোধ করা এবং মূল বিরোধটি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা।
২. রাজিয়া বেগম বনাম আনোয়ার বেগম (AIR 1958 SC 886): সম্পত্তিতে প্রত্যক্ষ ও বাস্তব আইনি স্বার্থ (direct and legal interest) থাকলেই কেবল কাউকে পক্ষভুক্ত করা আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক, দূরবর্তী বা কাল্পনিক স্বার্থের ভিত্তিতে নয়।
৩. कবির আহমেদ বনাম মুহাম্মদ আলী (50 DLR 142): বাটোয়ারা মোকদ্দমায় কোনো বিবাদীকে বাদী হিসেবে এবং বাদীকে বিবাদী হিসেবে স্থানান্তর (Transposition) করতে আদালতের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে, কারণ বাটোয়ারা মোকদ্দমায় প্রত্যেকেই সমান অংশীদার।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
দেওয়ানি কার্যবিধির ১ আদেশের ১০(২) বিধি এবং ২৩ আদেশের ১ক বিধি হলো আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এমন এক সুরক্ষাকবচ, যা নিছক পদ্ধতিগত ভুলের কারণে কোনো পক্ষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং মূল বিরোধ যেন একবারেই চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হতে পারে তা নিশ্চিত করে।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৫-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।

