দেওয়ানি আরজির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ (Order 7 Rule 1) ও মুসাবিদার নীতিমালা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
প্রশ্ন ২। (ক): দেওয়ানি আরজির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ (Order 7 Rule 1) ও মুসাবিদার নীতিমালা | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৫
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
দেওয়ানী মোকদ্দমার সূচনা ঘটে আরজি (Plaint) দাখিলের মাধ্যমে (Section 26 ও Order IV Rule 1)। একটি যথার্থ ও আইনসম্মত আরজি দেওয়ানী বিচার প্রক্রিয়ার মেরুদণ্ডস্বরূপ। আরজিতে কোনো উপাদানগত তথ্য বাদ পড়লে পরবর্তীতে বিচারিক শুনানীতে তা সংশোধন বা প্রতিস্থাপন করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। অত্র প্রশ্নে দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১ বিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী অনুযায়ী একটি আরজিতে কোন কোন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা সংবিধিবদ্ধভাবে বাধ্যতামূলক তা পরীক্ষা করা হয়েছে।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order VII, Rule 1 এ আরজির আবশ্যিক উপাদানসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত রয়েছে:
“The plaint shall contain the following particulars:—
(a) the name of the Court in which the suit is brought;
(b) the name, description and place of residence of the plaintiff;
(c) the name, description and place of residence of the defendant, so far as they can be ascertained;
(d) where the plaintiff or the defendant is a minor or a person of unsound mind, a statement to that effect;
(e) the facts constituting the cause of action and when it arose;
(f) the facts showing that the Court has jurisdiction;
(g) the relief which the plaintiff claims;
(h) where the plaintiff has allowed a set-off or relinquished a portion of his claim, the amount so allowed or relinquished; and
(i) a statement of the value of the subject-matter of the suit for the purposes of jurisdiction and of court-fees, so far as the case admits.”
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা
আরজিতে অন্তর্ভুক্তব্য আবশ্যকীয় উপাদানসমূহের বিশদ বিশ্লেষণ
- ১. আদালতের নাম (Name of the Court): আরজির একেবারে শীর্ষে যে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের করা হচ্ছে তার পূর্ণ পদবি ও স্থান উল্লেখ করতে হবে (যেমন: বিজ্ঞ ১ম সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, ঢাকা)।
- ২. বাদীর বিবরণ (Particulars of Plaintiff): বাদীর নাম, পিতার/স্বামীর নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, বয়স ও জাতীয়তা সুস্পষ্টভাবে দিতে হবে। একাধিক বাদী থাকলে প্রত্যেকের বিবরণ দিতে হবে।
- ৩. বিবাদীর বিবরণ (Particulars of Defendant): যতদূর অনুসন্ধান করে জানা যায় বিবাদীর নাম, পিতার নাম ও পূর্ণ সঠিক ঠিকানা দিতে হবে যাতে সমন কার্যকরভাবে জারি করা সম্ভব হয়।
- ৪. বিশেষ আইনি মর্যাদা (Minority or Unsoundness): বাদী বা বিবাদী নাবালক বা অপ্রকৃতিস্থ হলে আরজিতে তা স্পষ্ট উল্লেখ করে উপযুক্ত অভিভাবক (Next friend বা Guardian ad litem) নিয়োগের বিবরণ থাকতে হবে (Order XXXII)।
- ৫. মোকদ্দমার কারণ ও উদ্ভবের সময় (Cause of Action & When it Arose): এটি আরজির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ (Heart of the Plaint)। কোন কোন তথ্যের ভিত্তিতে বাদীর আইনি অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং ঠিক কোন তারিখে, সময়ে ও স্থানে মোকদ্দমার কারণ সৃষ্টি হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে লিখতে হবে। মোকদ্দমার কারণ প্রকাশ না পেলে আরজি সরাসরি খারিজ হবে (Order VII, Rule 11(a))।
- ৬. আদালতের এখতিয়ার সংক্রান্ত তথ্য (Facts Showing Jurisdiction): স্থানীয় এখতিয়ার (Territorial) এবং আর্থিক এখতিয়ার (Pecuniary) যে আদালতের রয়েছে তা প্রমাণ করার জন্য ঘটনার স্থান এবং সম্পত্তির মূল্য নির্দেশ করতে হবে।
- ৭. প্রার্থিত প্রতিকার (Relief Claimed – Order VII, Rule 7): বাদী আদালতের নিকট সুনির্দিষ্টভাবে কী চান—স্বত্ব ঘোষণা, দখল পুনরুদ্ধার, চিরতরে নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি স্পষ্টভাবে প্যারাগ্রাফ আকারে লিখতে হবে। এছাড়া সাধারণ প্রতিকার হিসেবে ‘অন্যান্য প্রতিকার ও মোকদ্দমার খরচা’ প্রার্থনা করতে হবে।
- ৮. মোকদ্দমার মূল্যায়ন ও কোর্ট ফি (Valuation & Court-fees): The Court-fees Act, 1870 এবং Suits Valuation Act, 1887 অনুযায়ী মোকদ্দমার মূল্যায়ন এবং প্রদত্ত কোর্ট ফি সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে।
- ৯. স্থাবর সম্পত্তির তফসিল ও চৌহদ্দি (Schedule & Boundaries – Order VII, Rule 3): মামলাটি স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত হলে আরজির শেষে মৌজা, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের সুস্পষ্ট চৌহদ্দি সম্বলিত তফসিল দিতে হবে।
- ১০. সত্যপাঠ ও বাদীর স্বাক্ষর (Verification & Signature – Order VI, Rules 14-15): আরজির সমাপ্তিতে বাদী নিজে বা উপযুক্ত ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্বাক্ষর করবেন এবং কোন কোন প্যারাগ্রাফ নিজের জ্ঞানে সত্য এবং কোনগুলো তথ্য ও বিশ্বাসমতে সত্য তা ঘোষণা করে সত্যপাঠ সম্পাদন করতে হবে।
৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স
১. আব্দুস সাত্তার বনাম আব্দুর রহমান (45 DLR 115): আরজিতে যদি মোকদ্দমার কারণ (Cause of Action) এবং তা উদ্ভবের তারিখ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধি অনুযায়ী আরজি বাতিলযোগ্য।
২. হাজী মফিজুর রহমান বনাম আব্দুল জলিল (46 DLR 212): আরজিতে কেবল উপাদানগত তথ্য (Material facts) সংক্ষেপে লিখতে হবে, কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ বা আইনি যুক্তি আরজিতে সন্নিবেশিত করা যাবে না (Order VI, Rule 2)।
৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত
দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ আদেশের বিধান মেনে নিখুঁতভাবে আরজি প্রণয়ন করা দেওয়ানি প্র্যাকটিসের অন্যতম মৌলিক দক্ষতা। একটি সঠিক আরজি বাদীকে তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার অর্জনের পথ সুগম করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থেকে মুক্ত রাখে।
🏛️ সম্পর্কিত প্রশ্নপত্র: এই প্রশ্নটি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষা ২০২৫-এর প্রশ্নপত্রে অন্তর্ভুক্ত। সম্পূর্ণ বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক দেখতে আমাদের মূল আর্কাইভে প্রবেশ করুন।

