দেওয়ানি মোকদ্দমায় পক্ষগণের হাজিরা ও গরহাজিরার ফলাফল এবং প্রতিকার (Order IX CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩
প্রশ্ন ২। (ক): দেওয়ানি মোকদ্দমায় পক্ষগণের হাজিরা ও গরহাজিরার ফলাফল এবং প্রতিকার (Order IX CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

দেওয়ানী মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় ধার্য তারিখে পক্ষগণের আদালতে হাজির হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাদী বা বিবাদী—কোনো এক পক্ষ বা উভয় পক্ষই শুনানীর নির্ধারিত দিনে অনুপস্থিত থাকলে আদালত মামলার কী পরিণতি নির্ধারণ করবেন তা দেওয়ানি কার্যবিধির অন্যতম মৌলিক পদ্ধতিগত বিধান। ৯ আদেশে মামলার খারিজ, একতরফা ডিক্রি এবং পক্ষগণের জন্য উন্মুক্ত বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ প্রতিকারের বিধান সংকলিত রয়েছে। অত্র প্রশ্নে পক্ষগণের হাজিরা ও গরহাজিরার চারটি ভিন্ন পরিস্থিতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের প্রাপ্তব্য প্রতিকারসমূহের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Code of Civil Procedure, 1908 এর Order IX (Appearance of Parties and Consequence of Non-appearance) এর প্রধান প্রধান বিধিমালা:

  • Rule 2: বাদীর ভুলের কারণে সমন জারি না হলে মামলা খারিজ।
  • Rule 3: ধার্য দিনে উভয় পক্ষই অনুপস্থিত থাকলে মামলা খারিজ।
  • Rule 4: Rule 2 ও Rule 3 অনুযায়ী খারিজ হওয়া মামলা পুনরুজ্জীবন বা নতুন মামলা দায়ের।
  • Rule 6: বাদী উপস্থিত কিন্তু বিবাদী অনুপস্থিত হলে একতরফা শুনানী ও একতরফা ডিক্রি।
  • Rule 8: বিবাদী উপস্থিত কিন্তু বাদী অনুপস্থিত থাকলে মামলা খারিজ (Dismissal for default)।
  • Rule 9: Rule 8 এর খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে মামলা পুনরুজ্জীবনের আবেদন (Application to set aside dismissal)।
  • Rule 13: একতরফা ডিক্রি রদের জন্য বিবাদীর দরখাস্ত।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

হাজিরা ও গরহাজিরার ফলাফল ও প্রতিকারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছক

পরিস্থিতি ও বিধি আদালতের আদেশ ও ফলাফল ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের প্রাপ্তব্য আইনগত প্রতিকার
১. সমন খরচ না দেওয়ায় সমন জারি হয়নি (Rule 2) আদালত বাদীর মোকদ্দমা খারিজ (Dismiss) করতে পারেন। Rule 4: তামাদির মেয়াদ অবশিষ্ট থাকলে বাদী নতুন মামলা করতে পারেন অথবা খারিজ রদের জন্য আবেদন করতে পারেন (৩০ দিন, Art 163)।
২. শুনানীর দিন উভয় পক্ষই অনুপস্থিত (Rule 3) মামলা সরাসরি খারিজের (Dismissal of suit) আদেশ হবে। Rule 4: বাদী উপযুক্ত কারণ দর্শিয়ে খারিজ আদেশ বাতিলের আবেদন করতে পারেন অথবা নতুন মামলা দায়ের করতে পারেন।
৩. বাদী হাজির, কিন্তু বিবাদী অনুপস্থিত (Rule 6) আদালত বিবাদীর বিরুদ্ধে একতরফা শুনানী (Ex-parte hearing) গ্রহণ করতঃ একতরফা ডিক্রি প্রদান করবেন। Rule 13: বিবাদী ডিক্রি রদের আবেদন (৩০ দিন, Art 164), অথবা ধারা ৯৬(২) এ আপিল, অথবা ধারা ১১৪ এ রিভিউ করতে পারেন।
৪. বিবাদী হাজির, কিন্তু বাদী অনুপস্থিত (Rule 8) বিবাদী বাদীর দাবি স্বীকার না করলে মোকদ্দমা বাদীর খেলাপিতে সরাসরি খারিজ হবে (Dismissed for default)। Rule 9: একই কারণে বাদী নতুন মামলা দায়ের করতে সম্পূর্ণ বারিত; তবে ৩০ দিনের মধ্যে ৯ আদেশের ৯ বিধিতে মামলা পুনরুজ্জীবনের আবেদন করতে হবে।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. কাজী আব্দুল কাদের বনাম মোঃ সামসুল আলম (51 DLR 342): ৯ আদেশের ৯ বিধিতে বাদীর আবেদন শুনানীর সময় আদালতকে দেখতে হবে অনুপস্থিতির কারণ যুক্তিসঙ্গত ছিল কি না; আইন অন্ধ নয়, পক্ষগণকে শুনানীর সুযোগ দেওয়া আদালতের মৌলিক নীতি।

২. রফিক উল্লাহ বনাম সোনালী ব্যাংক (44 DLR AD 188): একতরফা ডিক্রি বা খারিজ আদেশের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সুবিচারের নীতি (Natural Justice) নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ আদেশ আদালতের বিচারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি পক্ষগণের অজ্ঞতা বা অনিবার্য কারণে সৃষ্ট অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে সংবিধিবদ্ধ প্রতিকার উন্মুক্ত রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।

৪.১. দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ আদেশের সামগ্রিক কাঠামোগত তুলনামূলক সারণী

আদেশ ও নিয়ম পরিস্থিতি আদালতের আদেশ ও সংক্ষুব্ধ পক্ষের প্রতিকার
আদেশ ৯ নিয়ম ৩ শুনানির দিনে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ অনুপস্থিত মোকদ্দমা খারিজ; বাদী নতুন মোকদ্দমা করতে পারেন বা নিয়ম ৪ মতে পুনর্বহালের আবেদন করতে পারেন
আদেশ ৯ নিয়ম ৮ বিবাদী উপস্থিত কিন্তু বাদী অনুপস্থিত মোকদ্দমা খারিজ; নতুন মামলা বারিত; বাদীকে নিয়ম ৯ মতে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে
আদেশ ৯ নিয়ম ৬ বাদী উপস্থিত কিন্তু সমন পাওয়া সত্ত্বেও বিবাদী অনুপস্থিত আদালত একতরফা শুনানির নির্দেশ দেবেন এবং বাদীর অনুকূলে একতরফা ডিক্রি প্রদান করবেন
আদেশ ৯ নিয়ম ১৩ একতরফা ডিক্রি প্রচারের পর সংক্ষুব্ধ বিবাদীর আবেদন বিবাদী ৩০ দিনের মধ্যে সমন জারি না হওয়া বা উপস্থিতির যথেষ্ট কারণ দেখিয়ে ডিক্রি বাতিলের আবেদন করতে পারেন

৪.২. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল মজিদ বনাম জাহানারা বেগম, 37 DLR 310) মামলায় সিদ্ধান্ত দেন যে, দেওয়ানি আদালতের মূল উদ্দেশ্য হলো পক্ষগণের বিরোধের গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার করা; পদ্ধতিগত অনুপস্থিতির কারণে কোনো পক্ষকে অধিকারবঞ্চিত করা সমীচীন নয় যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ প্রমাণিত হয়।

৪.৩. দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ আদেশের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল ও রিভিশনের সুযোগ

৯ আদেশের অধীনে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত সকল আদেশ সরাসরি আপিলযোগ্য নয়। তবে ৪৩ আদেশের ১(ঘ) নিয়ম অনুযায়ী ৯ আদেশের ১৩ নিয়মের অধীন একতরফা ডিক্রি রদের আবেদন খারিজের আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ বিবাদী সরাসরি আপিল দায়ের করতে পারেন। অন্যদিকে ৯ নিয়মের অধীন আবেদন খারিজ হলে ১১৫ ধারা মতে জেলা জজ আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি রিভিশন দায়ের করা সংবিধিবদ্ধ আইনি প্রতিকার।

৪.৪. দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ আদেশের ড্রাফটিং কৌশল ও সতর্কবার্তা

আইনজীবীদের জন্য ৯ আদেশের দরখাস্ত প্রস্তুতকালে সমন জারির তারিখ এবং মোকদ্দমার কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। সমন জারিকারকের প্রতিবেদনে কোনো ত্রুটি বা প্রাপকের স্বাক্ষর জাল হলে তা হলফনামা (Affidavit) সহকারে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। কোনো অসত্য কারণ দেখালে আদালত জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

Related Articles

Back to top button