সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে যে সকল চুক্তি বলবৎযোগ্য নয় (Section 21 SRA) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২৩
প্রশ্ন ৩। (ক): সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে যে সকল চুক্তি বলবৎযোগ্য নয় (Section 21 SRA) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২৩

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যকরকরণ (Specific Performance of Contract) সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের অন্যতম প্রধান প্রতিকার। সাধারণত চুক্তিবদ্ধ পক্ষগণ চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পাদনে বাধ্য থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এমন কিছু চুক্তি রয়েছে যা বলবৎ করতে গেলে আদালতের পক্ষে সার্বক্ষণিক তদারকি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে কিংবা যেখানে আর্থিক ক্ষতিপূরণই পর্যাপ্ত প্রতিকার। আইনপ্রণেতাগণ সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারায় সুস্পষ্টভাবে সেই সকল চুক্তির তালিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা কোনো অবস্থাতেই আদালত দ্বারা কার্যকর করা যায় না। অত্র প্রশ্নে ২১ ধারার ৮ শ্রেণির চুক্তির আইনি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

The Specific Relief Act, 1877 এর Section 21 এ বলবৎ অযোগ্য চুক্তির বিধান বিবৃত রয়েছে:

“The following contracts cannot be specifically enforced:—
(a) a contract for the non-performance of which compensation in money is an adequate relief;
(b) a contract which runs into such minute or numerous details, or which is so dependent on the personal qualifications or volition of the parties, or otherwise from its nature is such, that the Court cannot enforce specific performance of its material terms;
(c) a contract the terms of which the Court cannot find with reasonable certainty;
(d) a contract which is in its nature revocable;
(e) a contract made by trustees either in excess of their powers or in breach of their trust;
(f) a contract made by or on behalf of a public company in excess of its powers;
(g) a contract the performance of which involves the performance of a continuous duty extending over a longer period than three years from its date;
(h) a contract of arbitration where the party has refused to arbitrate.”

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও গভীর আইনি ব্যাখ্যা

ধারা ২১ অনুযায়ী বলবৎ অযোগ্য ৮ শ্রেণির চুক্তির বিশদ পর্যালোচনা

  1. ১. যেখানে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত প্রতিকার (Clause a): সাধারণ পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি ভঙ্গ হলে বাজারে সমজাতীয় পণ্য পাওয়া যায় এবং ক্রেতাকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলেই ক্ষতি পুষিয়ে যায়। তাই আদালত পণ্য সরবরাহের ডিক্রি না দিয়ে ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেন।
  2. ২. জটিল খুঁটিনাটি বা ব্যক্তিগত যোগ্যতার চুক্তি (Clause b): গান গাওয়া, ছবি আঁকা, বই লেখা বা চিকিৎসাসেবার মতো চুক্তি যা ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত মেধার ওপর নির্ভরশীল, আদালত কাউকে বাধ্য করতে পারেন না।
  3. ৩. অনিশ্চিত শর্তযুক্ত চুক্তি (Clause c): যে চুক্তির ভাষা বা শর্তাবলী এত অস্পষ্ট যে আদালত যুক্তিসঙ্গতভাবে বুঝতে পারেন না পক্ষগণের প্রকৃত সম্মতি কী ছিল।
  4. ৪. স্বভাবগতভাবে প্রত্যাহারযোগ্য চুক্তি (Clause d): যেমন অংশীদারি চুক্তি (Partnership at will), যা পক্ষগণ যেকোনো সময় একতরফা নোটিশে বাতিল করে দিতে পারে। আদালত এমন চুক্তি কার্যকর করবেন না যা রায়ের পরই বাতিল হয়ে যাবে।
  5. ৫. ট্রাস্টি কর্তৃক এখতিয়ার বহির্ভূত চুক্তি (Clause e): ট্রাস্টের ক্ষমতার অপব্যবহার বা ট্রাস্ট দলিলের সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করে ট্রাস্টি কোনো চুক্তি করলে তা বলবৎ করা যায় না।
  6. ৬. কোম্পানি কর্তৃক আল্ট্রা ভাইরস চুক্তি (Clause f): কোম্পানির মেমোরেন্ডামের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে করা চুক্তি।
  7. ৭. ৩ বছরের অধিক অবিচ্ছিন্ন তদারকির চুক্তি (Clause g): যে চুক্তি পালন করতে আদালতের ৩ বছরের বেশি সময়ব্যাপী প্রতিদিন নজরদারি রাখা প্রয়োজন হয়।
  8. ৮. সালিসির চুক্তি (Clause h): সালিসি চুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান ছাড়া সাধারণ সুনির্দিষ্ট কার্যকরকরণ প্রযোজ্য নয়।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির ও কেস রেফারেন্স

১. লামলি বনাম ওয়াগনার (1852 1 De GM & G 604): ব্যক্তিগত যোগ্যতার চুক্তি ইতিবাচকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় না (Section 21(b))।

২. মেসার্স হক ব্রাদার্স বনাম সোনালী ব্যাংক (42 DLR 188): যে ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত, সেখানে সুনির্দিষ্ট কার্যকরের প্রতিকার বাতিলযোগ্য।

৫. উপসংহার ও সুনির্দিষ্ট আইনি অভিমত

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারা আদালতের অপ্রয়োজনীয় তদারকির জটিলতা রোধ করে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের বাস্তবিক সীমাবদ্ধতাকে সুস্পষ্ট আইনি স্বীকৃতি প্রদান করে।

৪. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারার অ-বলবৎযোগ্য চুক্তি ও ২১ক ধারার সংবিধিবদ্ধ রেজিস্ট্রেশন

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারায় ৮ প্রকার চুক্তিকে আদালতে সুনির্দিষ্টভাবে বলবৎ অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে:

  • যেখানে আর্থিক ক্ষতিপূরণই পর্যাপ্ত প্রতিকার;
  • যে চুক্তি ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল (যেমন- গান গাওয়া, ছবি আঁকা ইত্যাদি);
  • যে চুক্তির শর্তাবলী আদালতের পক্ষে তদারকি করা অসম্ভব;
  • ধারা ২১ক (স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি): ২০০৪ সালের সংশোধনী অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের বায়না চুক্তি অবশ্যই লিখিত ও রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে এবং ক্রেতাকে অবশিষ্ট মূল্য আদালতে জমা দিয়ে মামলা করতে হবে, অন্যথায় আদালত চুক্তি বলবৎ করবেন না।

৫. সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল কাদের বনাম আনোয়ার হোসেন, 53 DLR 210) নজিরে ঘোষণা করেছেন যে, ২১ক ধারার সংবিধিবদ্ধ রেজিস্ট্রেশন ছাড়া স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের বায়না চুক্তির কোনো আইনগত বৈধতা নেই।

৬. চুক্তি বলবৎ না হলে বাদীর বিকল্প আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি (সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ধারা ১৯)

বাদীর বিজ্ঞ আইনজীবী আরজিতে চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের প্রার্থনার পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ধারা ১৯ অনুযায়ী চুক্তিমূল্য, প্রদত্ত বায়নার অর্থ এবং সময়ের মূল্যমান বৃদ্ধির ক্ষতিপূরণ প্রার্থনা করবেন। বিজ্ঞ আদালত যদি কোনো কারণে চুক্তি বলবৎ করতে অপারগ হন, তবে বাদীর অনুকূলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করে আরজির নিষ্পত্তি করবেন।

আইনি সিদ্ধান্ত: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারার এই সীমারেখা আদালতকে অসম্ভব চুক্তি কার্যকর করার অবাস্তব ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখে এবং ২১ক ধারার রেজিস্ট্রেশন সম্পত্তি বিরোধে প্রতারণা প্রতিরোধে এক ঐতিহাসিক সংযোজন।

Related Articles

Back to top button