বিচার্য বিষয় ও প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের আইনি বিধান – বার কাউন্সিল ২০১৭
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৭: সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২
প্রশ্ন: ৯। (ক) সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ অনুযায়ী বিচার্য বিষয় (Fact in Issue) এবং প্রাসঙ্গিক বিষয় (Relevant Fact)-এর সংজ্ঞা ও পার্থক্য আলোচনা করুন। ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Leading Question) কি? সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরায় ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের ব্যবহারিক বিধিমালা সুপ্রিম কোর্টের নজিরসহ বিশদ আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আইনি দর্শন
সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (The Evidence Act, 1872)-এর মূল লক্ষ্য হলো আদালতের সময় সাশ্রয় করা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে মূল বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। আদালতে কোনো মামলার শুনানিকালে অহেতুক অপ্রাসঙ্গিক কথার ভিড়ে যেন সত্য হারিয়ে না যায়, সেজন্য সাক্ষ্য আইনে ‘বিচার্য বিষয়’, ‘প্রাসঙ্গিক বিষয়’ এবং সাক্ষীদের পরীক্ষার নিয়মাবলী সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সাক্ষ্য আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে—আদালতে কেবলমাত্র বিচার্য বিষয় এবং আইনের ৫ থেকে ৫৫ ধারায় বর্ণিত প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ প্রমাণের জন্যই সাক্ষ্য দেওয়া যাবে, অন্য কোনো বিষয়ে নয়।
২. বিচার্য বিষয় বনাম প্রাসঙ্গিক বিষয়ের আইনি ধারণা (Section 3)
- বিচার্য বিষয় (Fact in Issue): সাক্ষ্য আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, এমন যে কোনো বিষয় যা থেকে কোনো মামলার বাদীর দাবিকৃত অধিকার, দায় বা অক্ষমতার অস্তিত্ব, অনস্তিত্ব বা মাত্রা সরাসরি নির্ধারিত হয় এবং যা এক পক্ষ দাবি করে এবং অপর পক্ষ অস্বীকার করে। সিপিসির ১৪ আদেশ অনুযায়ী আদালত যে ইস্যু গঠন করে তা-ই বিচার্য বিষয়।
- প্রাসঙ্গিক বিষয় (Relevant Fact): এমন কোনো ঘটনা যা নিজে বিচার্য বিষয় নয়, কিন্তু সাক্ষ্য আইনের ৫ থেকে ৫৫ ধারায় বর্ণিত সম্পর্কের যে কোনো একটির মাধ্যমে বিচার্য বিষয়ের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং যা বিচার্য বিষয় প্রমাণের যুক্তি ও পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৩. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: বিচার্য বিষয় বনাম প্রাসঙ্গিক বিষয়
| তুলনার ক্ষেত্র | বিচার্য বিষয় (Fact in Issue) | প্রাসঙ্গিক বিষয় (Relevant Fact) |
|---|---|---|
| আইনি অবস্থান | মোকদ্দমার মূল বিতর্ক ও চূড়ান্ত লক্ষ্য (Principal Fact)। | মূল বিষয় প্রমাণের আনুষঙ্গিক মাধ্যম (Evidentiary Fact)। |
| আদালতের ভূমিকা | সিপিসির আদেশ ১৪ মতে বিজ্ঞ আদালত সরাসরি ইস্যু গঠন করেন। | আদালত ইস্যু গঠন করেন না; সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। |
| সিদ্ধান্তের ভিত্তি | বিচার্য বিষয়ের সিদ্ধান্তের ওপরই মামলার রায় নির্ধারিত হয়। | বিচার্য বিষয়ে পৌঁছানোর জন্য কেবল যুক্তি ও সাক্ষ্য যোগায়। |
৪. ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য (Leading Question – Section 141)
সাক্ষ্য আইনের ১৪১ ধারা অনুযায়ী—যে প্রশ্ন উত্থাপনকারী ব্যক্তি সাক্ষীর মুখ থেকে যে উত্তরটি প্রত্যাশা করেন, প্রশ্নের মধ্যেই সেই উত্তরের ইঙ্গিত প্রদান করা হলে তাকে ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Leading Question) বলে।
আইনি বিধিমালা (Sections 142 & 143):
- যেখানে নিষিদ্ধ (Section 142): সাক্ষীর জবানবন্দি ও পুনঃজবানবন্দিতে প্রতিপক্ষের আপত্তি থাকলে কোনো অবস্থাতেই ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যাবে না (ব্যতিক্রম: আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে পরিচয়, অস্বীকৃত বা প্রমাণিত বিষয়)।
- যেখানে অবাধে অনুমোদিত (Section 143): সাক্ষীর জেরায় (Cross-examination) প্রতিপক্ষ আইনজীবী কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করতে পারেন।
৫. আদালতে জবানবন্দি ও জেরায় ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের ব্যবহারিক রূপ
জবানবন্দিতে নিষিদ্ধ প্রশ্ন: “আপনি কি গত ১০ মার্চ রাত ৮টায় আসামিকে বাদীর ওপর হামলা করতে দেখেছিলেন?” (আদালত এই প্রশ্ন নাকচ করবেন)।
জেরায় অনুমোদিত প্রশ্ন: “ঘটনার দিন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল এবং আপনি ছাতা ছাড়া দেখতে পাননি, এই কথা সত্য কি না?” (জেরায় এই প্রশ্ন সম্পূর্ণ বৈধ ও সংবিধিবদ্ধ)।
৫.১. প্রতিকূল সাক্ষী (Hostile Witness) ও ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Section 154)
সাক্ষ্য আইনের ১৫৪ ধারা ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম। সাধারণ নিয়মে নিজের সাক্ষীকে জবানবন্দিকালে কোনো ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যায় না। কিন্তু নিজের সাক্ষী যদি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বৈরি আচরণ শুরু করে এবং সত্য গোপন করে প্রতিপক্ষের সাথে হাত মেলায়, তবে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে উক্ত সাক্ষীকে ‘প্রতিকূল সাক্ষী (Hostile Witness)’ ঘোষণা করা যায়। প্রতিকূল সাক্ষী ঘোষিত হলে নিজের আইনজীবীকেও উক্ত সাক্ষীকে জেরা করার এবং সাক্ষ্য আইনের ১৪৩ ধারা অনুযায়ী অবাধে ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করার পূর্ণ অনুমতি বিজ্ঞ আদালত প্রদান করেন (রাষ্ট্র বনাম লাল মিয়া, 36 DLR (AD) 14)।
৫.২. আদালত কক্ষে বাস্তব জবানবন্দি ও জেরার চিত্র
আইনজীবীর ভুল প্রশ্ন (জবানবন্দিতে): “আসামি কি ঘটনার দিন বাদীর পেটে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিল?” (আদালত এই প্রশ্ন সরাসরি বাতিল করবেন)।
আইনজীবীর সঠিক প্রশ্ন (জবানবন্দিতে): “আসামি তখন বাদীর সাথে কি আচরণ করেছিল?” (সাক্ষী নিজের ভাষায় বর্ণনা দেবেন)।
জেরায় বৈধ প্রশ্ন: “আপনি অতীতে ডাকাতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, এই কথা সত্য কি না?” (সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে জেরায় এই প্রশ্ন সম্পূর্ণ অনুমোদিত)।
৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- মো: মজিবুর রহমান বনাম রাষ্ট্র (41 DLR 214): হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন যে, জবানবন্দিতে আপত্তি সত্ত্বেও ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের অনুমতি দিয়ে রায় দিলে তা সাক্ষ্য আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন হবে।
- রাষ্ট্র বনাম আব্দুল হালিম (30 DLR 302): আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেন যে, জেরায় ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা প্রতিপক্ষের মৌলিক আইনি অধিকার; বিচারক এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।
৭. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিচার্য বিষয় ও প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের আইনি বিধান দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারের নিরপেক্ষতা ও সাক্ষ্য মূল্যায়নের মেরুদণ্ডস্বরূপ।
৫.১. প্রতিকূল সাক্ষী (Hostile Witness) ও ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Section 154)
সাক্ষ্য আইনের ১৫৪ ধারা ইঙ্গিতবাহী প্রশ্নের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম। সাধারণ নিয়মে নিজের সাক্ষীকে জবানবন্দিকালে কোনো ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা যায় না। কিন্তু নিজের সাক্ষী যদি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বৈরি আচরণ শুরু করে এবং সত্য গোপন করে প্রতিপক্ষের সাথে হাত মেলায়, তবে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে উক্ত সাক্ষীকে ‘প্রতিকূল সাক্ষী (Hostile Witness)’ ঘোষণা করা যায়। প্রতিকূল সাক্ষী ঘোষিত হলে নিজের আইনজীবীকেও উক্ত সাক্ষীকে জেরা করার এবং সাক্ষ্য আইনের ১৪৩ ধারা অনুযায়ী অবাধে ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করার পূর্ণ অনুমতি বিজ্ঞ আদালত প্রদান করেন (রাষ্ট্র বনাম লাল মিয়া, 36 DLR (AD) 14)।
৫.২. আদালত কক্ষে বাস্তব জবানবন্দি ও জেরার চিত্র
আইনজীবীর ভুল প্রশ্ন (জবানবন্দিতে): “আসামি কি ঘটনার দিন বাদীর পেটে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিল?” (আদালত এই প্রশ্ন সরাসরি বাতিল করবেন)।
আইনজীবীর সঠিক প্রশ্ন (জবানবন্দিতে): “আসামি তখন বাদীর সাথে কি আচরণ করেছিল?” (সাক্ষী নিজের ভাষায় বর্ণনা দেবেন)।
জেরায় বৈধ প্রশ্ন: “আপনি অতীতে ডাকাতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, এই কথা সত্য কি না?” (সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে জেরায় এই প্রশ্ন সম্পূর্ণ অনুমোদিত)।
📌 সম্পর্কিত আইনি প্রস্তুতি ও সহায়িকা লিংক:
- ২০১৭ সালের বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার সকল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মডেল সমাধান দেখুন
- দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও আইনি আলোচনা
- বার কাউন্সিল ও জুডিশিয়ারি দেওয়ানী কার্যবিধি (CPC) অনলাইন মডেল টেস্ট দিন
- বার কাউন্সিল বিগত সকল লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ও ১০০% পূর্ণাঙ্গ সমাধান ব্যাংক

