সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন ও বৈরী সাক্ষী (Evidence Act Sections 154 & 155) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০

📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | সাক্ষ্য আইন

প্রশ্ন ৯। (খ): ”কেবল বিরুদ্ধ পক্ষ নয় সাক্ষী আহ্বানকারী পক্ষও সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন করতে পারে।” সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান উল্লেখে উদাহরণসহ সাক্ষী অভিশংসনের বিভিন্ন উপায় ব্যাখ্যা করুন।

১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট

সাধারণ ধারণায় সাক্ষীকে জেরা (Cross-examination) করা এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস বা অভিশংসন (Impeachment of credit) করা কেবল বিরুদ্ধ পক্ষের একচ্ছত্র অধিকার। কিন্তু সাক্ষী যদি আদালতে দাঁড়িয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজের পক্ষের বিরুদ্ধেই মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে শুরু করে, তখন তাকে ‘বৈরী সাক্ষী’ (Hostile Witness) ঘোষণা করে যে পক্ষ তাকে ডেকেছে সেই পক্ষও তাকে জেরা ও তার বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন করতে পারে। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ১৫৪ ও ১৫৫ ধারায় এই ব্যতিক্রমী আইনি অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে।

২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী

  • The Evidence Act, 1872:
    • Section 154: আহ্বানকারী পক্ষ কর্তৃক নিজের সাক্ষীকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা (Hostile witness/Question by party to his own witness)।
    • Section 155: সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের ৪টি উপায় (Impeaching credit of witness)।
    • Section 145: পূর্ববর্তী লিখিত বিবৃতির দ্বারা সাক্ষীকে জেরা ও স্ববিরোধিতা প্রদর্শন।

৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও আইনি ব্যাখ্যা

ক. আহ্বানকারী পক্ষ কর্তৃক অভিশংসনের অধিকার (Section 154):

সাক্ষ্য আইনের ১৫৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো সাক্ষী যদি যে পক্ষ তাকে ডেকেছে তার বিরুদ্ধে বৈরী মনোভাব পোষণ করে বা অসত্য বলতে শুরু করে, তবে আদালত উক্ত আহ্বানকারী পক্ষকে তার নিজের সাক্ষীর বিরুদ্ধে জেরা করার এবং ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Leading Questions) করার অনুমতি দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আহ্বানকারী পক্ষ প্রমাণ করতে পারেন যে তার সাক্ষী মিথ্যাবাদী বা বৈরী।

খ. সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের ৪টি সংবিধিবদ্ধ উপায় (Section 155):

সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারা মোতাবেক সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে নিম্নলিখিত ৪টি পদ্ধতিতে চ্যালেঞ্জ ও অভিশংসন করা যায়:

  1. ১. সাক্ষীর অবিশ্বস্ত চরিত্র সম্পর্কে অন্য সাক্ষীর সাক্ষ্য (Unworthy of Credit):
    এমন ব্যক্তিদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করা যারা শপথ নিয়ে বলবেন যে, তারা সাক্ষীর সাধারণ অসৎ চরিত্র ও চালচলন জানেন এবং তাদের বিশ্বাসমতে উক্ত সাক্ষী শপথ নিয়েও মিথ্যা বলতে পারে।
  2. ২. ঘুষ বা অনৈতিক উৎকোচ গ্রহণের প্রমাণ (Bribe or Corrupt Inducement):
    সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করা যে সাক্ষী সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ঘুষ গ্রহণ করেছে বা উৎকোচ গ্রহণের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে।
  3. ৩. পূর্ববর্তী বিবৃতির সাথে স্ববিরোধ প্রদর্শন (Former Inconsistent Statements):
    প্রমাণ করা যে সাক্ষী অতীতে এই ঘটনার বিষয়ে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট বা কোনো দলিলে যে বিবরণ দিয়েছিল, বর্তমান আদালতে দেওয়া বক্তব্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত (ধারা ১৪৫ ও ১৫৫(৩))।
  4. ৪. ব্যভিচার বা অনৈতিক চরিত্রের সাধারণ সাক্ষ্য (সংশোধিত প্রেক্ষাপট):
    পূর্বে ধর্ষণের মামলায় বাদীর চরিত্রহীনতা প্রমাণের সুযোগ ছিল, যা আধুনিক আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাতিল/সীমিত করা হয়েছে।

৪. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির

  • আব্দুল খালেক বনাম রাষ্ট্র, ৪০ ডিএলআর (এডি) ১৭১: কোনো সাক্ষী বৈরী হলেই তার সম্পূর্ণ সাক্ষ্য আবর্জনায় ফেলে দেওয়া যায় না। তার সাক্ষ্যের যে অংশ সত্যের অনুবর্তী এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের সাথে মিলে যায়, আদালত সেই অংশ নির্ভরযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।
  • সতীশ চন্দ্র বনাম রামদয়াল, এআইআর ১৯২১ ক্যালকাটা ৩৭৫: ১৫৪ ধারা আদালতের এক অনন্য বিবেচনামূলক ক্ষমতা, যার উদ্দেশ্য হলো কোনো সাক্ষী যাতে শপথের অপব্যবহার করে সত্যকে ধামাচাপা দিতে না পারে।

৫. উপসংহার

সাক্ষী সত্যের দাস, কোনো পক্ষের কেনা গোলাম নয়। তাই বিরুদ্ধ পক্ষের পাশাপাশি আহ্বানকারী পক্ষকেও সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের অধিকার দিয়ে সাক্ষ্য আইন বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের ভারসাম্য রক্ষা করেছে।

৪.১. বৈরী সাক্ষী ঘোষণার শর্ত ও সাক্ষ্যমূল্য (সাক্ষ্য আইন ধারা ১৫৪)

সাক্ষ্য আইনের ১৫৪ ধারায় আদালত যে পক্ষ সাক্ষীকে ডেকেছে তাকেই সাক্ষীর প্রতি জেরামূলক বা ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করার অনুমতি দিতে পারেন। তবে বৈরী সাক্ষী সম্পর্কে উচ্চ আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ:

  • বৈরী ঘোষণার অর্থ: নিছক নিজ পক্ষের বিপক্ষে সামান্য বিবৃতি দিলেই সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করা যায় না; যখন স্পষ্ট হয় যে সাক্ষী সত্য গোপন করছে বা প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, কেবল তখনই আদালত অনুমতি দেবেন;
  • সাক্ষ্য পুরোপুরি বাতিল হয় না: আমাদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বৈরী সাক্ষীর পুরো সাক্ষ্য বাতিল হয়ে যায় না; আদালতের অনুশাসন হলো “Falsus in uno, falsus in omnibus” নীতি বাংলাদেশে প্রযোজ্য নয়;
  • গ্রহণযোগ্য অংশ: বৈরী সাক্ষীর বক্তব্যের যে অংশ সত্যনিষ্ঠ এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, বিজ্ঞ আদালত সেই অংশ নিজ বিবেচনায় গ্রহণ করতে পারেন।

৪.২. সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসন বনাম বৈরী সাক্ষীর তুলনামূলক রূপরেখা

১৫৫ ধারা অনুযায়ী জেরা ছাড়াও সাক্ষীর অসততা, ঘুষ গ্রহণ বা পূর্ববর্তী পরস্পরবিরোধী বিবৃতির মাধ্যমে তার গ্রহণযোগ্যতা ধ্বংস করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট (আব্দুল জলিল বনাম রাষ্ট্র, 49 DLR 178) নজিরে সিদ্ধান্ত দেন যে, সাক্ষীর চরিত্রহরণ আদালতের উদ্দেশ্য নয়; ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে কেবল মিথ্যাবাদীর মুখোশ উন্মোচন করতেই ১৫৪ ও ১৫৫ ধারার বিচারিক সমন্বয় ঘটে।

৪.৩. জেরায় অবমাননাকর প্রশ্ন প্রতিরোধে আদালতের বিচারিক নিয়ন্ত্রণ

সাক্ষ্য আইনের ১৪৮ থেকে ১৫২ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা অভিশংসনের অজুহাতে আদালত কোনো অবান্তর, অপমানজনক বা কুৎসাপূর্ণ প্রশ্ন করার অনুমতি দেবেন না। আইনজীবী যদি নিছক সাক্ষীকে মানসিক কষ্টে ফেলার উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন, তবে আদালত উক্ত প্রশ্ন নিষিদ্ধ করতে পারেন এবং আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের জন্য বার কাউন্সিলে প্রতিবেদন প্রেরণ করতে পারেন।

৪.৪. বৈরী সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সুপ্রিম কোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, কোনো সাক্ষীকে কেবল বৈরী ঘোষণা করলেই তার সাক্ষ্য ধূলিসাৎ হয় না; বরং সাক্ষ্যের খাঁটি অংশটুকু যদি অন্যান্য প্রমাণের সাথে মেলে, তবে আদালত তার ওপর ভিত্তি করেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।

Related Articles

Back to top button