সৃজনশীল প্রশ্নঃ তামাদি আইন লিখিত পরীক্ষা ২০২২ X দাবী করেন যে

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২২: তামাদি ও সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন

সৃজনশীল সমস্যাভিত্তিক প্রশ্ন: X দাবি করেন যে, Y তাকে দাতা দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ১৫/০৩/২০১৫ তারিখে একটি জমি বিক্রয় দলিল সম্পাদন করে, যা ১৯/০৩/২০১৫ তারিখে রেজিস্ট্রি হয়। X বিষয়টি ১৮/০৩/২০১৬ তারিখে প্রথম জানতে পারেন। অতঃপর X ১৮/০৪/২০১৬ তারিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করে ২২/০৫/২০১৬ তারিখে দলিলের সার্টিফাইড কপি বা সইমোহরী প্রাপ্ত হন। X এখন দলিল বাতিলের জন্য মোকদ্দমা করতে চান। তামাদি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার আলোকে তামাদির মেয়াদ গণনা করে মামলাটি তামাদিতে বারিত কি না সিদ্ধান্ত দিন। মোকদ্দমায় কোন কোন আইনি প্রতিকার ও আরজিতে কী বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে? [পূর্ণমান: ১৫]

১. সমস্যাটির আইনশাস্ত্রীয় প্রেক্ষাপট ও মূল বিচার্য বিষয়

আলোচ্য সৃজনশীল সমস্যাটিতে প্রতারণামূলক দলিল বাতিলের তামাদির মেয়াদ নির্ধারণ, তামাদি গণনা শুরুর ভিত্তি এবং দেওয়ানি আদালতের প্রতিকারই প্রধান বিচার্য বিষয়। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী প্রতারণামূলক, জাল বা বাতিলযোগ্য দলিল বাতিলের (Cancellation of Instruments) মোকদ্দমা দায়ের করা হয়।

তামাদি আইন, ১৯০৮ (The Limitation Act, 1908)-এর প্রথম তফসিলের ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো দলিল বাতিল বা রদকরণের সাধারণ তামাদির মেয়াদ হলো ৩ (তিন) বৎসর।

২. প্রতারণার ক্ষেত্রে তামাদির বিশেষ নীতি (ধারা ১৮-এর প্রয়োগ)

সাধারণ নিয়মে কোনো দলিল কার্যকর হওয়ার বা রেজিস্ট্রির তারিখ (১৯/০৩/২০১৫) থেকে তামাদি গণনা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু তামাদি আইনের ১৮ ধারায় প্রতারণার ক্ষেত্রে একটি সংবিধিবদ্ধ রক্ষাকবচ প্রদান করা হয়েছে:

“যেখানে কোনো ব্যক্তি কোনো অধিকার লাভের ক্ষেত্রে অন্য পক্ষের প্রতারণার কারণে অন্ধকারে থাকে, কিংবা কোনো অধিকারের ভিত্তিপ্রস্তর দলিল প্রতারণামূলকভাবে গোপন রাখা হয়, সেখানে প্রতারণা আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত তামাদির তামাদি স্থগিত থাকবে। অর্থাৎ বাদী যেদিন সর্বপ্রথম প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারেন (Date of Knowledge), ঠিক সেই দিন হতে তামাদির নতুন মেয়াদ গণনা শুরু হবে।”

সমস্যাটিতে প্রদত্ত তথ্যমতে, বাদী X প্রতারণার কথা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন এবং তিনি সর্বপ্রথম ১৮/০৩/২০১৬ তারিখে জানতে পারেন যে Y জালিয়াতির মাধ্যমে একটি ভুয়া দলিল রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে। সুতরাং, তামাদি আইনের ১৮ ধারা অনুসারে ৯১ অনুচ্ছেদের ৩ বছরের তামাদির মেয়াদ গণনা শুরু হবে ১৮/০৩/২০১৬ তারিখ হতে (দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ ১৯/০৩/২০১৫ হতে নয়)।

৩. তামাদির গাণিতিক হিসাব ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আইনানুযায়ী তামাদির সময়সীমা বিশ্লেষণ করলে সুস্পষ্ট হিসাবটি নিম্নে উপস্থাপিত হলো:

  • প্রতারণা সম্পর্কে প্রথম জানার তারিখ (Date of Knowledge): ১৮/০৩/২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ।
  • ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৩ বছরের মেয়াদ সমাপ্তির তারিখ: ১৮/০৩/২০১৬ + ৩ বছর = ১৮/০৩/২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।
  • সইমোহরী নকলের সময়সীমা (ধারা ১২-এর প্রাসঙ্গিকতা): X দলিলটির সইমোহরী নকলের জন্য আবেদন করেন ১৮/০৪/২০১৬ তারিখে এবং তা সরবরাহ করা হয় ২২/০৫/২০১৬ তারিখে। এখানে সময় অতিবাহিত হয় ৩৪ দিন। আপিল বা রিভিউয়ের ক্ষেত্রে তামাদি আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী এই সময়টুকু সরাসরি তামাদির অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বাদ দেওয়া যায়। তবে মূল মোকদ্দমার ক্ষেত্রে ১৮ ধারা প্রয়োগেই বাদী ১৮/০৩/২০১৯ পর্যন্ত পূর্ণ ৩ বছর সময় পাচ্ছেন।
  • চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: যেহেতু ১৮/০৩/২০১৬ তারিখে প্রতারণা জানার পর হতে ১৮/০৩/২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময় বলবৎ রয়েছে, সেহেতু উক্ত মেয়াদের মধ্যে দায়েরকৃত দলিল বাতিলের মোকদ্দমাটি কোনোভাবেই তামাদিতে বারিত (Barred by Limitation) হবে না, বরং সম্পূর্ণ আইনসম্মত ও মেয়াদের মধ্যে থাকবে।

৪. দেওয়ানি কার্যবিধির নিয়ম ও আরজিতে বাদীর আবশ্যকীয় বক্তব্য

তামাদি আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী তামাদিতে বারিত মামলা আদালত নিজ উদ্যোগে খারিজ করতে বাধ্য। তাই ১৮ ধারার ব্যতিক্রমী সুবিধা পেতে হলে বাদীকে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭ নিয়ম ৬ (Order VII Rule 6 CPC) বাধ্যতামূলকভাবে পরিপালন করতে হবে:

  1. প্রতারণা জানার তারিখের স্পষ্ট উল্লেখ: আরজিতে বাদীকে সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করতে হবে যে তিনি কীভাবে, কার মাধ্যমে এবং কোন তারিখে (১৮/০৩/২০১৬) উক্ত প্রতারণার কথা জানতে পেরেছেন।
  2. জালিয়াতির উপাদান বর্ণনা: Y কীভাবে বাদীর অজ্ঞাতসারে অন্য কাউকে ভুয়া দাতা সাজিয়ে বা টিপসই জাল করে দলিল সম্পাদন করিয়েছে তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিতে হবে (Order VI Rule 4 CPC)।
  3. প্রার্থিত প্রতিকার (Prayer Clause): সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারা অনুযায়ী ১৫/০৩/২০১৫ সম্পাদিত ও ১৯/০৩/২০১৫ রেজিস্ট্রিকৃত দলিলটি জাল, প্রতারণামূলক, বাতিল এবং বাদীর ওপর বাধ্যকর নয় মর্মে ঘোষণা দিয়ে তা বাতিলের ডিক্রি এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর দলিলের ভলিউমে বাতিলের নোট অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ প্রার্থনা করতে হবে।

৫. উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী নজিরসমূহ

  • আব্দুল খালেক বনাম মমতাজ বেগম (42 DLR (AD) 89): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, প্রতারণামূলক বা জাল দলিলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রির তারিখ নয়, বরং বাদী যখন প্রথম প্রতারণা আবিষ্কার করেন বা জানতে পারেন, সেই দিন থেকেই ৯১ অনুচ্ছেদের ৩ বছর তামাদির গণনা শুরু হবে।
  • হাজী আবুল হোসেন বনাম মোসলেম (38 DLR 214): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন যে, প্রতারণার ক্ষেত্রে তামাদি আইনের ১৮ ধারার সুবিধা ভোগ করতে হলে আরজিতে জানার তারিখের সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি উল্লেখ করা বাদীর জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
  • সোলেমান আলী বনাম জয়নাল আবেদীন (10 BLC (AD) 143): যে দলিল যোগসাজশ ও প্রতারণার মাধ্যমে সৃজিত হয়েছে, তা আইনের চোখে শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio) এবং ১৮ ধারা তাকে তামাদির কঠোরতা থেকে পূর্ণ সুরক্ষা দেয়।

৬. উপসংহার

অতএব, প্রতারণামূলক দলিল বাতিল ও তামাদির মেয়াদ নির্ণয়ে তামাদি আইনের ১৮ ধারা এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারার সমন্বিত প্রয়োগে বাদী X ১৮/০৩/২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করে পূর্ণ আইনগত প্রতিকার লাভ করতে সক্ষম হবেন এবং বিবাদীর তামাদির আপত্তি বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক নাকচ হবে।

৪. তামাদি আইনের ধারা ৬, ৭, ৮ ও ৯-এর সামগ্রিক আইনি সমন্বয়

আইনগত অক্ষমতা (Legal Disability) এবং তামাদির মেয়াদ গণনায় সংবিধিবদ্ধ ধারাসমূহের মধ্যে ভারসাম্য নিম্নরূপ:

  • আইনগত অক্ষমতার ৩টি ক্ষেত্র (ধারা ৬): নাবালকত্ব (Minority), অপ্রকৃতিস্থতা (Insanity), এবং জড়বুদ্ধিতা (Idiot); এই অক্ষমতা বিদ্যমান থাকাকালে তামাদির সময় অতিবাহিত হয় না;
  • অক্ষমতা অবসান পরবর্তী সময় (ধারা ৮): অক্ষমতা দূর হওয়ার পর মূল তামাদির তামাদি যা-ই থাকুক না কেন, সর্বোচ্চ ৩ বছরের মধ্যে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে;
  • তামাদি একবার শুরু হলে তা থামে না (ধারা ৯): কার্যকারণ উদ্ভবের পর তামাদির মেয়াদ একবার চলতে শুরু করলে পরবর্তী কোনো অক্ষমতা বা প্রতিবন্ধকতা উক্ত মেয়াদ স্থগিত করতে পারে না;
  • সুপ্রিম কোর্টের অনুশাসন: (রহিম বনাম করিম, 46 DLR 215) মামলায় আদালত সিদ্ধান্ত দেন যে, ধারা ৯ একটি অলঙ্ঘনীয় কঠোর নীতি, যা আইনের স্থিরতা বজায় রাখে।

Related Articles

Back to top button