আইনজীবীদের দক্ষতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বার কাউন্সিলের ভূমিকা মূল্যায়ন – বার কাউন্সিল ২০১৫

বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৫: বার কাউন্সিল অর্ডার ও রুলস, ১৯৭২

প্রশ্ন: আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভূমিকা ও অবদান আলোচনা করুন। বার কাউন্সিল কি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা? আইনজীবীদের অসদাচরণের বিচারার্থে ট্রাইব্যুনালের কার্যাবলি ও শাস্তিসমূহ বিশদভাবে আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]

১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও স্বায়ত্তশাসনের স্বরূপ

The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 (President’s Order No. 46 of 1972)-এর অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী গঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (Bangladesh Bar Council) হলো বাংলাদেশের সমগ্র আইনজীবী সমাজের একটি সংবিধিবদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান (Body Corporate)। এটি সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে আইনজীবীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হয়। চিরন্তন উত্তরাধিকার (Perpetual Succession), নিজস্ব সিলমোহর এবং সম্পত্তি ধারণ ও মামলা পরিচালনার ক্ষমতা এটিকে একটি স্বাধীন স্বশাসিত আইনি কাঠামোর পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছে।

২. আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা ও মানোন্নয়নে বার কাউন্সিলের ভূমিকা

আইন পেশার আন্তর্জাতিক মান ও দক্ষতা সুরক্ষায় বার কাউন্সিল বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে:

  1. কঠোর মেধাভিত্তিক ত্রিমুখী বাছাই: অতীতে ঢালাও সনদের ঐতিহ্য ভেঙে বর্তমানে প্রিলিমিনারি (MCQ), লিখিত পরীক্ষা এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিখাদ মেধার প্রবেশ নিশ্চিত করা হয়।
  2. লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির তত্ত্বাবধান (Article 10): দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এবং ল’ কলেজসমূহের আইনের পাঠ্যক্রম, ডিগ্রি ও শিক্ষা কাঠামোর গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করে বার কাউন্সিল। অনুমোদনহীন ও বাণিজ্যিক ল’ কলেজের ছাত্রছাত্রীদের তালিকাভুক্তি স্থগিত রেখে মানের সুরক্ষায় কাজ করে।
  3. বাধ্যতামূলক ওরিয়েন্টেশন ও কর্মশালা: নবীন আইনজীবীদের জন্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি ড্রাফটিং, ট্রায়াল প্র্যাকটিস এবং আদালতের শিষ্টাচার (Court Decorum)-এর ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করে।

৩. আইনজীবীদের মর্যাদা, অধিকার ও কল্যাণ সুরক্ষায় অবদান

  • বেনেভোলেন্ট ফান্ড ও ট্রাস্ট ফান্ড: অনুচ্ছেদ ৩২ ও ৩৮ মোতাবেক গঠিত তহবিলের মাধ্যমে কোনো আইনজীবীর অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারকে এককালীন আর্থিক সাহায্য এবং অসুস্থতায় চিকিৎসা অনুদান প্রদান করা হয়।
  • পেশাগত অধিকারের নিরাপত্তা: আদালত বা প্রশাসনিক কোনো কর্মকর্তা কর্তৃক আইনজীবীদের আইনসম্মত দায়িত্ব পালনে বাধা বা অবমাননা করা হলে বার কাউন্সিল সর্বোচ্চ আইনি প্রতিবাদ ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করে।
  • টাউট ও দালাল দমন: ভুয়া আইনজীবী ও আদালত পাড়ার দালালদের নির্মূল করতে বার কাউন্সিল নিয়মিত কার্ড ও ডিজিটাল ডেটাবেজ প্রণয়ন করেছে।

৪. আইনজীবীদের শৃঙ্খলা রক্ষা ও বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল (Articles 33 & 34)

আইনজীবীদের পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণে বার কাউন্সিল একটি স্বাধীন বিচারিক ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা করে। অনুচ্ছেদ ৩৩ অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের গঠন কাঠামো হলো:

  • সদস্য সংখ্যা: ৩ (তিন) জন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত হয়।
  • গঠন কাঠামো: বার কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য হতে ২ জন (যার মধ্যে ১ জন সিনিয়র সদস্য চেয়ারম্যান হন) এবং বার কাউন্সিলের ভোটার তালিকাভুক্ত সিনিয়র অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য হতে মনোনীত ১ জন আইনজীবী সদস্য।
  • বিচারিক ক্ষমতা (Article 35): দেওয়ানি কার্যবিধির আওতায় ট্রাইব্যুনালকে একটি দেওয়ানি আদালতের সমমর্যাদাসম্পন্ন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে (সাক্ষী সমন, শপথ গ্রহণ, নথি তলব ইত্যাদি)।

ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত ৩ প্রকার শাস্তিসমূহ (Penalties – Article 34):

  1. তিরস্কার (Reprimand): লঘু অসদাচরণ বা অনভিজ্ঞতার কারণে প্রথমবার সতর্ক করা।
  2. সাময়িক পেশা স্থগিত (Suspension): নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য (যেমন ৬ মাস বা ৩ বছর) ওকালতি প্র্যাকটিস বন্ধ রাখা।
  3. স্থায়ী সনদ বাতিল (Removal from Practice): নৈতিক স্খলন ও চরম অসদাচরণের দায়ে রোল হতে নাম চিরতরে কর্তন করা।

৫. পেশাগত আচরণবিধি (Canons of Professional Conduct)-এর সারসংক্ষেপ

অধ্যায় দায়িত্বের ক্ষেত্র মূল নীতিসমূহ
অধ্যায় ১ আদালতের প্রতি আইনজীবীর কর্তব্য আদালতকে সম্মান প্রদর্শন, বিচারককে প্রভাবিত না করা, খাস কামরায় গোপন আলোচনা না করা।
অধ্যায় ২ মক্কেলের প্রতি আইনজীবীর কর্তব্য মক্কেলের গোপনীয়তা রক্ষা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, অতিরিক্ত ফি দাবি না করা, ফি ভাগ না করা।
অধ্যায় ৩ সহকর্মীদের প্রতি কর্তব্য অন্য আইনজীবীর মক্কেল না ভাঙানো, ব্যক্তিগত আক্রমণ না করা, পেশাগত ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা।
অধ্যায় ৪ জনগণের প্রতি কর্তব্য আইনের শাসন রক্ষা, দরিদ্র বিচারপ্রার্থীকে আইনি সহায়তা এবং জনস্বার্থ সুরক্ষা।

৬. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)

  • ড. কামাল হোসেন বনাম বাংলাদেশ বার কাউন্সিল (40 DLR 332): সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেন যে, বার কাউন্সিল কেবল আইনজীবীদের সাধারণ ট্রেড ইউনিয়ন নয়, এটি বিচার বিভাগের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা রক্ষার সাংবিধানিক সহযোগী অঙ্গ।
  • মোজাম্মেল হক বনাম বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল (28 DLR 154): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ট্রাইব্যুনালে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি (Audi Alteram Partem) কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, আইনজীবীদের দক্ষতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বার কাউন্সিলের ভূমিকা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার স্তম্ভস্বরূপ। আইন পেশার সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে বার কাউন্সিল যুগপৎভাবে অভিভাবক এবং কঠোর শৃঙ্খলার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে আসছে।

৫.১. বার কাউন্সিলে পেশাগত অসদাচরণের নালিশ দায়েরের আনুষ্ঠানিক নিয়ম ও দরখাস্তের খসড়া (Rule 43)

কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে মক্কেল বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অসদাচরণের অভিযোগ উত্থাপন করতে চাইলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল রুলস-এর রুল ৪৩ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট হলফনামা (Affidavit) সহকারে ১,০০০/- টাকা ফি প্রদানপূর্বক লিখিত দরখাস্ত পেশ করতে হয়:

বরাবর, সম্মানিত সচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, ঢাকা

অভিযোগকারী: মো: সিরাজুল ইসলাম, পিতা- মৃত করিম উল্লাহ, সাং- মতিঝিল, ঢাকা।
— বনাম —
অভিযুক্ত আইনজীবী: জনাব ………….., অ্যাডভোকেট, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন।

বার কাউন্সিল রুলস-এর রুল ৪৩ মতে পেশাগত অসদাচরণের বিরুদ্ধে নালিশী দরখাস্ত

বিনীত নিবেদন এই যে, অত্র দরখাস্তকারী তাহার দেওয়ানি আপিল নং ৪৫/২০২২ পরিচালনার জন্য অভিযুক্ত আইনজীবীকে মোট ৫০,০০০/- টাকা ফি প্রদান করেন। কিন্তু উক্ত আইনজীবী আপিলের শুনানির দিন আদালতে উপস্থিত না হইয়া ইচ্ছাকৃতভাবে আপিল খারিজ হইতে দেন এবং পরবর্তীতে প্রতিপক্ষের সাথে গোপন আঁতাত করিয়া মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, যাহা চরমতম পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct)। অতএব, উক্ত নালিশ তদন্তপূর্বক বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনালে প্রেরণ করিয়া অভিযুক্ত আইনজীবীর ওকালতি সনদ বাতিলের আদেশদানে মর্জি হয়।

Related Articles

Back to top button