সমবায় বিরোধ ও দেওয়ানী এখতিয়ারহীনতায় একতরফা স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার দরখাস্ত (Order 39 Rule 4 CPC) | বার কাউন্সিল লিখিত ২০২০
📌 বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০২০ | দেওয়ানী কার্যবিধি
প্রশ্ন ১। (খ): X বাদী হয়ে আপনার মক্কেল Y সহ আরো ৫ জন বিবাদীর বিরুদ্ধে নালিশী জমিতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রতিকার এবং Y কর্তৃক পরিচালিত আরজির তফসিলবুক্ত সমবায় সমিতির সদস্য পদে অন্তর্ভুক্তির প্রতিকার দাবী করে ঢাকার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি মোকদ্দমা দায়ের করতঃ নালিশী জমির দখল বিষয়ে একটি একতরফা Status quo আদেশ লাভ করে। আপনি জানেন যে, সমবায় সমিতি সংক্রান্ত মোকাদ্দমা উক্ত আদালত এর বিচারিক এখতিয়ার বহির্ভূত। এমতাবস্থায়, your client Y এর পক্ষে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে তাৎক্ষণিক কি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন? The Code of Civil Procedure, 1908 এর সংশ্লিষ্ট বিধান উল্লেখে উত্তর দিন।
১. প্রশ্নের মূল চাহিদা ও আইনি প্রেক্ষাপট
প্রদত্ত সমস্যায় বাদী X এমন দুটি প্রতিকার একত্র করে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী মোকদ্দমা দায়ের করেছেন যার মধ্যে একটি (সমবায় সমিতির সদস্যপদ অন্তর্ভুক্তি বিরোধ) সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ (Co-operative Societies Act, 2001)-এর বিধান মতে দেওয়ানী আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের বাইরে (Barred by Special Law)। তা সত্ত্বেও আদালত একতরফা স্থিতাবস্থা (Status Quo) আদেশ প্রদান করেছেন। এমতাবস্থায় বিবাদী Y-এর আইনজীবী হিসেবে বিজ্ঞ আদালতে তাৎক্ষণিক কী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং বেআইনি আদেশ বাতিলের কৌশল নিরূপণ করাই অত্র প্রশ্নের মূল উদ্দেশ্য।
২. সংশ্লিষ্ট বিধিবদ্ধ আইন ও আইনি বিধানাবলী
- The Code of Civil Procedure, 1908:
- Order XXXIX, Rule 4: একতরফা নিষেধাজ্ঞা বা স্থিতাবস্থা আদেশ রদ, সংশোধন বা বাতিলের আবেদন (Application for discharge, variation or setting aside of injunction/status quo)।
- Order VII, Rule 11(d): বিশেষ আইন দ্বারা মামলাটি বারিত হওয়ায় আরজি সরাসরি প্রত্যাখ্যানের আবেদন (Rejection of Plaint – Barred by Law)।
- Section 9: দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারের সীমারেখা—বিশেষ আইন দ্বারা স্পষ্টভাবে বারিত থাকলে দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার রহিত হয়।
- The Co-operative Societies Act, 2001 (সমবায় সমিতি আইন, ২০০১):
- ধারা ৫০ ও ধারা ৫০(৪): সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন, সদস্যপদ বা অভ্যন্তরীণ বিরোধের ক্ষেত্রে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিবন্ধক (Registrar)-এর ট্রাইব্যুনাল একমাত্র ফোরাম এবং দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে বারিত (Expressly Barred)।
৩. বাস্তব বিশ্লেষণ ও আইনজীবীর তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ
বিবাদী Y-এর নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে কালবিলম্ব না করে দুটি সমন্বিত ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
- পদক্ষেপ ১ (তাৎক্ষণিক স্থিতাবস্থা বাতিলের আবেদন): The Code of Civil Procedure, 1908-এর Order XXXIX, Rule 4 এবং Section 151 অনুযায়ী প্রদত্ত একতরফা Status Quo আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহারের (Vacate/Discharge) আবেদন দাখিল করতে হবে। যুক্তিতে দেখাতে হবে যে, বাদী তথ্য গোপন করে এখতিয়ারবিহীন আদালতে মামলা দায়ের করে আদালতকে বিভ্রান্ত করে একতরফা আদেশ হাসিল করেছেন।
- পদক্ষেপ ২ (আরজি প্রত্যাখ্যানের আবেদন): সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ এর ৫০ ধারার সংবিধিবদ্ধ বিধানের আলোকে দেওয়ানী আদালত উক্ত বিরোধের বিচার করার এখতিয়ার রাখেন না। সুতরাং The Code of Civil Procedure, 1908-এর Order VII, Rule 11(d) অনুযায়ী আরজিটি প্রত্যাখ্যানের (Rejection of Plaint) দরখাস্ত দাখিল করতে হবে।
৪. বিজ্ঞ আদালতে দাখিলের নিমিত্ত দরখাস্তের পূর্ণাঙ্গ খসড়া মুসাবিদা
দেওয়ানী মোকদ্দমা নং …………. / ২০২০
X …………………………………………………………………. বাদী
বনাম
Y ও অন্যান্য ……………………………………………………….. বিবাদীগণ
The Code of Civil Procedure, 1908-এর Order XXXIX, Rule 4 এবং Section 151 মতে বিবাদী নং ১ (Y)-এর পক্ষে বিগত …….. তারিখের একতরফা স্থিতাবস্থা (Status Quo) আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার/বাতিলের দরখাস্ত।
বিনীত নিবেদন এই যে—
- বাদী অত্র মোকদ্দমার আরজিতে নালিশী সম্পত্তিতে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তফসিলভুক্ত সমবায় সমিতির সদস্যপদ প্রাপ্তির অবৈধ দাবি উত্থাপন করিয়াছেন।
- সমবায় সমিতি আইন, ২০০১-এর ৫০ ধারা মোতাবেক সমবায় সমিতির সদস্যপদ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র ফোরাম হইলেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক। উক্ত আইনের সংবিধিবদ্ধ বিধানে দেওয়ানী আদালতের বিচারিক এখতিয়ার সুস্পষ্টভাবে বারিত করা হইয়াছে।
- বাদী উক্ত আইনগত সত্য গোপন করিয়া সম্পূর্ণ অসদুপায়ে ও আদালতকে বিভ্রান্ত করিয়া একতরফা স্থিতাবস্থা আদেশ লাভ করিয়াছেন, যাহা এখতিয়ারবহির্ভূত এবং আইনগতভাবে অকার্যকর (Void ab initio)।
- উক্ত একতরফা আদেশের ফলে বিবাদীগণ আইনানুগ ভোগদখলে মারাত্মক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হইতেছেন।
প্রার্থনা:
অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, বিজ্ঞ আদালত অনুগ্রহপূর্বক সুবিচারের স্বার্থে বিগত ……… তারিখের একতরফা স্থিতাবস্থা আদেশটি বাতিল/প্রত্যাহার (Vacate/Discharge) করিয়া ন্যায়বিচার করিতে মর্জি হয়।
১ নং বিবাদী পক্ষে অ্যাডভোকেট
৫. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রামাণ্য নজির
- আব্দুল খালেক বনাম বাংলাদেশ, ৫০ ডিএলআর (এডি) ৯১: কোনো বিশেষ আইন দ্বারা যদি নির্দিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা ফোরামকে একক এখতিয়ার প্রদান করা হয় এবং দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার বারিত থাকে, তবে সেখানে দেওয়ানী আদালতের জারিকৃত কোনো নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ সম্পূর্ণ এখতিয়ারহীন ও আইনগতভাবে বাতিল।
- মঞ্জুর আহমেদ বনাম সমবায় ট্রাইব্যুনাল, ৫৩ ডিএলআর ৩১২: সমবায় সমিতির সদস্যপদ সংক্রান্ত বিরোধ কেবল সমবায় আইনের ফোরামেই বিচার্য; দেওয়ানী আদালতে এ বিষয়ে আরজি দাখিল হলে তা Order VII Rule 11(d) CPC মতে সরাসরি খারিজযোগ্য।
৬. উপসংহার
এখতিয়ারহীন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো একতরফা আদেশ স্থগিত বা বাতিল করার জন্য Order XXXIX Rule 4 সিপিসির অধীনে আবেদন দাখিলই তাৎক্ষণিক ও সবচেয়ে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ। একইসাথে মূল আরজি খারিজের জন্য Order VII Rule 11(d) দাখিল করে সম্পূর্ণ মামলাটির পরিসমাপ্তি ঘটানো যায়।
৪.১. সমবায় সমিতির বিরোধ ও দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার বারণ
সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী সমিতির অভ্যন্তরীণ নির্বাচন বা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সমবায় রেজিস্ট্রারের নিকট সালিশি আবেদন দায়ের বাধ্যতামূলক এবং সাধারণ দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার স্পষ্টভাবে বারিত:
- দেওয়ানি আদালত সমবায় বিরোধে একতরফা স্থিতাবস্থা প্রদান করলে তা সমবায় আইনের পরিপন্থী;
- বিবাদী ৩৯ আদেশের ৪ নিয়ম মতে উক্ত স্থিতাবস্থা আদেশের বিরুদ্ধে লিখিত দরখাস্ত পেশ করে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আবেদন জানাবে;
- একইসাথে দেওয়ানি কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১(ঘ) নিয়ম মতে ‘আইন দ্বারা বারিত’ (Barred by Law) হওয়ার কারণে আরজি সরাসরি প্রত্যাখ্যানের আবেদন পেশ করবে (জনতা কো-অপারেটিভ বনাম মজিবুর রহমান, 55 DLR 190)।
