দায়রা জজ ও হাইকোর্টের রিভিশন ক্ষমতা এবং খালাস রদ করে শাস্তির আইনি বিধান – ২০১৪
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৪: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
প্রশ্ন: দায়রা জজ ও হাইকোর্ট বিভাগের ফৌজদারি রিভিশন (Criminal Revision) ক্ষমতার পরিধি আলোচনা করুন। রিভিশন আদালত কি অধস্তন আদালতের কোনো খালাসের আদেশ বাতিল করিয়া আসামিকে সরাসরি সাজা বা দণ্ডাদেশ প্রদান করিতে পারে? রিভিশন আদালতের আইনি সীমাবদ্ধতা ও সুপ্রিম কোর্টের নজিরসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করুন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক পটভূমি ও রিভিশন এখতিয়ারের দর্শন
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর ধারা ৪৩৯ ও ৪৩৯(ক)-এ উচ্চতর আদালতসমূহের রিভিশন এখতিয়ার (Supervisory Jurisidiction) বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। রিভিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো অধস্তন ফৌজদারি আদালতসমূহের কোনো আদেশ, রায় বা কার্যধারার নিয়মানুগতা (Regularity), যথার্থতা (Correctness), বৈধতা (Legality) এবং আদেশের যৌক্তিকতা (Propriety) পরীক্ষা ও নিশ্চিত করা। রিভিশন কোনো সংবিধিবদ্ধ আপিল নয়; এটি মূলত বিচারিক ভুলত্রুটি সংশোধন এবং বিচার প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষার একটি অসাধারণ তত্ত্বাবধায়ক ক্ষমতা।
২. দায়রা জজের রিভিশন ক্ষমতা (Section 439A CrPC)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯(ক) ধারা অনুযায়ী দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের যে কোনো আদেশ বা রায়ের বিরুদ্ধে রিভিশন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন:
- নথি তলব ও পরীক্ষা (Section 435): যে কোনো অধস্তন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের নথি তলব করে তা পরীক্ষা করতে পারেন।
- আদেশের পরিবর্তন ও পুনঃতদন্ত: অন্যায়ভাবে খারিজ হওয়া নালিশ পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন (Section 436) কিংবা জামিন মঞ্জুর/বাতিল সংক্রান্ত আদেশ সংশোধন করতে পারেন।
- একক ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি (Finality of Session Judge’s Order): ৪৩৯(ক)(২) ধারা অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি একবার দায়রা জজের নিকট রিভিশন দায়ের করেন, তবে দায়রা জজ কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আর কোনো দ্বিতীয় রিভিশন দায়ের করা যাবে না। দায়রা জজের সিদ্ধান্তই রিভিশনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত। তবে গুরুতর অবিচার হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট বা CrPC-এর ৫৬১(ক) ধারায় কোয়াশমেন্ট প্রার্থনা করা যায়।
৩. হাইকোর্ট বিভাগের রিভিশন ক্ষমতা (Section 439 CrPC)
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯ ধারায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগকে অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত তত্ত্বাবধায়ক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগ একজন আপিল আদালত হিসেবে যে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন (যেমন ধারা ৪২৩, ৪২৬, ৪২৭ ও ৪২৮), রিভিশন শুনানিকালে তার প্রায় সবগুলোই প্রয়োগের এখতিয়ার রাখেন। আদালত আসামির জামিন মঞ্জুর করতে পারেন, দণ্ডাদেশ কমাতে বা স্থগিত করতে পারেন এবং মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ আইনসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
৪. রিভিশন আদালত কি খালাসের আদেশ রদ করে সরাসরি সাজা দিতে পারে? (Section 439(4))
এই প্রশ্নের উত্তর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯(৪) ধারায় অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট ভাষায় বিধিবদ্ধ করা হয়েছে:
“Nothing in this section shall be deemed to authorize a High Court Division to convert a finding of acquittal into one of conviction.”
অর্থাৎ, এই ধারার কোনো কিছুই হাইকোর্ট বিভাগকে (কিংবা ৪৩৯ক মতে দায়রা আদালতকে) কোনো খালাসের আদেশকে দণ্ডাদেশ বা সাজায় রূপান্তর করার কর্তৃত্ব প্রদান করে না।
অতএব, রিভিশন শুনানি অন্তে বিজ্ঞ আদালত যদি দেখেন যে অধস্তন আদালত আসামিকে অন্যায়ভাবে খালাস দিয়েছে, তবুও রিভিশন আদালত নিজে সরাসরি আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড বা জরিমানা আরোপ করতে পারবেন না। এটি সম্পূর্ণ সংবিধিবদ্ধভাবে নিষিদ্ধ।
রিভিশন আদালতের একমাত্র বৈধ আইনি ক্ষমতা: রিভিশন আদালত উক্ত অন্যায় খালাসের আদেশটি বাতিল বা সেট-অ্যাসাইড (Set Aside) করতে পারেন এবং মামলাটি পুনরায় নিরপেক্ষ বিচার বা শুনানির জন্য অধস্তন উপযুক্ত আদালতে পুনঃবিচারের (Re-trial / Remand) নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করতে পারেন।
৫. খালাস রদ করে সরাসরি সাজার বিধান কোথায় রয়েছে? (ধারা ৪১৭ বনাম ধারা ৪৩৯)
আইনের দৃষ্টিতে খালাসকে সরাসরি সাজায় রূপান্তরের একমাত্র আইনগত উপায় হলো ফৌজদারি আপিল (Appeal against Acquittal under Section 417 CrPC):
| তুলনার ক্ষেত্র | খালাসের বিরুদ্ধে আপিল (Section 417 CrPC) | ফৌজদারি রিভিশন (Section 439/439A CrPC) |
|---|---|---|
| সরাসরি সাজা দেওয়ার ক্ষমতা | আপিল আদালত খালাস বাতিল করে আসামিকে সরাসরি কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড দিতে পারেন। | রিভিশন আদালত কোনোভাবেই সরাসরি সাজা দিতে পারেন না (ধারা ৪৩৯(৪))। |
| আদালতের এখতিয়ার | দায়রা জজ বা হাইকোর্ট বিভাগে রাষ্ট্র বা নালিশকারী কর্তৃক সংবিধিবদ্ধ আপিল। | তত্ত্বাবধায়ক এখতিয়ার; আদালত কেবল রি-ট্রায়ালের নির্দেশ দিতে পারেন। |
| তামাদির মেয়াদ | রাষ্ট্রপক্ষের ক্ষেত্রে ৬ মাস; নালিশকারীর ক্ষেত্রে ৬০ দিন। | সাধারণত ৬০ দিন (দায়রা আদালতে) বা ৯০ দিন (হাইকোর্টে)। |
৬. বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন দরখাস্তের আনুষ্ঠানিক মুসাবিদা
বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
ফৌজদারি রিভিশন মোকদ্দমা নং ……… / ২০২৪
দরখাস্তকারী (নালিশকারী): মো: রফিকুল ইসলাম
— বনাম —
১. রাষ্ট্র, ২. মো: ফজলুল হক (খালাসপ্রাপ্ত আসামি) — বিপরীত পক্ষগণ
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯(ক) ধারা মতে খালাসের অন্যায় আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দরখাস্ত
দরখাস্তকারী পক্ষ বিজ্ঞ আদালত সমীপে বিনীত নিবেদন করিতেছে যে—
- বিজ্ঞ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সি.আর মোকদ্দমা নং ১২০/২০২৩-এ পেনাল কোডের ৪২০ ধারার অপরাধের স্পষ্ট মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও গত ১৫/০১/২০২৪ তারিখে আসামিকে বেআইনিভাবে খালাস প্রদান করেন।
- উক্ত খালাসের রায় সাক্ষ্য আইনের মৌলিক বিধান ও সাক্ষ্য মূল্যায়নে মারাত্মক বিচারিক ত্রুটিতে দুষ্ট এবং আইনত বাতিলযোগ্য।
প্রার্থনা: অতএব বিনীত প্রার্থনা এই যে, বিজ্ঞ বিচারিক আদালতের উক্ত খালাসের ত্রুটিপূর্ণ আদেশ বাতিলপূর্বক ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলাটি অন্য কোনো উপযুক্ত আদালতে পুনঃবিচারের (Re-trial) নির্দেশ দানে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।
৭. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- রাষ্ট্র বনাম আনোয়ার হোসেন (43 DLR (AD) 124): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেন যে, ৪৩৯(৪) ধারার নিষেধাজ্ঞা কঠোর ও পরম। রিভিশন আদালত যতই নিশ্চিত হোক না কেন আসামি দোষী, তবুও তাকে সরাসরি সাজা দিতে পারবে না; একমাত্র আইনসম্মত আদেশ হলো পুনঃবিচারের নির্দেশ দেওয়া।
- কবির আহমেদ বনাম রাষ্ট্র (28 DLR 55): আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, আপিল না করে যেখানে রিভিশন দায়ের করা হয়, সেখানে খালাসের রায় তখনই বাতিল করা যাবে যদি আদেশে মারাত্মক আইনি বিভ্রান্তি বা এখতিয়ারগত ত্রুটি থাকে।
- আব্দুল খালেক বনাম রাষ্ট্র (17 BLC 580): হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, দায়রা আদালতে একবার রিভিশন নিষ্পত্তি হয়ে গেলে দ্বিতীয় রিভিশন সম্পূর্ণ বারিত, তবে আদালতের ইনহেরেন্ট পাওয়ার (Section 561A) ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য প্রয়োগ হতে পারে।
৮. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, দায়রা জজ ও হাইকোর্টের রিভিশন ক্ষমতা অধস্তন আদালতের আইনি বৈধতা পরীক্ষার অনন্য রক্ষাকবচ। খালাসকে সরাসরি সাজায় রূপান্তর না করার সংবিধিবদ্ধ বিধিনিষেধ ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ডাবল জিওপার্ডি সুরক্ষার নীতিকে সমুন্নত রাখে।

