বিষ প্রয়োগে হত্যার ষড়যন্ত্র ও A B C এর অপরাধিক দায় বিশ্লেষণ – বার কাউন্সিল ২০১৭
বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষা ২০১৭: দণ্ডবিধি, ১৮৬০
প্রশ্ন: ৫। (খ) A, B এবং C মিলে D-কে বিষ প্রয়োগে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী A বিষ সংগ্রহ করে B-কে দেয়, B উক্ত বিষ খাদ্যে মিশ্রিত করে এবং C কোনো কিছু না জানিয়া সরল বিশ্বাসে উক্ত খাদ্য D-এর নিকট পরিবেশন করে। ফলে D-এর মৃত্যু ঘটে। A, B এবং C এর ফৌজদারি দায় কি? দণ্ডবিধির ১২০খ, ৩৪, ১০৭ ও ৩০২ ধারার আলোকে বিশদ আইনি সমাধান দিন। [পূর্ণমান: ১৫]
১. তাত্ত্বিক ভিত্তি ও আইনি সমস্যাটির প্রেক্ষাপট
আলোচ্য সৃজনশীল সমস্যাটিতে একাধিক ব্যক্তির যৌথ পরিকল্পনা, কাজ বণ্টন এবং কোনো অপরাধ সংঘটনে তাদের স্বতন্ত্র ও যৌথ অপরাধিক দায়বদ্ধতা (Criminal Liability) নির্ধারণই প্রধান বিচার্য বিষয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ১২০(ক)/১২০(খ) (ফৌজদারি ষড়যন্ত্র), ধারা ৩৪ (সাধারণ অভিপ্রায়), ধারা ১০৭ (সহায়তা) এবং ধারা ৩০২ (খুনের শাস্তি)-এর আলোকে তিনজনের পৃথক ভূমিকা মূল্যায়ন করতে হবে।
২. ‘A’-এর অপরাধিক দায় বিশ্লেষণ (Liability of A)
- ভূমিকা: A বিষ প্রয়োগে হত্যার মূল ষড়যন্ত্রকারী এবং সে বিষ সংগ্রহ করে সরবরাহ করেছে।
- সংশ্লিষ্ট ধারা: দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারা (ফৌজদারি ষড়যন্ত্র), ১০৭ ধারা (সহায়তা) এবং ৩৪ ধারা সহ পঠিত ৩০২ ধারা।
- সিদ্ধান্ত: যদিও A ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নিজে বিষ মিশ্রিত করেনি, তবুও সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ষড়যন্ত্রকারী নিজে অপরাধস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও অপরাধ সংঘটনে তার পূর্বপরিকল্পনা ও বিষ সরবরাহের সরাসরি কার্যকারিতা ছিল। অতএব, A দণ্ডবিধির ১২০(খ) ও ৩৪ ধারা সহ পঠিত ৩০২ ধারায় সরাসরি খুনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৩. ‘B’-এর অপরাধিক দায় বিশ্লেষণ (Liability of B)
- ভূমিকা: B ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ অংশীদার এবং সে জেনেশুনে খাদ্যে বিষ মিশ্রিত করেছে।
- সংশ্লিষ্ট ধারা: দণ্ডবিধির ৩০০ ধারা (খুন), ৩৪ ধারা এবং ৩০২ ধারা।
- সিদ্ধান্ত: B মৃত্যু নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায় নিয়ে খাদ্যে প্রাণঘাতী বিষ মিশিয়েছে। অতএব B সরাসরি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা এবং ৩৪ ধারায় খুনের মূল অপরাধী হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড)-এর যোগ্য।
৪. ‘C’-এর অপরাধিক দায় বিশ্লেষণ (Liability of C)
- ভূমিকা: C বিষ বা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল এবং সে সরল বিশ্বাসে সাধারণ খাদ্যের ন্যায় খাদ্যটি D-কে পরিবেশন করেছে।
- সংশ্লিষ্ট ধারা ও সাধারণ ব্যতিক্রম: দণ্ডবিধির ধারা ৭৯ (সরল বিশ্বাসে কৃত কাজ – Mistake of Fact in Good Faith) এবং ফৌজদারি আইনের মূল স্তম্ভ “Mens Rea” (অপরাধমূলক মানসিক অভিপ্রায়)।
- সিদ্ধান্ত: C-এর কোনো প্রকার অপরাধমূলক উদ্দেশ্য, ষড়যন্ত্রের জ্ঞান বা বিষের অবগতি ছিল না। সে ছিল নিছক একজন নিরীহ বাহক (Innocent Agent)। দণ্ডবিধির ৭৯ ধারা অনুযায়ী তথ্যের ভুলে সরল বিশ্বাসে কাজ করায় C আইনের চোখে কোনো অপরাধ করেনি। অতএব, C কোনো অপরাধে দোষী হবে না এবং সে সম্পূর্ণ বেকসুর খালাস পাবে।
৫. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী নজিরসমূহ (Landmark Case Laws)
- বীরেন্দ্র কুমার ঘোষ বনাম সম্রাট (AIR 1925 PC 1): প্রিভি কাউন্সিল পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত দেয় যে, সাধারণ অভিপ্রায়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ নির্ধারিত ভূমিকা পালন করলে সকলেই খুনের জন্য সমভাবে দণ্ডিত হবে।
- মো: মহিউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র (48 DLR (AD) 144): আপিল বিভাগ রায় দেন যে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিপ্রায় (Mens Rea) বা ষড়যন্ত্রের জ্ঞান প্রমাণিত না হলে তাকে কেবল বাহ্যিক কাজের জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না; নিরপরাধ মাধ্যম হিসেবে সে খালাস পাবে।
৬. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিষ প্রয়োগে হত্যার ষড়যন্ত্র ও A B C এর অপরাধিক দায় বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে ফৌজদারি আইন প্রতিটি ব্যক্তির মানসিক অভিপ্রায় ও কাজের সংযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে। ফলে A ও B খুনের সর্বোচ্চ সাজা পাবে, আর নিরপরাধ C আইনসঙ্গতভাবে খালাস লাভ করবে।
৪.১. ষড়যন্ত্রের সাক্ষ্যপ্রমাণে সাক্ষ্য আইনের ১০ ধারার বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা
ফৌজদারি ষড়যন্ত্র সর্বদা গোপনে ও অন্ধকারের অন্তরালে সংগঠিত হয়। এর প্রত্যক্ষ বা চাক্ষুষ সাক্ষী পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই কারণেই সাক্ষ্য আইনের ১০ ধারায় এক বিশেষ ব্যতিক্রমী প্রমাণের নিয়ম প্রণীত হয়েছে:
“যেখানে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে যে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কোনো অপরাধের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, সেখানে ষড়যন্ত্রের সাধারণ উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাদের যে কোনো একজনের দ্বারা কৃত কোনো কাজ, উক্তি বা লিখিত বার্তা অন্য সকল ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে সমান প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।”
অতএব, A ও B-এর পারস্পরিক বার্তা, বিষ ক্রয় এবং খাদ্যে মিশ্রণের ঘটনা সাক্ষ্য আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী A ও B উভয়ের বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রমাণ হিসেবে আদালতে গণ্য হবে এবং তাদের যৌথ ফৌজদারি দায় সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।
৪.২. বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কগনিজেন্স আদেশের খসড়া (Draft Order)
বিজ্ঞ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ঢাকা
সি.আর মোকদ্দমা নং ৪৫/২০২৪ (আদেশ নং ৫, তারিখ- ১৫/০২/২০২৪):
“নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, আসামি A ও B পরস্পর যোগসাজশে ও পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিষ সংগ্রহ ও খাদ্যে মিশ্রণ করিয়া D-কে হত্যার অপরাধ সংঘটন করিয়াছে। সুতরাং আসামি A ও B-এর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(খ)/৩০২/৩৪ ধারায় অপরাধ আমলে গ্রহণ (Cognizance) করা হইল এবং তাহাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হইল। পক্ষান্তরে, তদন্ত প্রতিবেদনে আসামি C-এর কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা অবগতি না থাকায় এবং সে সরল বিশ্বাসে খাদ্য পরিবেশন করায় দণ্ডবিধির ৭৯ ধারার সুবিধা অনুযায়ী C-কে অত্র মামলার যাবতীয় দায় হইতে অব্যাহতি (Discharged) প্রদান করা হইল।”
৪.৩. ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের দণ্ড ও শাস্তির মাত্রা (Section 120B Penal Code)
দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে ষড়যন্ত্রকারীকে মূল অপরাধে সহায়তার সমপরিমাণ শাস্তি (অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড) ভোগ করতে হবে। আলোচ্য ঘটনায় A ও B ঠান্ডা মাথায় D-কে বিষ প্রয়োগে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় তারা উভয়ই ১২০(খ) ও ৩৪ ধারা সহ পঠিত ৩০২ ধারায় খুনের অপরাধে সমানভাবে চরম দণ্ডে দণ্ডিত হবে। পক্ষান্তরে, C ষড়যন্ত্রের অংশীদার না হওয়ায় সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষিত হবে।
৪.৩. ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের দণ্ড ও শাস্তির মাত্রা (Section 120B Penal Code)
দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে ষড়যন্ত্রকারীকে মূল অপরাধে সহায়তার সমপরিমাণ শাস্তি (অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড) ভোগ করতে হবে। আলোচ্য ঘটনায় A ও B ঠান্ডা মাথায় D-কে বিষ প্রয়োগে হত্যার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় তারা উভয়ই ১২০(খ) ও ৩৪ ধারা সহ পঠিত ৩০২ ধারায় খুনের অপরাধে সমানভাবে চরম দণ্ডে দণ্ডিত হবে। পক্ষান্তরে, C ষড়যন্ত্রের অংশীদার না হওয়ায় সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষিত হবে।
