জামিনের দরখাস্ত মুসাবিদা: সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক দায়েরকৃত জালিয়াতির মামলা

প্রশ্ন: T সুলতানপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি জাল নামপত্তনের কপি জমা দিয়ে একটি জমি রেজিষ্ট্রি করাকালে সাব-রেজিষ্ট্রার নামপত্তন সংক্রান্ত কাগজটি জাল মর্মে বুঝতে পারেন। সাব রেজিষ্ট্রার এই ঘঠনার প্রেক্ষিতে The Code of Criminal Procedure, 1898 এর Section 195 (c) অনুসারে সংশ্লিষ্ট ম্যজিস্ট্রেট আদালতে The Penal Code, 1860 এর ৪৭১ ধারায় নালিশী দরখাস্ত দাখিল করলে আদালত T এর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর আদেশ দেন। আপনি T এর নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে পূর্বোক্ত ঘটনায় উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে কমপক্ষে চারটি আইনানুগ যুক্তিসহ T এর জামিনের জন্য একটি দরখাস্ত প্রস্তুত করুন।

ঘটনার আইনি বিশ্লেষণ (Legal Analysis of the Facts):

প্রদত্ত ঘটনাটিতে সাব-রেজিস্ট্রার ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৯৫(১)(গ) [Section 195(1)(c)] ধারা অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারায় (জাল দলিল খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা) একটি সি.আর (C.R.) মামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি বড় ধরনের পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫(১)(গ) ধারা অনুযায়ী, কেবল তখনই কোনো আদালত এই ধারায় আমল (Cognizance) নিতে পারেন, যখন জাল দলিলটি “কোনো আদালতের কার্যক্রমে” (in any proceeding in any Court) দাখিল করা হয়। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী, ‘সাব-রেজিস্ট্রার’ কোনো ‘আদালত’ নন, তিনি একজন নির্বাহী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সুতরাং, সাব-রেজিস্ট্রারের দপ্তরে দাখিলকৃত দলিলের জন্য ১৯৫(১)(গ) ধারার সরাসরি প্রয়োগ আইনত ত্রুটিপূর্ণ। এই আইনি দুর্বলতা এবং আসামির সরল বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নিচে ‘T’-এর পক্ষে একটি জামিনের দরখাস্ত প্রস্তুত করা হলো:


দরখাস্তের মুসাবিদা (Draft of the Bail Petition):

মোকাম: বিজ্ঞ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, সুলতানপুর।

সি. আর. (C.R.) মামলা নং- ….. / ২০২৪
ধারা: দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৪৭১ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ১৯৫(১)(গ) ধারা।

রাষ্ট্র (সাব-রেজিস্ট্রার, সুলতানপুর) ………………………… বাদী

বনাম

T, পিতা- ….., সাং- ….., থানা- সুলতানপুর ………………………… আসামি/দরখাস্তকারী

বিষয়: ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ৪৯৭ ধারা মোতাবেক আসামির পক্ষে জামিন মঞ্জুরের আবেদন।

জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, উপরোক্ত আসামির পক্ষে আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী আইনজীবী অত্র আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করছি। আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং তিনি নিম্নোক্ত আইনানুগ কারণ ও যুক্তিসমূহের ভিত্তিতে অত্র আদালত থেকে জামিন পাওয়ার অধিকারী:

জামিনের আইনানুগ যুক্তিসমূহ (Grounds for Bail):

  1. ধারা ১৯৫(১)(গ)-এর অপপ্রয়োগ (Misconception of Law): বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আসামির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫(১)(গ) ধারার আলোকে পরোয়ানা জারি করেছেন, যা আইনত ত্রুটিপূর্ণ। উক্ত ধারাটি কেবল ‘আদালতের’ কার্যক্রমে দাখিলকৃত দলিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু সাব-রেজিস্ট্রার কোনো ‘আদালত’ (Court) নন, তাই উক্ত ধারার অধীনে নালিশী দরখাস্ত এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া আমল (Cognizance) আইনের দৃষ্টিতে অচল (Bad in law)। এই পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে আসামি জামিন পাওয়ার ন্যায়সঙ্গত অধিকারী।
  2. অপরাধমূলক উদ্দেশ্যের অভাব (Absence of Mens Rea): আসামি ‘T’ উক্ত জমির একজন সরল বিশ্বাসী ক্রেতা মাত্র। তিনি জমি বিক্রেতা বা দলিল লেখকের (মুহুরি) দেওয়া নামপত্তনের (মিউটেশন) কাগজটি সরল বিশ্বাসে (Bona fide) সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করেছিলেন। উক্ত কাগজটি জাল কি না, সে সম্পর্কে আসামির কোনো পূর্বজ্ঞান বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য (Mens rea) ছিল না। দণ্ডবিধির ৪৭১ ধারা প্রমাণ করতে হলে জাল জানার পরও তা ব্যবহার করার প্রমাণ থাকতে হয়, যা এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
  3. সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কা নেই (No chance of tampering with evidence): মামলার একমাত্র বস্তুগত প্রমাণ অর্থাৎ বিতর্কিত নামপত্তনের কাগজটি ইতিমধ্যেই সাব-রেজিস্ট্রারের হেফাজতে (হাতে-নাতে আটক) রয়েছে। বিধায়, আসামিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হলে তার দ্বারা কোনো আলামত বা সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট করার বা তদন্তে ব্যাঘাত ঘটানোর কোনো বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই।
  4. পলাতক হওয়ার সম্ভাবনা নেই (No Flight Risk): আসামি ‘T’ সুলতানপুর এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা, সম্মানিত নাগরিক এবং পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তিনি কোনো দাগী বা অভ্যাসগত অপরাধী নন (Not a habitual offender)। তাঁকে জামিন দেওয়া হলে তিনি পলাতক হবেন না এবং আদালতের নির্দেশিত যেকোনো শর্ত পালনপূর্বক বিচার চলাকালে সকল ধার্য তারিখে নিয়মিত আদালতে উপস্থিত থাকতে বাধ্য থাকবেন। তিনি স্থানীয় ও সচ্ছল জামিনদার প্রদানেও প্রস্তুত আছেন।

প্রার্থনা (Prayer)

অতএব, বিনীত প্রার্থনা, উপরোক্ত যুক্তিসমূহ সদয় বিবেচনায় নিয়ে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামি ‘T’-এর বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহারপূর্বক তাঁকে উপযুক্ত জামিনদারের জিম্মায় জামিনে মুক্তি দানে বিজ্ঞ আদালতের মর্জি হয়।

এবং এই সুবিচারের জন্য আসামি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।

তারিখ: ০৪ মে, ২০২৬

আসামি পক্ষে বিনীত—
(স্বাক্ষর)
অ্যাডভোকেট
সুলতানপুর জজ কোর্ট।

Related Articles

Back to top button